Bartaman Logo
১১ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

প্রশ্ন তো করবেন! কিন্তু কাকে?

অভিনেতা শেখর সুমন তাঁর স্ট্যান্ড আপ শোতে সম্প্রতি মোক্ষম একটি ব্যঙ্গচিত্র তুলে ধরেছেন। ক্লাসে অ্যাটেনডেন্স নিচ্ছেন তিনি... ‘ভ্রষ্টাচার?’ উত্তর এল, প্রেজেন্ট স্যার।

প্রশ্ন তো করবেন! কিন্তু কাকে?
  • ১১ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: অভিনেতা শেখর সুমন তাঁর স্ট্যান্ড আপ শোতে সম্প্রতি মোক্ষম একটি ব্যঙ্গচিত্র তুলে ধরেছেন। ক্লাসে অ্যাটেনডেন্স নিচ্ছেন তিনি... ‘ভ্রষ্টাচার?’ উত্তর এল, প্রেজেন্ট স্যার। 

Advertisement

—মূল্যবৃদ্ধি?
—প্রেজেন্ট স্যার। 
—ঘৃণা?
—প্রেজেন্ট স্যার। 
—বেকারত্ব? 
—প্রেজেন্ট স্যার। 
—গণতন্ত্র? (সাড়া না পেয়ে আবার) গণতন্ত্র...?
—স্যার, ও আর আসবে না। 
—আসবে না? কেন আসবে না?
—স্যার ও আসলে প্রচুর প্রশ্ন করত, তাই ওকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। 
—বের করে দিয়েছে? অদ্ভুত ব্যাপার! মানছি ও ক্লাসের মধ্যে সবথেকে মেধাবী ছিল না, কিন্তু সবথেকে জরুরি ছিল। গোটা ক্লাস চুপ করে গেলেও গণতন্ত্র একমাত্র হাত তুলে প্রশ্ন করত... স্যার... কেন? বহুবার ওকে অভদ্র বলা হয়েছে। বহুবার বোঝানো হয়েছে, ভয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু সে প্রশ্ন করা ছাড়েনি। কারণ গণতন্ত্র জানত, যেদিন ও প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেবে, সেদিন থেকে বই খোলা থাকবে ঠিকই... কিন্তু মস্তিষ্ক বন্ধ হয়ে যাবে। মানুষ জাগ্রত হবে না। আর দেশ জাগ্রত না হলে আর গণতন্ত্র বেঁচে থাকে না। শুধু ভিড় থেকে যায়। 
শেখর সুমনের এই ব্যঙ্গবাণ মনে পড়ার কারণ? আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত শনিবার বলেছেন প্রশ্ন করতে। অবাক কাণ্ড বটে। গত ১২ বছরে যিনি একটিও সাংবাদিক সম্মেলন করেননি, একটিও প্রশ্ন নেননি, তিনিই আজ প্রশ্ন করতে বলছেন? সাক্ষাৎকার দিয়েছেন খান দুই-তিনেক ঠিকই। সেটাও নিজের পছন্দের মাইক ধরে। পছন্দের প্রশ্নে। শেখর সুমনের ক্লাসের সেই বহিষ্কৃত শিশু... মানে গণতন্ত্র এই উপদেশ শুনে থেকে হেসে কুটিপাটি হচ্ছে। প্রশ্ন করবে? কে করবে? কাকে করবে? এই জমানায় তো প্রশ্ন ও প্রশ্নকর্তা দুই-ই আগেভাগে ঠিক করে দেওয়া হয়। প্রশ্ন পছন্দ না হলে সাংবাদিক বা পড়ুয়া হয়ে যান আরবান নকশাল। না হলে সংবাদমাধ্যমের দপ্তরে ইডি গিয়ে বলে, ‘মাসিমা মালপো খামু’। গণতন্ত্র বলছে, এর পরও হাসব না? কত্ত মজা! রাখব কোথায়? তবে হ্যাঁ, মোদিজি বক্তব্যে একটু টুইস্টও রেখেছেন। বলেছেন, প্রশ্নের উত্তরও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা করতে হবে। দারুণ প্রস্তাব। ও হ্যাঁ, এই প্রস্তাব নিশ্চয়ই জেন জির জন্য? নাম উচ্চারণ না করলেও নতুন প্রজন্মই যে তাঁর উপদেশের টার্গেট, তা বোঝার জন্য আর্যভট্ট হতে হবে না। কিন্তু যে সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে না?
কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক।
১) গত ১০ বছরে কেন্দ্র-রাজ্য মিলিয়ে ১৫২টি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। সাড়ে ৭ কোটি ছাত্রছাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারও সাজা হয়নি। কেন? 
২) নিট দুর্নীতিতে সিবিআই তদন্তের জন্য আন্দোলন পর্যন্ত অপেক্ষা কেন করতে হল? আগেই কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? 
৩) কেন ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে আগেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা দিলেন না?
৪) রান্নার গ্যাসের দাম ৪১০ টাকা থেকে এই ১২ বছরে বেড়ে ৯৬৮ টাকা হয়েছে। পেট্রলের দাম বেড়েছে লিটারে ৪০ টাকা, ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩০ টাকা। সরকার এর সুরাহায় কী করেছে?
৫) যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোদিজি ক্ষমতায় এসেছিলেন, তার মধ্যে প্রধান দু’টি হল—সব কালো টাকা ফিরিয়ে আনতে পারলে সবার অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা (এখন অন্ধভক্তরা অবশ্য ওই ‘ফিরিয়ে আনতে পারলে’ শব্দটির উপরই জোর দিচ্ছেন) এবং বছরে ২ কোটি চাকরি। হয়নি কেন? 
৬) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে কুকথা বললে, তাঁর উপর ইট-জুতো পড়লে সেটা জনরোষ। আর প্রধানমন্ত্রীর নামে মিম হলে কেউ খারাপ কথা বললে সেটা রাষ্ট্রদ্রোহ কেন?
৭) ভোটের আগে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে সাড়ে চারশো টাকায় গ্যাস মিলবে। এবং ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ফ্রি। সেটা কবে পাওয়া যাবে?
৮) তদন্তে সহযোগিতা করা অভিযুক্ত গভীর রাতে এনকাউন্টারে মারা যায় কেন? অভিযুক্ত বিরোধী শিবিরের হলেই তার বাড়িতে বুলডোজার চলে কেন? বিরোধী নেতানেত্রী ছাড়া কেউ কি দুর্নীতি করে না? তাহলে শুধু বিরোধীদের বাড়িতেই কেন ইডি-সিবিআই যায়?
৯) অভয়া দিবস পালন হয়। কিন্তু উন্নাও বা হাতরাস দিবস হয় না কেন? 
১০) কেন শাসকের গড়ে ধর্ষণের খবর কভার করতে যাওয়া সাংবাদিককে জেলে পচতে হয়?
১১) ছাত্রছাত্রীদের উপর পেলেট গান চালানোর নির্দেশ কে দেয়? কার নির্দেশেই বা পুলিশ একে-৪৭ নিয়ে মিছিল-সমাবেশ প্রতিরোধ করতে যায়?
১২) সংসদে উপস্থিত থেকেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কেন সভায় আসেন না? কেন তিনি বিরোধীদের প্রশ্নের জবাব দেন না?
এমন প্রশ্ন আরও আছে। অনেক। আজকের প্রজন্ম দূরঅস্ত, সাধারণ কোনো মানুষ কি এইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে? জবাব এর মিলবে শুধু শাসকের ঘরে। এবার প্রশ্ন হল, সরকার সেই উত্তর দেবে তো? না, দেবে না। এই জবাব শাসক দেওয়ার মতো দায়বদ্ধ হলে প্রশ্নই তো উঠত না। 
