Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

মেয়েদের বিনিয়োগ

ঘরে মেয়ে জন্মালে বলা হয় ‘লক্ষ্মী এল’। হিন্দু বিশ্বাসমতে, মা লক্ষ্মীর হাতে থাকে ঝাঁপি। তিনি চঞ্চলা, তাই গৃহস্থ তাঁকে তুইয়ে বুইয়ে চলেন। পুজোপাঠ করে তাঁকে থিতু করার চেষ্টা করেন সংসারে।

মেয়েদের বিনিয়োগ
  • ৪ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মেয়েরা স্বরোজগেরে, কিন্তু নিজের টাকা বিনিয়োগ করতে স্বচ্ছন্দ কি? বেশিরভাগ মেয়েই বিনিয়োগ প্রসঙ্গে পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্যের উপর নির্ভরশীল। কোন পথে গৃহলক্ষ্মীরা নিজেরাই পারবেন নিজের অর্থের ভার নিতে? জানালেন বিশেষজ্ঞ।

Advertisement

ঘরে মেয়ে জন্মালে বলা হয় ‘লক্ষ্মী এল’। হিন্দু বিশ্বাসমতে, মা লক্ষ্মীর হাতে থাকে ঝাঁপি। তিনি চঞ্চলা, তাই গৃহস্থ তাঁকে তুইয়ে বুইয়ে চলেন। পুজোপাঠ করে তাঁকে থিতু করার চেষ্টা করেন সংসারে। বাড়ির মেয়ে-বউদেরও ‘লক্ষ্মী’ বলার চল রয়েছে বাঙালি গৃহস্থবাড়িতে। সেই লক্ষ্মীরাও ইদানীং স্বাবলম্বী। তাঁদের ঝাঁপি তাঁদের ওয়ালেটে। সেখানেও উপচে পড়ে পদমর্যাদা, বেতন, ইএমআই-এর খরচ। কোথাও আবার শুধুই সংসার সামলাতে ব্যস্ত লক্ষ্মীদের হাতে থাকে সংসারের যাবতীয় খরচের খুঁটিনাটি। ব্যয় সামলে চূড়ান্ত গোপন কুলুঙ্গিতে এক সময় মা- ঠাকুরমারা তুলে রাখতেন আপদকালীন ফান্ড! বহু সংসারের বিপদের দিনে সুসময়ের হাওয়া এনে দিয়েছে এই গোপন সঞ্চয়গুলি। সংসার খরচের টাকা থেকেই সরিয়ে এই ফান্ড জমেছে তা বিলক্ষণ জানতেন বাড়ির সদস্যরা। তবু ‘এই টাকা কোথা থেকে পেলে’-র চেয়েও তখন কৃতজ্ঞ চোখগুলোর চাহনিই দামি হয়ে উঠত। 
এখন সময় বদলেছে। নিজের রোজগারে বাঁচতে শিখেছেন মেয়েরা। তবে একটি বিষয়ে এখনও অনীহা ও কিঞ্চিৎ ভয় থেকে গিয়েছে তাঁদের। রোজগারের টাকা বিনিয়োগের প্রশ্নে এখনও সিংহভাগ মেয়েই বাবা-দাদা-স্বামী-সন্তানের উপর নির্ভরশীল। ‘আমি ব্যাঙ্কিং ঠিক বুঝি না’, ‘মিউচুয়াল ফান্ড, স্টক! ওরে বাবা, ওসব আমার কত্তা সামলায়’, ‘বাবা এটা ভালো বোঝে, কিছু দরকার হলে বাবা বলে দেবে’, ‘কে ব্যাঙ্কে গিয়ে অতক্ষণ লাইন দেবে, ধুর!’ বিনিয়োগের প্রশ্নে এমন নানা সংলাপে জমে ওঠে লেডিজ বগির আনাচকানাচ কিংবা কোনও মেয়েলি আড্ডা। এমনকী, পেশায় ব্যাঙ্ককর্মী হলেও ফিনান্স ম্যানেজমেন্ট নিয়ে এক প্রচ্ছন্ন অনীহা কাজ করে মেয়েদের মনে। মাত্র কয়েক বছর আগে ভারত সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রকের একটি সমীক্ষার পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের লেবার ফোর্সে অংশগ্রহণ করার শতকরা হার গ্রামে ৩৬.৬ শতাংশ। শহরাঞ্চলে এই হিসেব শতকরা ২৩.৮ শতাংশ। অসংগঠিত ও সংগঠিত দুই ক্ষেত্রেই ভারতীয় মহিলারা শ্রম দিচ্ছেন কিন্তু তাঁদের স্বোপার্জিত অর্থের বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে দেখা দিচ্ছে অনীহা!

