মণ্ডপের কোণে ডাঁই হয়ে রয়েছে একের পর এক শাড়ি। লাল পাড় সাদা, হলুদ-লাল, নীল, সবুজ—নানা রঙের সমাহার। সবই মায়ের জন্য নিবেদিত। দেবী দুর্গার শাড়ি। কেবল নিবেদিত শাড়ি নয়, মণ্ডপে প্রতিমার শাড়িও আকর্ষণ করে দর্শনার্থীদের। মা ও তাঁর দুই মেয়ের শাড়ির ঔজ্জ্বল্য নজর কাড়ে। এবছরের পুজোতে সেখানেও থাকছে নানা চমক। থিমের সঙ্গে একাত্ম হচ্ছে শাড়ি।
মায়ের শাড়ি আর কেবল পোশাক নয়। পুজোমণ্ডপে প্রতিমার সাজের প্রতিটি উপকরণই এখন হয়ে উঠছে শিল্পভাবনার অংশ। অলংকার, মুকুট, অস্ত্র থেকে শুরু করে শাড়ির নকশা, সবকিছুর মধ্যেই ধরা পড়ছে মণ্ডপের থিম। সেই জায়গা থেকেই বদলে যাচ্ছে মায়ের শাড়ির ক্যানভাস। কখনো সেখানে ফুটে উঠছে কোনো বিশেষ শিল্পরীতি, কখনো ইতিহাস, কখনো আবার গোটা একটা শহর। এই বছর কলকাতার একাধিক পুজোয় সেই শাড়ির ক্যানভাসেই জায়গা করে নিচ্ছে শহর কলকাতা। প্রিন্টেড শাড়ির ট্রেন্ড যেন এবার এসে পৌঁছেছে মায়ের সাজেও।
দূর থেকে দেখলে হয়তো মনে হবে, মায়ের পরনে আর পাঁচটা আটপৌরে শাড়ি। কিন্তু একটু কাছে গেলেই বদলে যাবে সেই ধারণা। শাড়ির পাড়ে চোখে পড়বে চেনা রাস্তা। আঁচলে পুরনো কলকাতার কোনো বাড়ি। শাড়িজুড়ে ছড়িয়ে থাকবে গঙ্গার ঘাট, ট্রামলাইন, পুরনো স্থাপত্য কিংবা শহরের কোনো চেনা মুহূর্ত। অর্থাৎ শাড়ির জমিতে আস্ত একটি শহর। মায়ের পরনের শাড়িই হয়ে উঠবে কলকাতার ইতিহাস ও স্মৃতির ক্যানভাস।
লেকটাউনের নেতাজি স্পোর্টিং ক্লাবের পুজোয় যেমন মায়ের শাড়ি হয়ে উঠছে কলকাতার গল্প বলার মাধ্যম। শিল্পী মলয় রায় ও শুভময় সিনহার ভাবনায় মায়ের শাড়িতে উঠে আসছে কলকাতার এক অন্য সময়। আজকের ব্যস্ত মহানগর নয়, বরং যে শহরের মধ্যে রয়েছে পুরানো বাড়ি, ঐতিহ্য, স্থাপত্য এবং ইতিহাসের অসংখ্য স্তর। এই ভাবনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে কলকাতার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কেও। ২০২৩ সালে কলকাতা হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল, জোব চার্নককে কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা যায় না। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১৬৯০ সালের ২৪ আগস্ট চার্নকের কলকাতায় আগমনকে কোনোভাবেই শহরের ‘জন্মদিন’ হিসেবে ধরা যায় না। এই মামলার সঙ্গে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের ঐতিহাসিক দাবিও জড়িত ছিল। পরিবারের বক্তব্য ছিল, চার্নক কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ইতিহাসে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন এবং তাঁদের পূর্বপুরুষ লক্ষ্মীকান্তর কাছ থেকে সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলিকাতা— এই তিনটি গ্রামের দখল নেওয়ার সঙ্গে সেই ইতিহাসের যোগ রয়েছে।
