মাত্র এই ক’দিনেই শমীকবাবু আর শুভেন্দু অধিকারীর কথা কেমন পরস্পরবিরোধী হয়ে যাচ্ছে না? হালিশহরে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়ির সামনে বিক্ষোভ, হামলা। যাওয়ার পথে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি লক্ষ্য করে ছোড়া হল কাদা, জুতো, ইট। উঠল চোর চোর স্লোগানও। শমীকবাবু বললেন, এ ধরনের ঘটনা কাম্য নয়। এটা বাংলার সংস্কৃতি নয়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মর্যাদা রক্ষাও যে সরকারের কর্তব্য তাও মনে করিয়ে দিলেন ঠারেঠোরে। বিশেষত যিনি জেড প্লাস নিরাপত্তা পান তার ক্ষেত্রে প্রশাসনের সদা সতর্ক থাকাই রীতি। মাননীয় অগ্নিমিত্রা পালও প্রায় একই কথা বলেছেন। দোষ থাকলে বিচার হবে আদালতে, কিন্তু রাস্তায় সড়কে কেউ আইন হাতে তুলে নিয়ে হেনস্তা করতে পারেন না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট বললেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থাই করেছিল। এত চুরি করেছেন যে জনরোষের শিকার হয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী কথায়, ‘টিভিতে যতটুকু দেখেছি, সিনিয়র কর্তাদের নেতৃত্বে পুলিশ টিম তাঁকে সঠিকভাবেই সাপোর্ট দিয়েছে।’ হামলাকারীদের মধ্যে বিজেপির কোনো পরিচিত মুখ তিনি দেখেননি, গেরুয়া ঝান্ডাও চোখে পড়েনি।’ মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বাড়ির লোক বলছেন তাঁরা চাননি মমতা কোনোভাবে যুক্ত হোন। যাওয়ার আগে পুলিশকে জানানোও হয়নি। বাড়ির লোক মুখ্যমন্ত্রীকে নাকি বলছে, পুলিশের ভূমিকায় তাঁরা সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট। রহস্য উদঘাটন হোক, সেটাই চায় পরিবার। পরিবার আরও বলছে, একমাত্র বর্তমান পুলিশ-প্রশাসনই বিচার দিতে পারবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিচার দিতে পারবেন না।’ ভাবুন তো, যে পুলিশ নির্বিচারে লকআপের ভিতর একজন জলজ্যান্ত মানুষকে পিটিয়ে মারল, পরিবার সোচ্চার হল, সেই ঘটনার পুলিশি তদন্তে পরিবার সন্তুষ্ট হতে পারে? দু’হাত তুলে বলতে পারে, সব ঠিক হ্যায়! কথাটা অদ্ভুত লাগছে না। আসলে ক্ষমতা (অ্যাবসলিউট পাওয়ার!) এমনই বিষম ভয়ংকর বস্তু যে নিমেষে শাসক ও বিরোধীর ব্যাখ্যা এবং ভাষ্য বদলে যায়। আমার আপনার প্রিয়জন যদি পুলিশ হেপাজতে বেদম প্রহারে মারা যান এবং তখনও ‘ভয়ে কিংবা ভক্তি’তে গদগদ হয়ে বলি বাহবা পুলিশ মহোদয়, সেটা ‘ভয় আউট আর ভরসা ইন’-এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে? পরিবর্তনের উথালপাথাল বাংলা সেই আশ্চর্য উপলব্ধিরই সন্ধিক্ষণে। আসলে মার্কেটিংয়ের ভাষা, বিপণনের স্লোগান আর বাস্তবের অভিজ্ঞতা এক সরলরেখায় চলে না। চলতে পারে না। আক্রান্ত ও আক্রমণকারীর ভাষ্যও বদলে যায় সময় সময়। নিজেদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা ভেবেই হালিশহরের স্বজন হারানো পরিবার আজ শোক প্রকাশ ও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রতিক্রিয়াও জানাচ্ছেন বেছেবেছে। সতর্কতার সঙ্গে। পরিস্থিতি বুঝে! এটা ওই পরিবারের সীমাবদ্ধতার চেয়েও আমাদের রাজনৈতিক কাঠামোর ঘুণধরা দশারই প্রমাণ নয় কি?



