Bartaman Logo
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নিরপেক্ষ কনটেন্টের আড়ালে

গত ৩০ জানুয়ারি। ভোটের দামামা তখন পুরোদস্তুর বেজে গিয়েছে। সেই সময় কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের একটি নামজাদা রেস্তরাঁর বিফ না মাটন স্টেক, তা নিয়ে রীতিমতো হইচই শুরু হল। করলেন কে?

নিরপেক্ষ কনটেন্টের আড়ালে
  • ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রীতম দাশগুপ্ত: গত ৩০ জানুয়ারি। ভোটের দামামা তখন পুরোদস্তুর বেজে গিয়েছে। সেই সময় কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের একটি নামজাদা রেস্তরাঁর বিফ না মাটন স্টেক, তা নিয়ে রীতিমতো হইচই শুরু হল। করলেন কে? একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর। তাঁর পাশে হবু স্ত্রীকে নিয়ে চুপটি করে বসেছিলেন আর এক ক্রিয়েটর। এই প্রচারের জেরে জেলে যেতে হয়েছিল এক নিরীহ ওয়েটারকে।

Advertisement

নির্বাচন কমিশনে বিজেপি যে তথ্য জমা দিয়েছে তা সম্প্রতি প্রকাশ করেছে কমিশন। সেখানে দেখা গিয়েছে বাংলার একাধিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে সরাসরি অর্থ দিয়েছে বিজেপি। যেমন ওই দু’জনের একজন পেয়েছেন ২.৫ লক্ষ। আর চুপ থাকা ব্যক্তি সাড়ে সাত লক্ষ। তাও আবার বাবা-মায়ের নামে থাকা অ্যাকাউন্টে। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, এই অর্থপ্রাপ্তির কথা স্বীকারও করেছেন তাঁরা। তবে এক ক্রিয়েটরের দাবি, বিতর্কিত ভিডিয়োটির সঙ্গে অর্থপ্রাপ্তির কোনো সম্পর্ক নেই। খুব স্বাভাবিক যে, তাঁর ওই দাবি অধিকাংশ মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। কারণ ওই ভিডিয়োর ন্যারেটিভিটি ছিল, একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ সন্তানকে কৌশলে ‘গো-মাতা’ খাইয়ে দেওয়া হল। আর কে খাওয়াল? একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। ন্যারেটিভটা বিজেপির অতি প্রিয় এবং চেনা ছক। পশ্চিমবঙ্গের ভোট আবহে এই বিষয়টিকেই তুঙ্গে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন মোদি-শাহ। ফলও মিলেছিল। প্রথমবার বাংলার মসনদে বসতে পেরেছে বিজেপি। 
তালিকা বলছে, আর এক ক্রিয়েটর পেয়েছেন ১৩ লক্ষ টাকা। তাঁর জনপ্রিয় ভিডিয়ো যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন, কত দুঃস্বপ্নের রাত মুক্ত করার লড়াই ছিল ওই চিত্রনাট্যে। গল্পটা ছিল চোখের জলের হিসাব নিতে বাটন প্রেস করা। মানে পরিবর্তন আনা আর কি। তাতে ওই ক্রিয়েটরকে রীতিমতো হিরো বানিয়ে দিয়েছিল তাঁর ফলোয়াররা। মেরুদণ্ড বিক্রি হয়নি, এমন কনটেন্ট বানাতে দম লাগে...ব্লা ব্লা।তা এখন জানা যাচ্ছে শিরদাঁড়াটা তিনি আগেই বিক্রি করে দিয়েছিলেন পদ্মশিবিরের কাছে। যেটা জানতে পারেনি তাঁর ফলোয়াররা।
আর একজন আবার পেশায় প্রাক্তন আর জে। মাঝখানে তিনি নিজেই সমাজমাধ্যমে অমিত শাহের সঙ্গে এক টেবিলে বসার ছবি দিয়েছিলেন। এটা দোষের নয়। পেশার তাগিদে গিয়েছেন। ছবি তুলেছেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তাগিদটা ১৫ লক্ষেরও ছিল। যদিও সমাজমাধ্যমে তিনি সাফাই দিয়ে বলেছেন, ১৫ লক্ষ সংখ্যাটা ভুল। মানে বিজেপি ভুল তথ্য দিয়েছে। আর তিনি নাকি এমন কোনো কনটেন্ট দেননি, যেখানে বিজেপিকে সমর্থন করার কথা বলেছেন। অথচ ভোটের দিন দশেক আগে একটি কনেটেন্টেই তিনি বলেছিলেন, ‘কেন বদল দরকার। সবাই বিকাশ চায়, রাহুল চায় না। দেড় হাজারের চেয়ে তিন হাজার ভালো ...’ইত্যাদি। বিজেপির নাম তিনি নেননি ঠিকই কিন্তু বোঝাই যাচ্ছিল তিনি কাকে মসনদে চান।
