Bartaman Logo
১১ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বালুচিস্তানে স্বাধীনতার বজ্রনির্ঘোষ

পাকিস্তানের থেকে আজাদি! ১১ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা করেছে বালুচিস্তান! বালুচিস্তানের স্বাধীনতা কেবল পাকিস্তানের ভৌগোলিক মানচিত্রের পরিবর্তন নয়, বরং এটি একবিংশ শতাব্দীতে এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারতের সর্বময় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক চাবিকাঠি।

বালুচিস্তানে স্বাধীনতার বজ্রনির্ঘোষ
  • ১১ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পাকিস্তানের থেকে আজাদি! ১১ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা করেছে বালুচিস্তান! বালুচিস্তানের স্বাধীনতা কেবল পাকিস্তানের ভৌগোলিক মানচিত্রের পরিবর্তন নয়, বরং এটি একবিংশ শতাব্দীতে এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারতের সর্বময় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক চাবিকাঠি। বালুচিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণার কেন্দ্রে রয়েছে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি চাঞ্চল্যকর চিঠি। ‘রিপাবলিক অব বালুচিস্তান’ বা স্বাধীন বালুচিস্তান প্রজাতন্ত্রের নামে জারি করা এই চিঠিতে পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন হওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। ভাইরাল হওয়া এই চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, নতুন এই স্বাধীন রাষ্ট্রটি ইতিমধ্যেই নিজেদের নতুন জাতীয় পতাকা উড়িয়েছে এবং নিজস্ব জাতীয় সঙ্গীত আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে। শুধু তাই নয়, 'বালুচি ফালুস' নামে নিজস্ব মুদ্রার প্রচলন করার পাশাপাশি তারা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রশাসনিক কাঠামোও গড়ে তুলেছে বলে ওই চিঠিতে দাবি করা হয়েছে। চিঠির তথ্যানুযায়ী, সমগ্র বালুচিস্তানের প্রায় ৮৫ শতাংশ মূল ভূখণ্ড এখন সরাসরি স্থানীয় স্বাধীনতাকামীদের নিয়ন্ত্রণে। পাকিস্তানের সরকারি সামরিক বাহিনীর হাত থেকে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রশাসনিক শাসনভার বালুচ বীরেরা নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের ফলে তারা এখন নিজেদের মাতৃভূমি ও সংলগ্ন সমুদ্রসীমার উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব দাবি করছে, যা পাকিস্তানের সার্বভৌম নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এক বড়ো ধাক্কা। পাকিস্তানের জন্য তা দুশ্চিন্তারও বটে।

Advertisement

ন্যায্য সম্পদের অধিকার নিয়ে ওই ভাইরাল চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, বালুচিস্তানের সমস্ত প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ এখন তাদের নবগঠিত স্বাধীন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে রয়েছে কোটি কোটি ডলার মূল্যের অত্যন্ত সমৃদ্ধ সোনা ও তামার আকরিক খনি, ১৫০টিরও বেশি সক্রিয় প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র এবং ১২০০টিরও বেশি বৃহৎ কয়লা খনি। এই বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই স্বাধীন বালুচিস্তান বিশ্বমঞ্চে স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হতে চাইছে। ওই চিঠিতে স্পষ্ট দাবি করা হয়েছে, বিপুল সংখ্যক বালুচ এবং পশতুন সেনা পাকিস্তান সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং সীমান্তরক্ষী বা ফ্রন্টিয়ার কোর থেকে স্থায়ীভাবে ইস্তফা দিয়ে নিজস্ব স্বাধীনতাকামী বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ সদস্যের একটি বিশাল সম্মিলিত সামরিক দল ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পাকিস্তানি দখলদার সামরিক শক্তিকে এই পবিত্র মাটি থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত জোরালো কূটনৈতিক আবেদন জানিয়ে ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, বালুচিস্তানকে একটি দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদা দিক রাষ্ট্রসংঘ। তারা বিশ্ব নেতৃত্বকে আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, নতুন এই প্রশাসন কোনোভাবেই পাকিস্তানের সামরিক কিংবা নৌবাহিনীকে তাদের আকাশপথ, স্থলভাগ কিংবা সমুদ্র উপকূল ব্যবহার করতে দেবে না, যাতে কোনো প্রতিবেশী দেশের শান্তি ও সামগ্রিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।
বালুচিস্তানের ভূখণ্ডের এই চরম উত্তাল পরিস্থিতি নিয়ে বালুচ নেতা মীর ইয়ার বালোচ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ওখানকার বাস্তব পরিস্থিতি ক্রমশ পাকিস্তানি সেনার হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। তিনি দাবি করেছেন, স্থলভাগে পাকিস্তানি সেনারা ক্রমশ পিছু হটছে এবং তারা এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেবল বিমান হামলার উপর নির্ভর করছে। এখন শুধু সশস্ত্র যোদ্ধারাই নন, সাধারণ নারী-পুরুষরাও বুক চিতিয়ে পাকিস্তানি সেনা শাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। পাকিস্তানের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বালুচ ছাত্র ও সাধারণ নাগরিকেরা প্রতিনিয়ত রাজপথে নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। বালুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) সহ একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর উপর বড়ো আকারের অভিযান চালিয়েছে। এই ধরনের অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং বিস্ফোরক স্বাধীনতা ঘোষণার দাবি সামনে আসার পরও কিন্তু ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর দেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমনিতেই বিধ্বংসী অর্থনৈতিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ তীব্র কোন্দলে জেরবার পাকিস্তান এই নতুন সামরিক সংকট প্রকাশ্যে আসায় চরম ভূ-রাজনৈতিক চাপে পড়ে গিয়েছে। এই চিঠির দাবির আইনি সত্যতা পুরোপুরি প্রমাণিত না হলেও বালোচ উপত্যকায় যে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ মারাত্মকভাবে শিথিল হয়ে পড়েছে, তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। সেখানকার সাধারণ প্রগতিশীল সমাজ যেভাবে বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, তা ইসলামাবাদে বসা কর্তাদের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বালুচ জাতীয়তাবাদ পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—যার শিকড় ঔপনিবেশিক ইতিহাসে প্রোথিত হলেও শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়েছে সমকালীন ভূরাজনীতির প্রতিটি স্তরেও। ১৯৭১ সালে ভারত যেভাবে বাংলাদেশের মানুষের পাশে থেকে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিল এবং নিজের পূর্ব সীমান্তকে নিরাপদ করেছিল, ঠিক তেমনভাবে বালুচিস্তানের ন্যায়সংগত স্বাধীনতা সংগ্রামকে কূটনৈতিক, নৈতিক ও কৌশলগতভাবে সমর্থন করা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতির একটি অপরিহার্য অংশ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