Bartaman Logo
১২ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

জনরোষের আমরা ওরা!

মাত্র এই ক’দিনেই শমীকবাবু আর শুভেন্দু অধিকারীর কথা কেমন পরস্পরবিরোধী হয়ে যাচ্ছে না?

জনরোষের আমরা ওরা!
  • ১২ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মাত্র এই ক’দিনেই শমীকবাবু আর শুভেন্দু অধিকারীর কথা কেমন পরস্পরবিরোধী হয়ে যাচ্ছে না? হালিশহরে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়ির সামনে বিক্ষোভ, হামলা। যাওয়ার পথে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি লক্ষ্য করে ছোড়া হল কাদা, জুতো, ইট। উঠল চোর চোর স্লোগানও। শমীকবাবু বললেন, এ ধরনের ঘটনা কাম্য নয়। এটা বাংলার সংস্কৃতি নয়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মর্যাদা রক্ষাও যে সরকারের কর্তব্য তাও মনে করিয়ে দিলেন ঠারেঠোরে। বিশেষত যিনি জেড প্লাস নিরাপত্তা পান তার ক্ষেত্রে প্রশাসনের সদা সতর্ক থাকাই রীতি। মাননীয় অগ্নিমিত্রা পালও প্রায় একই কথা বলেছেন। দোষ থাকলে বিচার হবে আদালতে, কিন্তু রাস্তায় সড়কে কেউ আইন হাতে তুলে নিয়ে হেনস্তা করতে পারেন না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট বললেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থাই করেছিল। এত চুরি করেছেন যে জনরোষের শিকার হয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী কথায়, ‘টিভিতে যতটুকু দেখেছি, সিনিয়র কর্তাদের নেতৃত্বে পুলিশ টিম তাঁকে সঠিকভাবেই সাপোর্ট দিয়েছে।’ হামলাকারীদের মধ্যে বিজেপির কোনো পরিচিত মুখ তিনি দেখেননি, গেরুয়া ঝান্ডাও চোখে পড়েনি।’ মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বাড়ির লোক বলছেন তাঁরা চাননি মমতা কোনোভাবে যুক্ত হোন। যাওয়ার আগে পুলিশকে জানানোও হয়নি। বাড়ির লোক মুখ্যমন্ত্রীকে নাকি বলছে, পুলিশের ভূমিকায় তাঁরা সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট। রহস্য উদঘাটন হোক, সেটাই চায় পরিবার। পরিবার আরও বলছে, একমাত্র বর্তমান পুলিশ-প্রশাসনই বিচার দিতে পারবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিচার দিতে পারবেন না।’ ভাবুন তো, যে পুলিশ নির্বিচারে লকআপের ভিতর একজন জলজ্যান্ত মানুষকে পিটিয়ে মারল, পরিবার সোচ্চার হল, সেই ঘটনার পুলিশি তদন্তে পরিবার সন্তুষ্ট হতে পারে? দু’হাত তুলে বলতে পারে, সব ঠিক হ্যায়! কথাটা অদ্ভুত লাগছে না। আসলে ক্ষমতা (অ্যাবসলিউট পাওয়ার!) এমনই বিষম ভয়ংকর বস্তু যে নিমেষে শাসক ও বিরোধীর ব্যাখ্যা এবং ভাষ্য বদলে যায়। আমার আপনার প্রিয়জন যদি পুলিশ হেপাজতে বেদম প্রহারে মারা যান এবং তখনও ‘ভয়ে কিংবা ভক্তি’তে গদগদ হয়ে বলি বাহবা পুলিশ মহোদয়, সেটা ‘ভয় আউট আর ভরসা ইন’-এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে? পরিবর্তনের উথালপাথাল বাংলা সেই আশ্চর্য উপলব্ধিরই সন্ধিক্ষণে। আসলে মার্কেটিংয়ের ভাষা, বিপণনের স্লোগান আর বাস্তবের অভিজ্ঞতা এক সরলরেখায় চলে না। চলতে পারে না। আক্রান্ত ও আক্রমণকারীর ভাষ্যও বদলে যায় সময় সময়। নিজেদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা ভেবেই হালিশহরের স্বজন হারানো পরিবার আজ শোক প্রকাশ ও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রতিক্রিয়াও জানাচ্ছেন বেছেবেছে। সতর্কতার সঙ্গে। পরিস্থিতি বুঝে! এটা ওই পরিবারের সীমাবদ্ধতার চেয়েও আমাদের রাজনৈতিক কাঠামোর ঘুণধরা দশারই প্রমাণ নয় কি?

