শান্তনু দত্তগুপ্ত: জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আর তার সাফাই সম্বিত পাত্র দিচ্ছেন? কেন? সম্বিত পাত্র কি নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র? নাকি জ্ঞানেশ কুমার বিজেপির নেতা?
শান্তনু দত্তগুপ্ত: জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আর তার সাফাই সম্বিত পাত্র দিচ্ছেন? কেন? সম্বিত পাত্র কি নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র? নাকি জ্ঞানেশ কুমার বিজেপির নেতা?
এই প্রশ্ন অভিজিৎ দিপকের। নামটা বড়ো কথা নয়। আসল পরিচয়, এ একটি ককরোচ। তাঁর জায়গায় আশুতোষ রাঙ্কা কিংবা সৌরভ দাসও হতে পারত। কিংবা আপনি-আমি। কয়েক মাস ফ্ল্যাশব্যাকে গিয়ে দেখুন, এঁদের কাউকে আমরা চিনতাম না। মিশে ছিল সাধারণ মানুষের ভিড়ে। হঠাৎ করে সামনে এল কীভাবে? প্রশ্ন করে। লাগাতার। একটি দাবি তুলে এবং তাতে অনড় থেকেও। বিরোধী রাজনীতির বেসিক কিন্তু এটাই। অথচ, গত ১২ বছর ধরে রাজনীতির এই ‘অ-আ-ক-খ’ বিরোধী শিবির থেকে কেমন যেন নিরুদ্দেশ হয়ে ছিল। একটা যন্তরমন্তর কর্মসূচি কেন্দ্রের মন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে। আর একটা ‘স্কুল ঠিক করো’ উদ্যোগ প্রশাসনকে নাস্তানাবুদ করে রেখেছে। কারণ কী? এই ইস্যুগুলোও সাধারণ। আম জনতার। এই সমস্যা প্রত্যেক ঘরের। তাই প্রভাব পড়েছে। প্রভাব পড়ছে। বেশ বড়ো পরিধিজুড়ে। কোন শিল্পপতির শেয়ার কতটা ম্যানিপিউলেট করা হল, তাতে ওই খেটে খাওয়া লোকগুলোর কিছু আসে যায় না। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হল, দিনের শেষে আমি কী পেলাম। বিরোধী রাজনীতিতে সেই প্রভাব বা ইমপ্যাক্ট কিন্তু দেখা যাচ্ছে এই ককরোচ জনতা পার্টির থেকে। তাদের ফান্ডিং কে বা কারা করছে, তাদের রাজনৈতিক অ্যাম্বিশন কী, আড়াই বছর পর তারা পুরোদস্তুর রাজনৈতিক দল হিসাবে ভোটে লড়বে কি না... এসব প্রশ্ন এখন অপ্রাসঙ্গিক। মোদ্দা বিষয় হল, এদের রাস্তায় দেখা যাচ্ছে। এরা শিক্ষা দুর্নীতির দায়ে মন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছে, যন্তরমন্তর আন্দোলনে এফআইআরের শিকার পড়ুয়াদের জন্য লড়াই করছে, স্কুলে স্কুলে গিয়ে শিক্ষা নিয়ে দালালি ফাঁস করছে, আবার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে স্লোগানও তুলছে। মানুষ কিন্তু এগুলোই দেখছে। বিরোধী রাজনীতি সাংবাদিক সম্মেলন বা ফেসবুকে সীমাবদ্ধ থাকার জন্য নয়। অসমে গিয়ে মার খেয়েছেন আশুতোষ রাঙ্কা। তাঁকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছে। কারণ, তিনি প্রশ্ন তুলতে গিয়েছিলেন। স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে। আজকের গণতন্ত্রে এইটে বড্ড সমস্যার বিষয়—প্রশ্ন তোলা। তাও রাস্তায় নেমে। পাবলিকের মধ্যে দাঁড়িয়ে। গত ১২ বছর ধরে
কোনো বিরোধী দলই এই কাজটা করেনি। তাই সামান্য লতানে গাছও শিকড় ছড়িয়ে মাটি কামড়ে ধরেছে। এখানেই তারা থেমে যায়নি! অন্য সব
গাছের ডালপালা কেটে সাফ করে দিয়েছে। যাতে মাটির সব রস তারাই খেতে পারে। অন্য কেউ সেই সুযোগ চাইলে ওই লতানে গাছের শর্ত অনুযায়ী চলতে হবে। তারা যেমন বলবে, তেমনভাবে মাথা নাড়তে হবে। সবচেয়ে বড়ো শর্ত, শিকড়-বাকড় ছড়ালে চলবে না। ঘরে আছো, ঘরেই থাকো। যত খুশি ফেসবুক করো। রাস্তায় নামতে যেও না। তাহলেই পাবলিকের চোখে পড়বে। তোমাদের প্রশ্ন তাদের মধ্যে ছড়িয়ে যাবে। তখন তারা আঙুল তুলবে শাসকের দিকে। এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য যতটা ভালো, শাসকের জন্য ততই বিপদের। ককরোচরা এটুকু তো করল! তারা যদি এখন দেশের বিরোধী দলগুলিকে প্রশ্ন করে, এক যুগ ধরে কী করলে তোমরা? খুব অস্বাভাবিক হবে কি?