কেন এই শঙ্কা?
তলিয়ে ভাবতে বসলে দেখা যাবে, মেয়েদের এই ভাবনার নেপথ্য-উস্কানি মূলত সমাজের। একটা সময় সমাজ মনে করত, মেয়েরা লেখাপড়া শিখবে না। সে বাধা পেরল। তারপর বলল, লেখাপড়া জানলেও মেয়েরা ঘরের অন্দরে থেকে সংসার সামলাবে। ঘরের কাজ ছেড়ে বাইরে গেলে ঘর কে সামলাবে? এসব নানা বাধাও একসময় মিটল। এবার এল বেতনের টাকা আবার নিজে জমাতে পারবে নাকি! কোথা থেকে কী ভুল করে বসবে, তারপর টাকাটাই খোয়া যাবে। বোঝানো হল, ‘টাকা পয়সা হ্যান্ডেলিং’ খুব সহজ কাজ নয়। বিনিয়োগ, লগ্নির প্যাঁচপয়জার বোঝা অত সহজ নয়। অর্থনীতির জ্ঞান যে পুরুষের অধিক, তা ছড়িয়ে দেওয়া হল সুচতুরভাবে। তাই বাড়ির গৃহিণী রোজগার করলেও তাঁকে বিনিয়োগের পাঠ না শিখিয়ে বা 
তাঁকে লগ্নিতে আগ্রহী না করে বরং সে দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিল পুরুষ। মেয়েরাও দেখল, এ তো ভারী মজা! ঝুটঝামেলা নেই। টাকার চিন্তা করতে হচ্ছে না, মাথা না ঘামিয়েও টাকা লগ্নি বা বিনিয়োগ তো হয়েই যাচ্ছে, তাই তাদের বেশিরভাগেরই আর এই শিক্ষায় আগ্রহ তৈরি হল না। পরিবার-পরিজন ও সমাজের তৈরি করা অলিখিত নিয়মে অদৃশ্য স্বাক্ষর করে দিল মেয়েরাই।
কোন পথে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ
তবে সময়ের চাকা ধীরে হলেও ঘুরছে। তাই আজ, এই ২০২৫-এ দাঁড়িয়ে কিছু মেয়ে খোঁজখবর রাখেন নানা মিউচুয়াল ফান্ড, এসআইপি, ব্যাঙ্কের ও পোস্ট অফিসের নানা আমানত ও স্কিমের। অর্থনীতিবিদ সুপর্ণ মৈত্র জানালেন তেমনই কিছু আর্থিক সুরক্ষার হদিশ, যেখানে মেয়েরা সঞ্চয়ের পরিকল্পনা করতে পারেন সহজেই। প্রথমেই কিছু নিয়ম মনে রাখতে হবে।
 
