নির্বাচন কমিশন... এসআইআর... ট্রাইবুনাল... গণতন্ত্রের এক চমৎকার মডেল! বিধানসভা নির্বাচন মিটে গিয়েছে তিনমাস আগে। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপির সরকার চলছে পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের যন্ত্রণা শেষ হয়নি। তাঁরা আজও চরকিপাক খাচ্ছেন নিজেদের ‘বৈধ ভোটার’ প্রমাণে। না হলে আগামী দিনে জীবন থাকলেও তা নির্বাহের উপায় খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কিন্তু সেই ট্রাইবুনালের বিচার শেষ হবে কবে? পরের ভোটের আগে? না পরে? আর ততদিন এই ‘বিচারাধীন’ মানুষগুলোর কী হবে? বুকে ভয় আঁকড়ে দিনাতিপাত করবেন? রেশন কার্ড, ভাতা কিংবা চাকরিটা কি থাকবে ততদিন? সদ্য রাজ্য সরকারের পূর্তদপ্তরের একটি শাখায় অস্থায়ী কর্মীদের একাংশের এসআইআর তথ্য খতিয়ে দেখার খবর পাওয়া গিয়েছে। আতঙ্কে রয়েছেন রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত প্রায় পাঁচ লক্ষ অস্থায়ী কর্মী। প্রতিটা দিন তাঁদের বিচার চলছে। চলেই যাচ্ছে।
এসআইআরের সৌজন্যে প্রায় এক কোটি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তাঁদের মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষের ভাগ্য ট্রাইবুনালের করিডরে আটকে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০টি ট্রাইবুনাল তৈরি হয়েছে। দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের। দু’জন ইতিমধ্যে সরে দাঁড়িয়েছেন। একজন নিরাপত্তার আবেদন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছেন। এসবের ফাঁকেই বিচার চলছে। ভোট মিটে যাওয়ার তিনমাস পর দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের পর্যবেক্ষণে কটাক্ষ করতে বাধ্য হয়েছেন—বিচারের প্রক্রিয়া এই গতিতে চললে নিষ্পত্তি হতে হতে পরের ভোট চলে আসবে! বাস্তবটা দেশের প্রধান বিচারপতির করা শ্লেষের থেকে ভয়ংকর। কারণ, ভোটার তালিকা কোনো সরকারি দপ্তরের লাল ফিতের ফাঁসবন্দি সাধারণ ফাইল নয়। সেখানে একটি নাম বাদ পড়ার অর্থ একজন নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া। সবচেয়ে বিস্ময়কর, এত বড়ো একটি প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কমিশনের কাছেই ট্রাইবুনালে কতগুলি আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই! কমিশনের আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে বলছেন, ‘এই মুহূর্তে বিস্তারিত রিপোর্ট নেই, জেনে বলব।’ এটা কি নিছক প্রশাসনিক গাফিলতি? শুধু ভোট করানো ছাড়া কমিশনের তো তেমন অপর কোনো কাজ নেই। স্বচ্ছ ভোট করানোর জন্যই তারা এসআইআর করেছে। আর সেই ‘অপরিকল্পিত’ এসআইআর যে সংকট সৃষ্টি করেছে, তার বিচার কত দূর এগল সেটার খোঁজ কমিশন রাখেই না।
এ কেমন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে নাগরিককে প্রথমে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে, তারপর নিজের বৈধতা প্রমাণের জন্য ট্রাইবুনালে যেতে হবে, তারপর ট্রাইবুনালের রায় পাওয়ার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হবে? আর সেই অপেক্ষা করতে করতে যদি পরের নির্বাচনও চলে আসে, তখন এই নাগরিকের হারানো ভোট কি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব? কমিশন বারবার বলেছে, প্রকৃত ভোটারদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু বাস্তব বলছে, বৈধ ভোটারকেই এখন আদালতে গিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব, পরিচয় এবং ভোটের অধিকার প্রমাণ করতে হচ্ছে। তারপরও সেই বিচার শেষ হচ্ছে না। একটি ভোটের মূল্য শুধু একটি ইভিএমের বোতাম টেপার সুযোগ নয়। সেই অধিকার কেড়ে নিয়ে পরে বলা যায় না—‘আপিলের সুযোগ তো ছিল!’ সুযোগ তখনই অর্থবহ, যখন প্রতিকার সময়মতো পাওয়া যায়। নির্বাচন শেষ হওয়ার পরে, সরকার গঠনের পরে, পরবর্তী ভোটের মুখে দাঁড়িয়ে পাওয়া বিচার কতটা কার্যকর? রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের সুবিধামতো এই প্রশ্নকে ব্যবহার করবে। কেউ বলবে, ‘অবৈধ ভোটার’ বেছে বেছে বাদ দেওয়া হচ্ছে। কেউ বলবে, ‘বৈধ ভোটারদের নিশানা করা হচ্ছে।’ কিন্তু রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে যে প্রশ্নটা এখন করা জরুরি—একজন যোগ্য ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার দায় কে নেবে? কোনো সামান্য ব্যক্তির ভুল নাকি গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার ভুলে এই পরিস্থিতি? নিজের ভুল সংশোধন করতেও যদি রাষ্ট্র মাসের পর মাস সময় নেয়, কে তার দায় নেবে? কে শাস্তি পাবে? শুধু সাধারণ মানুষ?