Bartaman Logo
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নির্বাচন কমিশনের বোধোদয়

জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) বোধোদয় হয়েছে। বেশ ভালো কথা। একইসঙ্গে জিজ্ঞাসা, কিন্তু এত দেরিতে কেন? ভোটার লিস্ট সংশোধনের নামে যে বেনজির প্রক্রিয়ার অনুশীলন হয়েছে, দেশজুড়ে প্রশ্ন, প্রতিবাদ তাকেই ঘিরে।

নির্বাচন কমিশনের বোধোদয়
  • ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) বোধোদয় হয়েছে। বেশ ভালো কথা। একইসঙ্গে জিজ্ঞাসা, কিন্তু এত দেরিতে কেন? ভোটার লিস্ট সংশোধনের নামে যে বেনজির প্রক্রিয়ার অনুশীলন হয়েছে, দেশজুড়ে প্রশ্ন, প্রতিবাদ তাকেই ঘিরে। দেরিতে হলেও আপত্তি উঠেছে কমিশনেরই অন্দরে। তার মধ্যেই শনিবার হঠাৎই ঘোষণা করা হয়েছে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত। ইসিআইনেটের কার্যকারিতা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গড়া হবে। অন্তর্ভুক্ত হবেন একদল প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। তথাকথিত ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’র নোটিস পাওয়া ভোটারদের আর বাধ্যতামূলকভাবে নির্বাচনি দপ্তরে হাজিরা দিতে হবে না। এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক বরং বিএলওই যাবেন যন্ত্রণাক্লিষ্ট ভোটারের বাড়িতে নথি সংগ্রহের জন্য। এমন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। কিন্তু এর মধ্যেই অস্বস্তির প্রশ্নটি আরও প্রকট। কারণ, যে-ব্যবস্থাকে এতদিন ঠিকঠাক চলছিল বলে কমিশনের তরফে দাবি করা হচ্ছিল, তার প্রযুক্তিগত ত্রুটিহীনতা যাচাই করতে আজ নতুন কমিটি কেন? যে শুনানি-প্রক্রিয়াকে নাগরিকের পক্ষে মনে করা হচ্ছিল সহজ, সেটিই-বা হঠাৎ বাড়ি-বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন হল কেন? এসবই যদি শুরু থেকে করা হত, তবে এত ক্ষোভ জমত কি? সুপ্রিম কোর্টও দিল্লির এসআইআরে এই ধরনের নোটিসের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অর্থাৎ, নাগরিকের সুবিধা ও অধিকারকে প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রাখার প্রয়োজনীয়তা যে আজ নতুন করে আবিষ্কৃত হচ্ছে, সেটিই বরং প্রশ্নের বিষয়।

Advertisement

বিশেষত, কমিশনের দুই সদস্যের অন্তত ১৪টি লিখিত আপত্তির খবর প্রকাশ্যে আসার পরে এই প্রশ্ন এড়ানো কঠিন। অভিযোগগুলি যে নিছক রাজনৈতিক প্রচার নয়, কমিশন নিজেও সেই নথিগুলির অস্তিত্ব অস্বীকার করেনি। বরং সিদ্ধান্তগুলিকে সর্বসম্মত বলেই ব্যাখ্যা করেছে। এখন আবার ইসিআইনেট পরীক্ষা, ভোটার-পোর্টালের নতুন নীতি আগে কমিটিতে যাচাই, পুরানো ফর্ম ৬ ফিরিয়ে আনা, শুনানির পদ্ধতি বদল—এই ধারাবাহিক সংশোধনগুলি স্বাভাবিক প্রশাসনিক পরিমার্জন বলেই যদি ব্যাখ্যা করা হয়, তাতেও মূল প্রশ্নটি থেকে যায়: প্রথমে এত তাড়াহুড়ো করা হয়েছিল কোন ধান্দায়? কেনই-বা এত সংশোধন, এতদিন পরে? নির্বাচন কমিশন কোনো সাধারণ দপ্তর নয়। তার প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত থাকে নাগরিকের ভোটাধিকার এবং নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা। ফলে ‘ভুল হলে পরে শুধরে দেব’—এই প্রশাসনিক ধ্যাষ্টামো এক্ষেত্রে অচল। ভোটার তালিকায় একটি বৈধ নাম বাদ পড়ার অর্থ কেবল একটি ডেটা-এন্ট্রির ভুল নয়, গণতন্ত্রের দরজায় একজন নাগরিককে অনাবশ্যক দাঁড় করিয়ে রাখা, কিংবা চূড়ান্ত বঞ্চনা। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল—বাংলায় ১৬ লক্ষাধিক ভোটারের নাম নিয়ে ট্রাইবুনালে আবেদন করার মতো গুরুতর পদক্ষেপ! এক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের কর্তৃত্ব, পদ্ধতি এবং দায়বদ্ধতা সম্পর্কে এখনো যথেষ্ট স্বচ্ছতা নেই। এই প্রশ্নটি কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। একইসঙ্গে কমিশনের প্রকাশিত ‘ঐক্যের’ ছবি যত সুন্দরই হোক, গণতন্ত্রে ছবির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নথি। দুই কমিশনারের আপত্তির বিষয়গুলির নিষ্পত্তি কীভাবে হল? কোন সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন? কোন পর্যায়ে কী সংশোধন করা হল? এসবের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাই আজ জরুরি। কারণ, আস্থা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ফেরানো যায় না, তা তৈরি হয় স্বচ্ছতার মাধ্যমে।
শনিবারের সিদ্ধান্ত তাই শেষকথা নয়, বরং পরীক্ষার শুরু। কমিশন ভুল সংশোধনে আন্তরিক হল শুধু নতুন কমিটি গড়েই দায় সারতে পারবে না, তাকে প্রকাশ করতে হবে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলির পূর্ণাঙ্গ নথি, প্রযুক্তিগত নিরীক্ষার ফল, দায়বদ্ধতার কাঠামো এবং বাদ পড়া বৈধ ভোটারদের পুনর্বহালের স্বচ্ছ প্রক্রিয়া। বিরোধীদের রাজনৈতিক অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—তার বিচারের ভার জনগণের উপরই ছেড়ে রাখা হোক। কিন্তু ইসিআইয়ের নিজের কাজের হিসাব কমিশনকেই দিতে হবে। কারণ নির্বাচনের ফল নিয়ে বিতর্ক গণতন্ত্রে নতুন নয়, কিন্তু ভোটদানের অধিকার নিয়েই যদি সংশয় জন্মায়, তখন বিপদটা ফলাফলের নয়—গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতার। ভোটার তালিকায় একটি নাম মুছে ফেলা নিছক সফটওয়্যার-এন্ট্রি নয়, তার সঙ্গে যুক্ত থাকে একজন নাগরিকের ভোটাধিকার। কমিশনের সাম্প্রতিক সংশোধনমূলক পদক্ষেপ তাই প্রয়োজনীয়, কিন্তু যথেষ্ট নয়। আস্থা ফেরাতে হলে চাই পূর্ণ স্বচ্ছতা, প্রকাশ্য জবাবদিহি এবং সিদ্ধান্তগ্রহণের প্রতিটি স্তরে নিরপেক্ষতার দৃশ্যমান প্রমাণ। প্রশ্নটি শেষপর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, গণতন্ত্রের মৌলিক বিশ্বাসের—যে ভোটাদাতা ভোট দিতে চান, তাঁর নামটি কি রাষ্ট্র নিশ্চিতরূপে রক্ষা করবে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