সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: বন্যা ও অসম—দু’টি নাম যেন এক অবিনাশী ট্র্যাজেডির সমার্থক। প্রতিবছর বর্ষা আসে। ব্রহ্মপুত্র ও তার উপনদীগুলি ফুঁসে ওঠে। ভাঙন ধরে মাটির বাঁধের গায়ে। চোখের পলকে তলিয়ে যায় বিঘার পর বিঘা ফসলি জমি, হাজার হাজার ঘরবাড়ি। কিন্তু চলতি ২০২৬ সালের বন্যা যেন আগের সমস্ত নির্মম অভিজ্ঞতাকে ফিকে করে দিয়েছে। এ বছর বর্ষার শুরু থেকেই এক অদ্ভুত আবহাওয়ার মুখোমুখি হয়েছিল উত্তর-পূর্ব ভারত। জুলাইয়ের শেষভাগে উজান অসমের শিবসাগর, চরাইদেও, ডিব্রুগড়, গোলঘাট বা জোরহাটের উপর দিয়ে যে তাণ্ডব বয়ে গেল, তা কোনো ঋতুভিত্তিক স্বাভাবিক বন্যা নয়। বরং চরম কাঠামোগত, ভূ-প্রাকৃতিক এবং মানুষসৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয়।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, মৃত্যুসংখ্যা ১০০ ছুঁয়ে ফেলেছে। প্লাবিত কয়েকশো গ্রাম। গৃহহীন লক্ষাধিক মানুষ। কিন্তু এসব শুধুই পরিসংখ্যান। এই সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে কি কোনোদিন ধ্বংসের প্রকৃত অভিঘাত মাপা যায়? পরিসংখ্যানে কি লেখা থাকে সেই প্রবীণ দম্পতির চোখের জল, যাঁদের জীবনের শেষ সম্বলটুকু একরাতে কাদা জলের তলায় তলিয়ে গিয়েছে? কিংবা সেই অসহায় মায়ের কথা, যে জানে না কাল সকালে তার ছেলের খাবারের থালাটা ভরবে কি না?
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—কেন এই বন্যা? ঐতিহ্যগতভাবে বন্যাপ্রবণ ধেমাজি বা লখিমপুর যেখানটা এবছর তুলনামূলক কম প্লাবিত হল, সেখানে শিবসাগর বা চরাইদেওর মতো তুলনামূলক ‘নিরাপদ’ অঞ্চলগুলি কেন একরাতে জলের তলায় তলিয়ে গেল? এত বিপুল পরিমাণ জল আর কাদামাটির উৎসই বা কী? প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বহুগুণ বেড়েছে। ১৭ থেকে ২২ জুলাইয়ের মধ্যে অসম, অরুণাচল ও নাগাল্যান্ডের পাহাড়ি এলাকায় একযোগে প্রায় ১৩৭ মিলিমিটার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছিল। কিন্তু শুধু বৃষ্টির দিকে আঙুল তুললে ভুল হবে। ২০২৬ সালকে যেখানে বিশ্বজুড়ে ‘গডজিলা এল নিনো’-র প্রভাবে খরা ও দাবদাহের বছর বলা হচ্ছিল, যেখানে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত অসমে প্রায় ৩০ শতাংশ বৃষ্টির ঘাটতি ছিল, সেখানে হঠাৎ এই ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া প্লাবন প্রমাণ করে—অসমের বন্যা আর শুধুই বৃষ্টির পরিমাণের উপর নির্ভর করে নেই।
এই বিপর্যয়ের শুরু হয়েছে মানুষের অবিবেচক হস্তক্ষেপে—যার অন্যতম প্রধান কারণ নাগাল্যান্ডে ‘র্যাট-হোল’ কয়লা খনন এবং অনিয়ন্ত্রিত পাথর ও বালি উত্তোলন। প্রখ্যাত ভূ-বিজ্ঞানী শৈলেন বরঠাকুর সহ একাধিক বিশেষজ্ঞ এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা ভূ-তাত্ত্বিক কারণটি সামনে এনেছেন। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭১(এ) অনুচ্ছেদের সুযোগ নিয়ে নাগাল্যান্ডের মন, মোকোকচুং, লংলেং, ওখা ও তুয়েনসাং জেলার পাহাড়ি এলাকায় শত শত বেআইনি কয়লা খাদান চালানো হচ্ছে। এই ‘র্যাট-হোল’ খননের ফলে পাহাড়ের গায়ে হাজার হাজার ছোটো ও গভীর গর্ত তৈরি হয়।