সেই ইতিহাসই এবার শিল্প ভাষায় ধরা থাকছে মায়ের শাড়িতে। সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের সংগ্রহের নানা উপাদানও প্রতিমার সামগ্রিক ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফলে মাটি দিয়ে তৈরি শাড়িতে কলকাতার ছবি আঁকা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার উদ্দেশ্য শুধুই শহরের কিছু পরিচিত দৃশ্য তুলে ধরা নয়। বরং ছবির মধ্যে দিয়ে একটি সময়কে ধরার চেষ্টা। যে কলকাতা আজকের শহরের ভিত তৈরি করেছে, তার কিছু চিহ্নকে মায়ের সাজে ফিরিয়ে আনা।
এখানেই মায়ের শাড়ির গুরুত্ব অন্যরকম হয়ে ওঠে। সাধারণত প্রতিমার সাজের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখ যায় মুখাবয়ব, অলংকার, মুকুট কিংবা অস্ত্রের দিকে। শাড়ি থাকে সেই সামগ্রিক সাজের একটি অংশ হয়ে। কিন্তু থিমভিত্তিক পুজোর শিল্পভাবনায় সেই শাড়িও যখন গল্প বলে, তখন প্রতিমার সাজ আলাদাভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এই বদল আসলে পুজোর শিল্পচর্চারও পরিবর্তনের ইঙ্গিত। আগে প্রতিমার শাড়ি নিয়ে ভাবনা থাকলেও তা অনেকাংশে নির্ভর করত রং, কাপড়, বুনন কিংবা ঐতিহ্যবাহী অলংকরণের উপর। এখন সেখানে যুক্ত হচ্ছে নতুন মাধ্যম, নকশা এবং গল্প বলার পদ্ধতি। প্রিন্ট সেই নতুন ভাষারই একটি অংশ। কাপড়ের উপর ছবি ছাপার প্রযুক্তি কিংবা শিল্পীর হাতে আঁকা নকশা— এগুলির সাহায্যেই তৈরি হচ্ছে এমন শাড়ি, যা একসঙ্গে পোশাক এবং শিল্পকর্ম।
শুধু কলকাতার ইতিহাসই নয়, মায়ের শাড়িতে ফুটে উঠছে বিভিন্ন শিল্পরীতিও। দক্ষিণ কলকাতার হিন্দুস্থান পার্কের পুজোয় যেমন শাড়ির আঁচলে দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ ভারতীয় শিল্পভাবনার ছোঁয়া। সেখানে উমার সন্তানদেরও জায়গা দেওয়া হয়েছে আঁচলের নকশায়। অর্থাৎ শাড়ি শুধু মায়ের সাজের অংশ নয়, তার মধ্যেও তৈরি হচ্ছে আলাদা একটি জগৎ। এই ধরনের কাজের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল, এখানে ফ্যাশন এবং শিল্পের সীমারেখা মুছে যাচ্ছে। যে প্রিন্টেড শাড়ি আজকের দিনে মানুষের ব্যক্তিগত সাজের অংশ, সেই একই ভাবনা যখন দেবীর পরনে আসে, তখন সেটি হয়ে ওঠে মণ্ডপশিল্পের অংশ। ব্যক্তিগত ফ্যাশনের ট্রেন্ড এবং পুজোর শিল্পভাবনা এক জায়গায় এসে মিশছে। ফলে মায়ের শাড়ি একদিকে সমকালীন, অন্যদিকে তার ভিতরে লুকিয়ে থাকছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য। কলকাতাকে শাড়িতে তুলে ধরার মধ্যেও রয়েছে আর একটি বিশেষ তাৎপর্য। কলকাতা এমন একটি শহর, যেখানে পুরনো ও নতুন পাশাপাশি হাঁটে। একদিকে আধুনিক বহুতল, মেট্রো, উড়ালপুল; অন্যদিকে উত্তর কলকাতার পুরনো বাড়ি, সরু গলি, বনেদি বাড়ির পুজো, গঙ্গার ঘাট, ট্রামলাইন। শহরের এই দ্বৈত চরিত্রই তাকে আলাদা করে। তাই কলকাতাকে একটি শাড়ির মধ্যে ধরতে গেলে শুধু একটি দৃশ্য দিয়ে তাকে বোঝানো সম্ভব নয়। দরকার অনেক ছবি, অনেক স্মৃতি। মায়ের শাড়ির প্রিন্টে সেই বহুত্বই ধরা পড়ছে।
পুজোর শিল্পভাবনায় এই কারণেই শাড়ি আর পার্শ্বচরিত্র নয়। মায়ের পরনের পোশাক এখন থিমের অঙ্গ। প্রতিমা, অলংকার, মণ্ডপসজ্জা এবং শাড়ি— সব মিলিয়েই তৈরি হচ্ছে শিল্পকর্ম।



