ভগবানের জন্য জ্বালা কি অত সোজা? প্রেম ভালবাসার আগুন জ্বললে অন্য সব আগুন নিভে যায়। কামনা বাসনার আগুন, ক্রোধ, হিংসা, বিদ্বেষের আগুন, ঈর্ষার আগুন সব নিভে যায়। তখন কোনও কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই থাকে না। ভগবানকে যে ঠিক ঠিক চায়, সে আর কিছুই চায় না। সেটা অত সহজ নয়। সে প্রেমের আগুন জ্বললে সব রসই শুকিয়ে যায়, এক এক সময় চোখের জলও থাকে না। সে অনেক উঁচু অবস্থার কথা।
আমরা ভগবৎ-বিরহের কথা অতি সহজভাবে ব্যবহার করি, কিন্তু সত্যিকার ভগবৎ-বিরহ যার হয় সে যেন মরমে মরে থাকে। তার কোনও জাগতিক ক্ষোভ থাকে না। সবচেয়ে কঠিন হচ্ছে ভগবানকে ভালবাসা। শ্রীমতী বলেছিলেন—তোদের শ্যাম কথার কথা, আমার শ্যাম অন্তরের ব্যথা। তাই শ্যামকে অন্তরের ব্যথা করতে হলে নিজের ব’লে আর কিছু রাখা চলে না। আমাদের শুধু সেই মহান প্রেমকে আদর্শ ক’রে চেষ্টা করে যাওয়া। কখনও কোনও মহাপুরুষের নিন্দা করো না। কারণ, সেখানে হয়তো তাঁর শিষ্যরা বসে আছেন, তাঁর ভক্তরা রয়েছেন। যে কোনও গুরুকে আঘাত করলে সে আঘাত গুরু পরম্পরায় গিয়ে সেই আদি গুরু সচ্চিদানন্দকেই লাগে। গুরু ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু, এটা বলা খুবই শক্ত। গুরুর প্রতি ব্যক্তিগত ভালবাসা এবং সর্বস্ববোধ, অর্থাৎ গুরুই আমার সর্বস্ব, এই বোধটা না এলে গুরুকে ভগবান বলাটা মুখের কথা মাত্রই হয়। সত্যিকার ভগবৎ-বোধ সেইখানে যেখানে শিষ্যের প্রাণে একনিষ্ঠ ভক্তি আছে, গভীর ভালবাসা আছে। গুরু কি দীক্ষা দিলেন, দীক্ষাতে আধ্যাত্মিক উন্নতি হল কিনা, কতটা হল, এসব কিছুই সে আর দেখে না। তিনি আমার গুরু, আমার একমাত্র অবলম্বন, আমি তাঁর সন্তান, এই গভীর ভালবাসা এলে তবেই সম্ভব গুরুকে ব্রহ্ম জ্ঞান করা। শিষ্যের অনেকখানি ভক্তি প্রয়োজন গুরুকে ব্রহ্ম বলতে হলে। উন্নত শিষ্য ভক্তির দ্বারাই টেনে আনতে পারে পরব্রহ্মকে গুরুর আধারে।
মধুর ভাব সাধন বলতে যা বোঝায় সেটা ঠিক এই সংসারের দৃষ্টিতে মধুর ভাব নয়। মধুর ভাব সাধনে ভগবানকে পতিরূপে কল্পনা করে, পতিরূপেই তাঁকে দেখে এটা ঠিকই—কিন্তু সেটা শুধু দৈহিক সম্পর্কেই শেষ হয় না। শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শ্রীমতীর মধুর ভাব শুধু দৈহিক সম্বন্ধেই শেষ হয়ে যায়নি, সেখানে একটা আত্মিক সম্বন্ধ স্থাপিত হয়েছে। এবং সে সম্বন্ধ চিরন্তন। বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণ চিরকিশোর, শ্রীরাধা চিরকিশোরী এবং কৃষ্ণের বারো বছর বয়সেই বৃন্দাবন লীলার শেষ। কৃষ্ণ বারো বছর বয়সেই বৃন্দাবন ছেড়ে চলে গেলেন দ্বারকায়, আর স্থূলভাবে ফিরে এলেন না কোনও দিন। এর একটা তাৎপর্য আছে। বৃন্দাবনের রাধা এবং গোপীদের কাছে কৃষ্ণ চিরকিশোর রূপেই থেকে গেলেন। অথচ শ্রীকৃষ্ণের বাস্তব জীবনে স্থূল দেহে জরা বার্ধক্য সবই এসেছে। কিন্তু বৃন্দাবনের কৃষ্ণ ভাবরাজ্যে চিরকিশোর রয়ে গেলেন। মনে হয়, মধুর ভাবকে প্রতিষ্ঠা দেবার জন্যই তাঁর বৃন্দাবন ত্যাগ ক’রে চলে যাওয়া।
শ্রীঅর্চনাপুরী মায়ের বাণী ‘ছড়ানো মুক্তো’ থেকে