Advertisement

আসলে জমানা বদলের সঙ্গেই জনরোষের লক্ষ্যবস্তুও আশ্চর্য জাদুদণ্ডের ছোঁয়ায় বদলে যায় অত্যন্ত দ্রুত। তৃণমূল জমানায় কেন্দ্রের প্রথম সারির মন্ত্রী ও শীর্ষ বিজেপি নেতা জগৎ প্রকাশ নাড্ডা ডায়মন্ডহারবারে দলীয় কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার পথে আক্রান্ত হন। সেদিন বিজেপি তৃণমূলের গুন্ডামির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। আর সেদিনের শাসক ঘটনাটাকে স্রেফ জনরোষ বলে লঘু করেছিল। দূরে দাঁড়িয়ে পুলিশ ছিল নীরব দর্শক। এই ক’দিনেই সবাই স্থান বদল করে ফেলেছে! আবার আজকের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কনভয় যখন উত্তরবঙ্গে হামলার মুখে পড়ে তখনও জনরোষ বনাম মধ্যযুগীয় বর্বরতার পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যায় জনগণ বিভ্রান্ত হয়েছিল। খগেন মুর্মুর উপর যখন প্রাণঘাতী হামলা হয়েছিল তখনও তৃণমূল বলেছিল, ওসব বিজেপির গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফল। শাসক ও বিরোধীর আসন বদলে পুলিশের অবস্থান কিন্তু একই জায়গায়— যুগে যুগে দলদাস! শাসককে তুষ্ট রাখাই তার একমাত্র লক্ষ্য এবং বাধ্যবাধকতা। আরও নির্দিষ্ট করে বললে শাসক দলের আজ্ঞাবহ হতে পারলেই উন্নতি। যন্তরমন্তরে আঙুল ওঠে অমিত শাহের দিকে, আর হালিশহরে লকআপে মৃত্যুতে কাঠগড়ায় তোলা হয় শুভেন্দুর পুলিশকে।  
নতুন সরকারের তিন মাসে ইতিমধ্যেই পুলিশি লকআপে মৃত্যু ও এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে। যদি অভিযোগ সত্যি হয় তাহলে আইন ও বিচারব্যবস্থাকে এড়িয়ে অভিযুক্তকে খতম করে দেওয়ার এই ঝোঁক মারাত্মক। যে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেই লকআপে মৃত্যু কাম্য নয়। এনকাউন্টারে মৃত্যুও সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ। দু’ক্ষেত্রেই পুলিশের গাফিলতি, বাড়াবাড়ি এবং আইনের শাসনের উপর অনাস্থাই প্রকাশ পায়। এতে আইনের শাসন নয়, আবারও শাসকের আইনই প্রতিষ্ঠা পায়। অথচ শাসকের আইন মুছে নতুন বাংলার পত্তনের অঙ্গীকারই করেছিলেন বিজেপি নেতৃত্ব। গত তিন মাসে নতুন বোতলে পুরানো পানীয়ই পরিবেশন হচ্ছে। তোলাবাজি চলছে। জুলুমবাজির বিরাম নেই। দাদা বদলেছে, নতুন রং-য়ের প্রলেপ পড়েছে, কিন্তু বাকি সব একই রয়েছে। পুলিশের চরিত্রও বিশেষ বদলায়নি। তাহলে জনগণ কী পেল?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