অসম-নাগাল্যান্ড সীমান্তের বরাইল পর্বতমালা মূলত নরম ও ভঙ্গুর শিলা দিয়ে গঠিত। বর্ষার জল এই খনন করা গর্তগুলিতে ঢুকে পাহাড়ের অভ্যন্তরে জমা হতে থাকে। ফলে পাহাড় তার স্বাভাবিক ভারসাম্য এবং জল ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। যখন একনাগাড়ে বৃষ্টি হয়, তখন পাহাড়ের ভিতর জমা হওয়া জল এবং আলগা হয়ে যাওয়া শিলাখণ্ড একসঙ্গে ভয়াবহ ধসের সৃষ্টি করে। এই বিশাল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ জল, পলি ও কাদা হঠাৎ করে নেমে আসে দিকখো, দিসাং, ঝাঞ্জি ও ভোগদৈ নদীর উপত্যকায়।
এই তত্ত্বের সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ মিলছে বন্যা পরবর্তী পলির পরিমাণে। ডঃ বরঠাকুরের মতে, স্বাভাবিক বন্যায় প্লাবিত এলাকায় ১-২ ফুট পলি জমা হয়। কিন্তু এবছর শিবসাগর ও চরাইদেওর বিভিন্ন গ্রামে বাড়িঘর, কৃষিজমি ও রাস্তাঘাটের উপর ৭-১৫ ফুট পর্যন্ত কাদা ও পলির আস্তরণ জমে গিয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় ভয়াবহ ধস এবং পাহাড়ি নদীগুলির অববাহিকায় অবৈধ পাথর উত্তোলনের ফলেই যে এই বিপুল পলির সৃষ্টি, তা স্পষ্ট।
এই দুর্যোগের পিছনে প্রশাসনিক গাফিলতিও কম দায়ী নয়। নাগাল্যান্ড সীমানা থেকে নেমে আসা জল যে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, সে বিষয়ে নাগাল্যান্ড সরকার আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছিল বলে দাবি। তবুও ‘অসম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’ কেন সেই সতর্কতার গুরুত্ব বুঝতে পারল না? ভারতের আবহাওয়া দপ্তর বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছিল। স্যাটেলাইট ইমেজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জিআইএস ব্যবহার করে কোন কোন গ্রাম প্লাবিত হতে পারে, কোন কোন বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ, কত মানুষকে উদ্ধার করতে হবে—এই হিসাব যদি জল ঢোকার পর করা হয়, তবে তা আগাম সতর্কতা নয়, তা প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
চরাইদেওর নাজিরা এলাকার প্রাক্তন বিধায়ক দেবব্রত সৈকিয়া দীর্ঘদিন ধরে দিকখো নদীবক্ষে বেআইনি পাথর-বালি উত্তোলনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর গুয়াহাটি হাইকোর্ট অসম সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিল যে, একটি ডেডিকেটেড ‘মাইনস অ্যান্ড মিনারেলস টাস্ক ফোর্স ব্যাটালিয়ন’ এবং নদী সংরক্ষণের জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করতে হবে। কিন্তু সেই নির্দেশ আজও খাতায়-কলমেই আটকে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই আজকের ধ্বংসলীলার পথ প্রশস্ত করেছে।
আমাদের সবচেয়ে বড়ো বিড়ম্বনা হল দেশের ‘ফ্লাড গভর্নেন্স’। সংবিধান অনুযায়ী, ‘জল’ একটি রাজ্যভিত্তিক বিষয়। কিন্তু নদী তো কোনো রাজনৈতিক সীমানা চেনে না! ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকা তিব্বত, অরুণাচল, নাগাল্যান্ড, মেঘালয় হয়ে অসমে ঢুকে বাংলাদেশে মিশেছে। অথচ আমাদের বন্যা নিয়ন্ত্রণ নীতি চলে রাজ্যভিত্তিক খণ্ড খণ্ড ভাবনায়।