একবার মনে করে দেখুন, ১২ বছর আগে বিজেপির প্রচারের অভিমুখ কী ছিল? গ্যাসের দাম (৪১০ টাকা ৫০ পয়সা), খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার (প্রায় ৬ শতাংশ), ডলারের অগ্নিমূল্য (৬২ টাকা), সোনা কেনায় নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ, বেকারত্ব। এবার আজকের পরিস্থিতি দেখুন। গ্যাসের দাম ৯৬৮ টাকা। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার ৮ থেকে ১০ শতাংশ। ডলারের দাম প্রায় ৯৫ টাকা। বেকারত্বের হার অর্ধশতকের মধ্যে সর্বাধিক। প্রধানমন্ত্রী নিজেই এখন সোনা কেনায় লাগাম দেওয়ার কথা বলছেন। অথচ, এই সব ইস্যুতে রাস্তায় কতজন বিরোধীকে দেখা যাচ্ছে? শুধুমাত্র রাহুল গান্ধী। তাও রাস্তায় সেই অর্থে নয়, সাংবাদিক সম্মেলনে। একটি ভালো কাজ তিনি করছেন—ছাত্রো কি গুঞ্জ। কম বয়সি ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিপুল সাড়া ফেলেছে এই আয়োজন। সাধারণ পড়ুয়া ও তাদের অভিভাবকদের অভাব-অভিযোগ সেখানে শুনছেন তিনি। ইন্দোরের অনুষ্ঠানে স্ট্যান্ড আপ কমেডি খানিক চোনা ফেলেছে ঠিকই, কিন্তু এতে এখন দেশবাসী অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। রাহুল গান্ধী মানে একটু চোনা থাকবেই। তাও তো এই লোকটিকে বিরোধী রাজনীতির দরবারে দেখা যায়। বাকিরা তো স্রেফ বিবৃতির ঘরে এসি চালিয়ে বসে থাকেন। তবুও প্রশ্নটা হল, প্রধান বিরোধী দল হিসাবে যতটা চালিয়ে খেলা দরকার, ততটা কি কংগ্রেস করে থাকে? রাহুল গান্ধী এ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ইস্যুতে কতবার রাস্তায় নেমে অবরোধ করেছেন? কতবার বন্ধ হয়ে যাওয়া লক্ষাধিক সরকারি স্কুল ফের খোলার দাবিতে সংসদ অভিযান করেছেন? এইগুলোই কিন্তু ককরোচ জনতা পার্টি করছে। আপনি তাদের পছন্দ করুন বা না করুন। বিরোধী হওয়ার দায়িত্ব পালন করছে। তাদের পদ্ধতি আপনার পছন্দ হোক বা না হোক।
পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী দল এখন সরকার নির্ধারিত তৃণমূল কংগ্রেস। কখনো কোনো বড়ো ইস্যুতে তাদের মুখ খুলতে দেখা যায় না। কারণ, ভালো তৃণমূল তারা। এরা খারাপ দেখে না, খারাপ শোনে না, খারাপ বলে না। শুধু খারাপ তৃণমূল সংক্রান্ত কিছু হলেই তারা সাংবাদিক ডেকে চারটি কথা বলে। আর সরকারের পক্ষে বিবৃতি দেয়। বিরোধী রাজনীতি যে এমনও হতে পারে, সেটা এই দেশ নতুন করে শিখছে বটে। আর এক তৃণমূল, তারা ডিমের ভয়ে বাইরেই বেরয় না। তাদের উপরতলা থেকে নীচুতলা। উপরতলা বাড়ি বসে ফেসবুক করে। নীচুতলা বিজেপিকে ধরে সেটিংয়ের চেষ্টা। আর মাঝের তলা বলতে একজন বিধায়ক একাই লড়ে যান, চাঁচাছোলা ভাষায় সরকারকে আক্রমণ করেন, ডিম থেরাপির শিকার হন, মার খান, আর ‘জনরোষে’ ভাঙা গাড়ি সার্ভিস সেন্টারে দিয়ে আসেন। গণতন্ত্র