আমি তিনজনের কথা বললাম। মানে এটা নয় যে, তিনজনেই পেয়েছেন। তালিকটা বেশ লম্বা। কনটেন্ট ক্রিয়েটর থেকে ইনডিপেনডেন্ট জার্নালিজমের বড়ো প্রচারক বেশ কয়েকজন। একজনের যেমন ১০ লক্ষ সাবস্ক্রাইবার, পেয়েছেন ৫১ লক্ষ। আড়াই লক্ষ ফলোয়ারের একটি মাধ্যমের ঘরে ঢুকেছে ২১ লক্ষ। একটি সমীক্ষক সংস্থা আবার সমীক্ষার পর সেটি প্রকাশ না করেও পেয়েছে ১৮ কোটি। কমিশন নিজেই তালিকা প্রকাশ করেছ। যে কেউ ইচ্ছা করলেই দেখে নিতে পারেন। এটা ঠিক, তালিকায় শুধু চেকপ্রাপকদেরই নাম আছে। নগদ কারবারিদের নাম নেই। তাই তালিকায় নাম না থাকলেও অর্থের সুবিধাভোগী আরও অনেকেই থাকতে পারেন। ভাবুন পাঁচ রাজ্যের ভোটে কংগ্রেস ব্যয় করেছে আড়াইশো কোটির কাছাকাছি। আর বিজেপি স্রেফ পশ্চিমঙ্গের ক্ষেত্রে একাই করেছে প্রায় ২৮৭ কোটি। বোঝাই যাচ্ছে রাজ্য দখলে কতটা মরিয়া ছিল তারা। আর এই টাকার একটা ভালো অংশ নিঃশব্দে গিয়েছে কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা ‘ইনডিপেনডেন্ট’ জার্নালিস্টদের কাছে। তারা যদি বিজ্ঞাপন বাবদ টাকা নিতেন, কথা উঠত না। কিন্তু এখানে উদ্দেশ্য তো জনমত তৈরি নয়, কিনে নেওয়া।
কেন এই প্রবণতা সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর? প্রথমত, এটি ইনডিপেনডেন্ট বা স্বাধীন মুখের আড়ালে স্পনসর্ড প্রোপাগান্ডা। সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের মূলধন কী? সেটি হল দর্শকের আস্থা ও ভরসা। ধরুন আপনি মোদির ভাষণ শুনছেন, আপনি জানেন মোদি বিজেপির পক্ষেই বলবেন। মমতা বললে সেটা তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে হবে। আর মীনাক্ষী প্রচার করবেন সিপিএমের হয়ে। কারণ এটি তাঁদের দলীয় প্রচার। কিন্তু নিরপেক্ষতার আড়ালে ইনফ্লুয়েন্সাররা প্রচার করলে আপনি বুঝতেই পারবেন না, কীভাবে মন-মস্তিষ্ক প্রভাবিত হয়ে যাচ্ছে। কারণ আপনি ধরেই নেন, এটি তাঁদের স্বাভাবিক ও পক্ষপাতহীন প্রতিক্রিয়া।এখানেও যে অর্থের খেলা আছে, সেটা আপনি জানতেই পারবেন না।
বিজেপি এই তথাকথিত নিরপেক্ষ মুখগুলিকে দিয়ে পরিকল্পিত চিত্রনাট্য গিলিয়েছে। সাধারণ ভিডিয়ো, প্যারোডি বা সমাজসেবামূলক কনটেন্টের আড়ালে বিরোধীদের আক্রমণ করা হয়েছে। এবং সবচেয়ে বড়ো কথা, সুনির্দিষ্ট প্রচার চালানো হয়েছে কোনোরকম পেইড প্রোমোশন বা স্পনসর্ড ঘোষণা ছাড়াই। এটি কোনো পেশাদারি কাজ হতে পারে না। এটি সরাসরি দর্শকের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা, তঞ্চকতা ও বিশ্বাসঘাতকতা। 
দ্বিতীয়ত, যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক তা হল, কনটেন্টের প্রকৃতি। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচনের ঠিক আগে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্কিত স্পর্শকাতর ভিডিয়ো ও উস্কানিমূলক আলোচনা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। যখন কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে কোনো ক্রিয়েটর সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করার উদ্যোগে শামিল হন, তখন তাঁকে আর ক্রিয়েটর বলা যায় না। কারণ তিনি তাঁর শিল্পীসত্তা হারিয়ে ফেলেছেন।তিনি পরিণত হন নিছক বেতনভুক রাজনৈতিক কর্মীতে। 