তবে এই ঘন অন্ধকারের মধ্যেও এক চিলতে আলোর রেখা ফুটে উঠেছে অসমের সাধারণ মানুষের সংবেদনশীলতায়। যে কাদা জল কেড়ে নিয়েছে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, সেই জলের উপর দিয়েই ভেসে উঠেছে ভেদাভেদহীন মানবিকতার সেতু। সরকারি ত্রাণ পৌঁছানোর অনেক আগেই স্থানীয়রা নিজেদের তৈরি করা ভেলা ও নৌকা নিয়ে বানভাসি মানুষকে উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। অসমের সাংবাদিক, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ছাত্র সংগঠন, চিকিৎসক থেকে শুরু করে প্রতিবেশী জেলা লখিমপুরের সাধারণ মানুষ ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে ছুটে গিয়েছেন শিবসাগর বা চরাইদেওর দুর্গম অঞ্চলে। ত্রাণশিবিরে যখন একটা শিশুর জন্য এক ফোঁটা দুধ বা প্রবীণ দম্পতির জন্য ওষুধের প্রয়োজন পড়েছে, তখন কেউ কারও জাত, ধর্ম, ভাষা, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা পদবি জানতে চায়নি। অসমের বহু দশকের জাতীয়তাবাদী কিংবা গোষ্ঠীগত বিভাজনের রাজনীতিকে মুছে দিয়ে বন্যার জলে অসমে একটিমাত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—তা হল সকলে ‘মানুষ’। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, সমাজ বারবার নিজের কাঁধে দুর্যোগের ভার তুলে নিচ্ছে বলে কি রাষ্ট্র তার ধারাবাহিক ব্যর্থতাকে ঢেকে ফেলার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে? জনগণের এই সংবেদনশীলতা প্রশংসনীয়, কিন্তু তা কোনোদিন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিকল্প হতে পারে না।
ধীরে ধীরে এখন জল নামতে শুরু করেছে। শুরু হয়েছে পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের কঠিন লড়াই। অসম সরকারও বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। বলা হয়েছে—ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় দেড় লক্ষেরও বেশি পরিবারকে ১৫,০০০ টাকা করে অন্তর্বর্তী সাহায্য, নিহতের পরিবারকে অতিরিক্ত ৫ লক্ষ টাকা (মোট ৯ লক্ষ টাকা) ক্ষতিপূরণ, ঋণের উপর ছ’মাসের স্থগিতাদেশ, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের সংস্কারে দেড় লক্ষ টাকা এবং স্বাস্থ্যশিবির পরিচালনা। কিন্তু শুধু টাকা বা কয়েক বস্তা চাল-ডালই কি সমস্যার স্থায়ী সমাধান?
আগামীতে এমন বিপর্যয় এড়াতে হলে আমাদের অতীতের ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক পথ অনুসরণ করতে হবে। সেই পর্বে প্রথমেই প্রয়োজন আন্তঃরাজ্য সমন্বয়। নাগাল্যান্ড সরকারের সঙ্গে কেন্দ্র ও অসম সরকারকে আলোচনায় বসতে হবে। বন্ধ করতে হবে ‘র্যাট-হোল’ মাইনিং। পাহাড়ি অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ চাপ ও ভূ-তাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যবহৃত ‘গ্যাস রি-ইনজেকশন’-এর মতো বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করা যেতে পারে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিমোট সেন্সিং ও জিওফিজিক্যাল সার্ভের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ জলের সঞ্চয় ও বেআইনি খাদান চিহ্নিত করতে হবে।
জল নামবে। পলি জমে আবার সবুজ হবে অসমের প্রান্তর। এখন প্রশ্ন—আমরা কি এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে কোনো শিক্ষা নেব? নাকি আগামী বর্ষায় আবার নতুন একটি পরিসংখ্যানের অপেক্ষায় বসে থাকব! প্রকৃতি তো তার নিয়মেই চলবে। ব্রহ্মপুত্র আর তার উপনদীগুলি এ সভ্যতার প্রাণরস। প্রকৃতিকে শাসন করার ভ্রান্ত অহংকার ছেড়ে আমাদের শিখতে হবে নদীর সঙ্গে কীভাবে তাল মিলিয়ে বাঁচতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন কঠোর পরিবেশনীতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং মানবিক দূরদৃষ্টি। না হলে প্রতি বছর বন্যায় কেবল ঘরবাড়ি ভাসবে না, তার সঙ্গে তলিয়ে যাবে আমাদের সভ্যতার সমস্ত অগ্রগতি।