সর্বভারতীয় এক দৈনিকে কলম ধরেছেন সাবিহা খানুম। উমর খালিদের মা। সেই উমর খালিদ, যিনি ছ’বছর ধরে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে জেলবন্দি। বিনা বিচারে। সাবিহা খানুমের প্রবন্ধের শিরোনাম, ‘ওর শব্দগুলো মুক্ত, ও নয়’। কারণ, যে বিষয়ের উপর পিএইচডি করছিলেন উমর, সেই বই প্রকাশ হয়েছে। বাজারে এসেছে। বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু সেই বইয়ে অটোগ্রাফ দেওয়ার জন্য উমর উপস্থিত নেই। তিনি জেলে। কারণ, তিনি দেশবিরোধী। সাবিহা প্রশ্ন তুলেছেন, ‘কাশ্মীরের মানবাধিকার কর্মী পারভেজ খুররামকে সাড়ে চার বছর পর জামিন দিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট। তারা বলেছে, বহু বছর জেলে রয়েছেন পারভেজ। ইউএপিএ ধারাতেই অভিযুক্ত। আর তাঁর মামলার শুনানিও দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এটাই যথেষ্ট পারভেজের জামিন মঞ্জুরের জন্য। অথচ, এই একই বিচারক কয়েক মাস আগে আমার ছেলের জামিনের আরজি খারিজ করেছেন। ততদিনে কিন্তু উমরের পাঁচ বছর জেল খাটা হয়ে গিয়েছে। তখন আদালত জানিয়েছিল, শুনানিতে দেরি হওয়াটাই জামিন পাওয়ার কারণ হতে পারে না। কীভাবে একই আইনে, একই বিচারকের এজলাসে দু’রকম রায় হতে পারে?’
এই প্রশ্ন উমর খালিদের মায়ের। সরকারের কাছে নিশ্চয়ই তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার পাকাপোক্ত প্রমাণ আছে। কিন্তু সেই প্রমাণ আদালতের সামনে পেশ করাটাও রাষ্ট্রের কর্তব্য। কারণ, এই দেশে আইন সবার জন্য সমান। রাষ্ট্রের যেমন বিচারের ক্ষমতা আছে, নাগরিকেরও অধিকার রয়েছে আত্মসমর্থনের। আর তা যদি ভারতের নাগরিক না পায়, প্রশ্ন উঠবে। এই উত্তর কিন্তু নিজেদের মধ্যে খুঁজে নেওয়া যাবে না। যাঁদের নির্বাচিত করে সরকারের পাঠানো হয়েছে, জবাব দিতে হবে তাঁদেরই। নতুন প্রজন্ম সেই উত্তর পাওয়ার দাবিতেই পথে নামছে। সাবিত্রীবাই ফুলের দিকে গোবর ছুড়েছিলেন কট্টরপন্থীরা। কারণ, সাবিত্রীদেবী মহিলা শিক্ষার প্রসার চেয়েছিলেন। স্কুল খুলেছিলেন মেয়েদের জন্য। হামলাকারীরা চায়নি, নারী সমাজ প্রশ্ন করতে শিখুক। প্রশ্ন করলেই উত্তর দিতে হবে। আর উত্তর দিতে না পারলে বাড়বে ক্ষোভ। সংসারে। সমাজে। দেশে। প্রশ্ন কিন্তু আজও উঠছে... কেন কালি ছোড়া হল নেহা বোরাকে? প্রশ্ন তুলছেন বলেই? এই উত্তর কার থেকে পাওয়া যাবে? একটা প্রজন্ম প্রশ্ন করছে। প্রশ্ন করছে ভোটারও... শাসক পছন্দ নয় বলেই তো বিরোধীকে ভোট দিয়েছিলাম! তাহলে আজ সে শাসক শিবিরে কেন? এমন ভোটের দাম কোথায়? প্রশ্ন করছে কি গণতন্ত্রও? হয়তো না। সে হাসছে। আর অপেক্ষা করছে...। স্কুলে আবার ডাক পাওয়ার।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