মাসখানেক আগে, আগস্ট মাসের এক মধ্যরাতে রাজ্যের ‘গর্বের’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢুকে বেপরোয়া তাণ্ডব চালিয়েছিল বহিরাগতরা। সেই ঘটনায় আরএসএস-এর ছাত্র সংগঠন এবিভিপির বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসিটিভি ক্যামেরায় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কয়েকজন পরিচিত মুখের ছবি দেখা গেলেও তাঁরা এখনও বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। রবিবার প্রায় একই চিত্রনাট্য দেখা গেল রাজ্যের আর এক গর্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে (এসআরএফটিআই)। অভিযোগ, এখানে বহিরাগত পরিচয়ে হাজির আরএসএসের আর এক শাখা সংগঠন অখিল ভারত গ্রাহক পঞ্চায়েত, সংক্ষেপে এবিজিপি। ১৯৯৫ সালে তদানিন্তন কেন্দ্রীয় সরকার এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করে কলকাতায়। প্রথাগত বিষয় নয়, এখানে সিনেমা ও টেলিভিশনের বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা প্রদান করা হয়। বস্তুত, কলকাতায় এখনও যে ক’টি জাতীয় প্রতিষ্ঠান মেধা ও উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসাবে গোটা দেশে স্বীকৃত, এসআরএফটিআই তার মধ্যে অন্যতম। গত বছর এই প্রতিষ্ঠানটি ‘ডিমড’ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পেয়েছে। নিত্যদিনের রাজনৈতিক বিতর্ক, সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে ছাত্র আন্দোলনের বাইরে থাকা এই প্রতিষ্ঠানে রবিবার সংঘ ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে পড়ুয়াদের সংঘর্ষে দেখা গেল লাঠি রড-এর নির্বিচার আস্ফালন, ঝরল রক্ত। সেই রক্ত দিয়ে ক্যাম্পাসের দেওয়ালে ইংরাজিতে কেউ বা কারা লিখল ‘আরএসএস’, সমাজমাধ্যমে যে ছবি রীতিমতো ভাইরাল! শিক্ষাঙ্গনে এ কীসের ইঙ্গিত?
ঘটনার উৎসস্থল ক্যাম্পাসের অডিটোরিয়াম। গোটা রাজ্যের প্রায় কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ না থাকলেও এখানে একটি ছাত্র সংসদ রয়েছে। সেই ছাত্র সংসদের দাবি, এই অডিটোরিয়ামটি পড়ুয়াদের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস এবং সিনেমা-টেলিভিশন বিষয়ক বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু অনুষ্ঠানের আয়োজক এবিজিপি ছাত্রদের বিভিন্ন অভিধায় ভূষিত করে স্লোগান দিতে থাকে বলে পড়ুয়াদের অভিযোগ। সেইসঙ্গে জয় শ্রীরাম, প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর নামে জয়ধ্বনি। এর প্রতিবাদ করতে গিয়েই আক্রান্ত হন পড়ুয়ারা। আয়োজকদের অবশ্য পালটা দাবি, ছাত্ররা তাদের অনুষ্ঠান (যার অনুমতি ছিল) পণ্ড করে দিতে বলপূর্বক কর্মী-সমর্থকদের বাস-গাড়ি ক্যাম্পাসের ভিতর আটকে রাখে। তাদের আরও অভিযোগ, এমনকি ভারতমাতা, বিবেকানন্দের প্রতিকৃতি নষ্ট করেছে। এই অভিযোগ, পালটা অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আপাত শান্ত ক্যাম্পাস। যদিও প্রত্যক্ষদর্শী কারো কারো অভিজ্ঞতা হল, একটা সময় গোটা ক্যাম্পাস চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলে বহিরাগতরা। ছাত্রছাত্রীদের উপর বেপরোয়া আক্রমণ নেমে আসে। তার জেরে গুরুতর আহত কয়েকজনকে হাসপাতালে ভরতি করতে হয়। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত চলা এই অশান্ত পরিস্থিতি অনেক পরে নিয়ন্ত্রণে আসে পুলিশের হস্তক্ষেপে। এ বিষয়ে তিনটি অভিযোগও দায়ের হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, যে প্রতিষ্ঠানের অডিটোরিয়াম মূলত লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের হাতে-কলমে শিক্ষা দিতে ব্যবহার হয়, তা কেন এবং কার নির্দেশে ভিন্ন কারণে একটি বাইরের সংগঠনকে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হল? আর ক্যাম্পাসের বাইরে এত বহিরাগতদের ভিড় হলই বা কী করে? পাশাপাশি এই প্রশ্নও উঠেছে, কলকাতায় এত মঞ্চ থাকতে কেন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অডিটোরিয়ামটিকেই বেছে নিলেন উদ্যোক্তারা? যার জেরে শিক্ষাঙ্গনের শান্ত পরিবেশ নষ্ট হল? হয়ে উঠল সংঘর্ষের ক্ষেত্র? তাহলে কি এর পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক কোনো গোপন অভিসন্ধি?