তৃতীয়ত, ডিজিটাল যুগের এই ইনফ্লুয়েন্সাররা দেখিয়ে দিলেন, সঠিক দাম পেলে নীতি, আদর্শ ও বিবেক—সবকিছুই বিক্রি করা সম্ভব। সোজা কথায়, ‘মনের মতো দামটি পেলে, তবেই কেনা যায়’। এটি বাংলার সংস্কৃতি আগে ছিল না। আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে ইউটিউব বা ইনস্টাগ্রাম কেবল বিনোদন নয়, তাদের মতাদর্শ গঠনের একটা মাধ্যম। দেখেছেন তো স্বয়ং মোদিজিও তাঁর মন্ত্রীদের বলেছিলেন, ইনস্টাতে ফলোয়ার বাড়াও। এই তরুণ ক্রিয়েটররা যদি নিজেদের রিচ ও ফলোয়ার সংখ্যাকে কোনো দলের আইটি সেলের জিম্মায় বন্ধক রাখেন, তবে সেটা বিপজ্জনক প্রবণতা। 
সবশেষে বলা যায়, ভোট ঘোষণা হলে আদর্শ আচরণবিধি চালু হয়। ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রচার শেষ হয়। কিন্তু এই সব ক্রিয়েটরদের ক্ষেত্রে সেসব নিয়ম পুরো খাটে না। তাই একজন ক্রিয়েটর বিধি উপেক্ষা করে ঘুরিয়ে প্রচার করতেই পারেন।
এখন যে কেউ বলতেই পারেন, কোনো সরকারের সমালোচনা করে কনটেন্ট তৈরি করাটা কি অন্যায়? উত্তর না। রাজনৈতিক দলের হয়ে অর্থ নিয়ে প্রচার করা কি নতুন কোনো বিষয়? মোটেও নয়। কিন্তু একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর যদি এমনভাবে রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপন করেন, যাতে মনে হবে সেটি তাঁর স্বাভাবিক, স্বাধীন, ব্যক্তিগত মতামত, তাহলে অর্থদাতা অনেক বেশি সুবিধা পেয়ে যান। অর্থদাতার পরিচয় গোপন রাখাটা আরও বেশি অনৈতিক। বিজ্ঞাপনের একটা সাধারণ নিয়ম ও গাইডলাইন আছে। যেখানে স্পষ্ট বলা আছে, গুরুত্বপূর্ণ টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন স্পষ্টভাবে দেখাতে হবে। মানে এটি যে পেইড সেটি বুঝিয়ে দিতে হবে। এছাড়া বলা আছে, অফেন্সিভ বিষয় নিয়ে কনটেন্ট বানানো যাবে না। এই সাধারণ নিয়মগুলিকেই অস্বীকার করেছেন এই ক্রিয়েটররা। রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে বলার মতো কিছু ছিল না, এমনটা তো নয়। যে কেউ সরকারের বিরোধিতা করে কনটেন্ট বানাতেই পারেন। এতে দোষের তো কিছু নেই। কিন্তু দোষটা তখনই হয়, যদি আপনি অপর পক্ষের থেকে টাকা নিয়ে বিশেষ উদ্দেশ্যে কনটেন্ট বানান। আর আপনার দর্শকের সামনে নিজেকে নিরপেক্ষ বলে তুলে ধরেন। এটা দ্বিচারিতা। 
কনটেন্ট যদি রাজনৈতিক প্রচার হয়, তাকে রাজনৈতিক প্রচার হিসাবেই চিহ্নিত করা হোক। কারণ গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রচারের অধিকার যেমন আছে, তেমনই নাগরিকের জানার অধিকারও আছে। আজ যে কনটেন্ট ক্রিয়েটর বিজেপির কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন, কাল তিনি অন্য কোনো দলের কাছ থেকেও টাকা নিতে পারেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো দলের টাকা নয়—তাঁর দর্শকের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস একবার যদি অর্থের জন্য টলে যায়, তখন ঘোর সমস্যা। তাই প্রশ্ন এটা নয়, ‘বিজেপির কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন কেন?’আসল প্রশ্ন হল,‘টাকা নেওয়ার কথা কি আপনার দর্শককে স্পষ্ট করে বলেছেন?’ কারণ রাজনৈতিক মতামত বিক্রি করা আর রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন করা—দুটির মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। সেটি হল স্বচ্ছতা। আজ এটা স্পষ্ট হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়ার তথাকথিত ‘সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর’ আসলে কোটি টাকার কেনা স্ক্রিপ্ট ছাড়া আর কিছুই নয়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