 যাঁরা গৃহবধূ বা যাঁরা বেতনভুক, সকলের ক্ষেত্রেই খরচের আগে রাখতে হবে সঞ্চয়কে। বেতন পেলে বা হাতে সংসার খরচের টাকা এলে প্রথমেই সেখান থেকে রেকারিং ডিপোজিটের (আরডি) একটা অঙ্ক সরিয়ে রাখুন। ব্যাঙ্কে বা পোস্ট অফিসে একদিন সময় করে যান, সেখানকার কর্মীরা আরডি-র নিয়ম জানিয়ে দেবেন। বুঝে নিন ভালো করে। না বুঝলে ফের একদিন যান। যাঁরা অনলাইনে সড়গড়, তাঁরা মোবাইল ব্যাঙ্কিংয়ের খুঁটিনাটি জেনে আসুন। মাসের শুরুতেই সরিয়ে ফেলুন সেই রেকারিং ডিপোজিট। 
 আয়-ব্যয়ের হিসেব রাখতে প্রয়োজনে আলাদা খাতা করুন। কোন ব্যাঙ্কের সুদ কত চলছে, সিনিয়র সিটিজেনের নামে অ্যাকাউন্ট হলে বাড়তি সুবিধা আছে কি না, এগুলো জেনে নিন। সেক্ষেত্রে জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে টাকা রাখলে বাড়ির বয়স্ক কোনও সদস্যকে ‘ফার্স্ট পার্সন’ রাখুন। সঙ্গে রাখুন নিজের নাম। 
সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য সুদ বেশি হওয়ায় অ্যাকাউন্টে সুদ বেশি পাবেন। 
 যাঁরা চাকরিরতা, অবসর জীবনে পেনশন নেই এমন পেশায় রয়েছেন, তাঁরা অবশ্যই অবসর জীবনের জন্য সরকারি পেনশন স্কিমে (পিপিএফ) টাকা রাখুন এখন থেকেই। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় উভয় সরকারেরই পেনশন স্কিম রয়েছে। ব্যাঙ্ক ও পোস্ট অফিসে খোঁজখবর নিলে বিস্তারিত খবর পাবেন।
 চেষ্টা করুন ক্রেডিট কার্ড বিনা জীবন কাটাতে। সেটা সম্ভব না হলে কোন ব্যাঙ্কের ক্রেডিট কার্ডে সুদ কম, খবর নিন। এতে আচমকা টাকার দরকার হলে অনেকটা সুরাহা মিলবে। 
 মেয়েদের মধ্যে ‘ইমপালসিভ বায়ার’ (হঠাৎ করে নানা অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে ফেলার স্বভাবদোষ) হওয়ার প্রবণতা বেশি। তাঁরা সচেতন হন। যে জিনিস একান্তই অপ্রয়োজনীয়, কিছুটা হুজুগে কেনা, চোখের দেখায় কিনতে ইচ্ছা করছে, সেটা প্রথমেই না কিনে দিন দুই অপেক্ষা করুন। সেটা কেনার জন্য তখনও আগ্রহ ও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলে তবেই কিনুন।
 অনেকেই ছোটখাট জিনিসপত্র কেনার সময় ইএমআই-এর উপর ভরসা করেন। ভাবেন, একসঙ্গে অনেকটা টাকা বেরিয়ে গেল না। কিন্তু কম টাকার জিনিসের ক্ষেত্রে সেই ভাবনা সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে ভুল। বরং যে ইএমআই কোনও ঋণদাতা সংস্থা বা ব্যাঙ্ককে দেবেন, সেই ইএমআই নিজেরই অ্যাকাউন্টে আলাদা করে রাখুন। জিনিসটির দাম উঠে গেলে একেবারে টাকা দিয়ে কিনে নিন। এতে অপেক্ষা বাড়বে ঠিকই, কিন্তু মাসে মাসে ইএমআই কাটার হাত থেকে বাঁচবেন। বিশেষ করে ছোটখাট প্রাইভেট সেক্টরে চাকরি হলে ও পেশার অনিশ্চয়তা বেশি থাকলে বড় অঙ্কের টাকা ইএমআই করবেন না। 

মেয়েদের জরুরি কিছু স্কিম
বর্তমানে ব্যাঙ্ক থেকে পোস্ট অফিস সর্বত্রই মহিলাদের জন্য রয়েছে বিশেষ স্কিম। সেগুলো বিস্তারিত জেনে নিন ব্যাঙ্ক অথবা পোস্ট অফিস থেকে। সাধারণ আমানতের চেয়ে এইসব স্কিমে সুদের ভাগও বেশি। যেমন— মহিলা সম্মান সঞ্চয় প্রকল্প, সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা (কন্যা সন্তানের জন্য), ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট, নানা মিউচুয়াল ফান্ড (এসআইপি) ও এলআইসি-তে লগ্নি করতে পারেন মেয়েরা। এগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই কর ছাড় পাওয়া যায়। 
এছাড়া মেয়েদের স্বাস্থ্যবিমা করিয়ে রাখাও আবশ্যিক। আলাদা আলাদা করে না পারলে পরিবারের সকলকে এক ছাতার তলায় নিয়েও স্বাস্থ্যবিমা করাতে পারেন। তবে ইদানীং বেসরকারি জায়গায় স্বাস্থ্যখরচকে মাথায় রেখে নিজের জন্য আলাদা স্বাস্থ্যবিমা করিয়ে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। এছাড়াও বেশ কিছু ব্যাঙ্কে মহিলাদের জন্য বিশেষ স্কিম রয়েছে। সেখানেও খোঁজখবর করতে পারেন। 

সোনায় বিনিয়োগ 
সোনা ভালোবাসেন না, এমন মেয়ে সংখ্যায় কম। এখন যা সোনার দাম, তাতে গোল্ড স্কিমে বিনিয়োগ সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। গয়না বা গোল্ড কয়েন-বার কিনে বিনিয়োগ করতে পারেন। আবার গোল্ড ফান্ডেও লগ্নি করতে পারেন। ডিজিটাল গোল্ডও ভালো অপশন। যে হারে সোনার দাম বাড়ছে তাতে আগামী দিনে সোনা খুব ভালো রিটার্ন দিতে পারে। 
সবদিক খতিয়ে দেখে, বিনিয়োগের খুঁটিনাটি জেনে লগ্নি করুন। আগ্রহী হয়ে উঠুন সঞ্চয়ে। তবেই গৃহলক্ষ্মীর ঝাঁপি থাকবে নিজেরই জিম্মায়। আত্মবিশ্বাস ও যত্ন বজায় থাকবে 
সঞ্চয়ের খাতে। 

মনীষা মুখোপাধ্যায়

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