কি একেই বলে? এ রাজ্যে ককরোচ জনতা পার্টি শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। আগে কথিত ছিল, বাংলা যা আজ ভাবে, গোটা দেশ তা ভাবে আগামী কাল। এখন বিষয়টা উলটে গিয়েছে। বাকি দেশ ভেবে, দেখে, চেখে, যাচাই করার পর যখন ফেলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন তাকে সাদরে বুকে টেনে নেয় বাংলা। তাই বিরোধী রাজনীতির যদি জমি আজ ভারতের অন্য প্রান্তে মজবুত হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাকে আর একটু সবুর করতে হবে বলেই মনে হচ্ছে। অন্তত ককরোচের জন্য। কারণ, তৃণমূলের এখন এ রাজ্যে যা অবস্থা, টিমটিম করে জ্বলতে থাকা প্রদীপ ছাড়া একে আর কিছুই বলা যায় না। সিপিএম আছে বটে, কিন্তু এখনও মানুষের মনে নেই। গ্রাম বাংলার জনতা সিপিএমের উপর খুব একটা ভরসা আজও করতে পারেন না। বাকি রইল কংগ্রেস। তারা সাইনবোর্ড হতে গিয়েও হয়নি। মাঝে মাঝে জনা দশেক কর্মী-সমর্থক নিয়ে কর্মসূচি করেন। হ্যাঁ, তাও রাস্তায় দেখা যায়। ওই যে বললাম, বিরোধী রাজনীতির বেসিক। রাস্তায় দেখা যেতে হবে। লোকসভা-বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলতে হবে। প্রশ্ন তুলতে হবে। শাসক বলবে, আরবান নকশাল। দাগিয়ে দেবে, দিমাগি নকশাল। তারপরও প্রশ্ন তুলতে হবে। শিক্ষার গভীরতা শেখায় প্রশ্ন করতে। প্রেসিডেন্সি হোক, যাদবপুর, কিংবা সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ইনস্টিটিউট—এরা দেশদ্রোহী হয়ে যায়। কারণ, এরা প্রশ্ন করে। এদের সংস্কৃতি, ভাবনা, আদর্শের উপর থুপে দেওয়া হয় নিয়ন্ত্রণ। তাহলেই আর প্রশ্ন উঠবে না। কেউ রাস্তায় নামবে না। বিরোধিতা হবে না। মানুষের কথা হবে শাসকের মতো। প্রশ্ন হবে শাসকের পক্ষে। উত্তরও হবে শাসকের অনুকূলে। মানুষের নয়। আজ একজন রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে বিজেপি ১২ জন মুখ্যমন্ত্রীর চক্রব্যুহ বানাচ্ছে। কারণ, রাহুল গান্ধীকে পাবলিক দেখতে পাচ্ছে। তিনি হারিয়ে যাননি। রাস্তায় নেমে পড়লে আরও বেশি করে দেখবে মানুষ। শুনবে। ঠিক যেমন ককরোচদের কথা শুনছে। বিশ্বাস করুক না করুক, বিবেচনা করছে। ওটাই গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র। ভক্তি কখনো এমন পর্যায়ে যাবে না, যা চিন্তা-ভাবনা, বিবেচনার সিন্দুকে তালা মেরে দেয়। ককরোচ জনতা পার্টির সাফল্য এটাই—তারা ভারতবাসীকে আবার বিবেচনা করার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। এরও পক্ষ-বিপক্ষ থাকবে। আর তাহলেই গণতন্ত্র থাকবে। রবি ঠাকুর সেই কবে লিখে গিয়েছিলেন, ‘রাজত্ব একলা যদি রাজারই হয়, প্রজার না হয়, তা হলে সেই খোঁড়া রাজত্বের লাফানি দেখে তোরা চমকে উঠতে পারিস, কিন্তু দেবতার চোখে জল আসে।’
বিরোধী দলগুলো কি এখনও ফেসবুক করছেন?