উত্তরটা অবশ্য প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে। মেধা ও উৎকর্ষের বিচারে যে প্রতিষ্ঠানগুলি জাতীয়-আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সমাদৃত, যেমন দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতার যাদবপুর ও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় অথবা সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ইনস্টিটিউট— সর্বত্রই পড়ুয়া ও শিক্ষকদের একাংশকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ ‘দিমাগি নকশাল’, ‘জঙ্গি’, ‘পাকিস্তানের চর’-এর মতো বাছা বাছা বিশেষণে দাগিয়ে দেওয়ার পরিকল্পিত কৌশল নিয়েছে হিন্দুত্ববাদী কোনো কোনো সংগঠন ও শাসকদল। এই অভিযোগ নতুন নয়। কয়েকদিন আগে যাদবপুরের ক্ষেত্রেও তা দেখা গিয়েছে। রবিবার শোনা গেল সত্যজিৎ রায়ের নামাঙ্কিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও। অথচ এই প্রতিষ্ঠানের সিংহভাগ ছাত্রছাত্রীই দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এখানে পড়তে এসেছেন সর্বভারতীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে। এমনই একজন ছাত্রী এসেছেন উত্তরপ্রদেশের যোগী রাজ্য থেকে। ক্যাম্পাসের মধ্যে এমন এক নিদারুণ আক্রমণের শিকার হয়ে ছাত্রীটিকে বলতে শোনা গিয়েছে, এই রাজনীতির কারবারিরা ‘রামকে’ নিয়ে ব্যবসা করছে, ওরা মেয়েদের গায়ে হাত দিয়েছে, ছাত্রদের মেরেছে। রামের ধর্ম তো ‘সবাইকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলে’—বলেছেন ওই পড়ুয়াটি। আরও বলেছেন, কলকাতায় এমন ঘটনা তিনি ভাবতেই পারেন না। এসআরএফটিআই-এর ঘটনা নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সমালোচনার ঝড় উঠলেও এ রাজ্যের বিজেপি এবং এবিভিপি নেতৃবৃন্দ যথারীতি দায় ঝেড়ে ফেলে বলেছেন, এর সঙ্গে তাদের কোনো যোগ নেই। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার পর এমন বালখিল্য যুক্তি দিয়ে সত্যিই কি দায় ঝেড়ে ফেলা যায়? রাজ্যের মানুষ কি চোখে ঠুলি পড়ে বসে আছে বলে মনে করেন শাসকগোষ্ঠী? সবচেয়ে বড়ো কথা হল, ভিন রাজ্যের পড়ুয়া-শিক্ষকদের অংশগ্রহণে চলতে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনায় কি গোটা দেশের কাছে ভালো বার্তা যাচ্ছে? দায় না এড়িয়ে বোধহয় রাজ্যের শাসকদলের এসব ভেবে দেখার সময় এসেছে।