Bartaman Logo
১১ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

মহাকাশে ভারতীয়

১৯৮৪ সালের ৩ এপ্রিল। ইতিহাস গড়লেন রাকেশ শর্মা। সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতায় মহাকাশে পৌঁছলেন প্রথম কোনও ভারতীয় নভশ্চর। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ২০২৫ সালের ২৫ জুন।

মহাকাশে ভারতীয়
  • ২৯ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

১৯৮৪ সালের ৩ এপ্রিল। ইতিহাস গড়লেন রাকেশ শর্মা। সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতায় মহাকাশে পৌঁছলেন প্রথম কোনও ভারতীয় নভশ্চর। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ২০২৫ সালের ২৫ জুন। এবার নাসার সহযোগিতায় মহাকাশে পাড়ি দিলেন শুভাংশু শুক্লা। ছাত্র হিসেবে কেমন ছিলেন তিনি। খোঁজ দিলেন অনির্বাণ রক্ষিত।

Advertisement

ফের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি! মহাকাশ গবেষণায় আবার ভারতের জয়জয়কার। ১৯৮৪ সালে রাকেশ শর্মা প্রথম ভারতীয় মহাকাশচারী হিসেবে অন্তরীক্ষে পাড়ি দিয়েছিলেন। তারপর কেটে গিয়েছে ৪১ বছর। ‘অ্যাক্সিয়ম-৪’ অভিযানে ফের ভারতীয় নভশ্চর মহাকাশে পৌঁছলেন। ২০২৫ সালের ২৫ জুন দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে সেই ইতিহাসকে স্পর্শ করলেন শুভাংশু শুক্লা। এই অভিযানের নেতৃত্বে রয়েছেন মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার প্রাক্তন মহাকাশচারী তথা অ্যাক্সিয়ম স্পেসের হিউম্যান স্পেস ফ্লাইটের ডিরেক্টর রেগি হুইটসন। এছাড়াও রয়েছেন পোল্যান্ডের স্লায়োস উজনানস্কি-উইসনিউস্কি এবং হাঙ্গেরির টিবর কাপু। আমেরিকার ফ্লোরিডায় নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ২৫ জুন ভারতীয় সময় দুপুর ১২টা ১ মিনিটে উড়ান দেয় শুভাংশুদের মহাকাশযান। ‘ফ্যালকন ৯’ রকেটের সাহায্যে ড্রাগনকে মহাকাশে পাঠানো হয়। পরদিন অর্থাৎ ২৬ জুন বিকেল ৪টে ৩০ মিনিট নাগাদ আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নির্ভুলভাবে ল্যান্ডিং করে ‘অ্যাক্সিয়ম-৪’। তাঁদের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত ভারত তথা বিশ্ববাসী। শুভাংশুর এই সাফল্যের পিছনেও রয়েছে দীর্ঘ লড়াই। তিনিই প্রথম ভারতীয়, যিনি ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে পৌঁছলেন। 
শুভাংশু শুক্লা। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি পরিচিত ‘শক্স’ নামে। ১৯৮৫ সালের ১০ অক্টোবর, লখনউয়ের একটি অত্যন্ত সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয় তাঁর। বাবা শম্ভুদয়াল শুক্লা সরকারি চাকরি করতেন। আর মা আশা শুক্লা গৃহবধূ। আর পাঁচজন সাধারণ গৃহবধূর মতোই সংসারের সমস্ত কাজ সামলে ব্যস্ত থাকতেন ছেলেমেয়েকে নিয়ে। তাঁর বাবা যখন অফিসের কাজে বেরিয়ে যেতেন, সকালের কাজ সামলে ছেলেমেয়েকে নিয়ে স্কুলে যেতেন শুভাংশুর মা। স্কুল থেকে ফিরে দুই সন্তানের পড়াশোনা। দু’কামরার একতলা বাড়িতে বসেই এক চিলতে আকাশ দেখতেন শুভাংশ। আর সেখান থেকে মনে মনে বুনেছিলেন আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন। লখনউয়ের সিটি মন্তেসরি স্কুলে তাঁর পড়াশোনার হাতেখড়ি। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই শিক্ষকরা বলতেন, এই ছেলে কেবল পড়াশোনাতেই নয়, বিভিন্ন হাতের কাজ, স্কুলের সমস্ত প্রজেক্টে কাজ করতে পারদর্শী। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে এখানেই হাইস্কুল পড়াশোনা। সেখানেও তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। হতে পারতেন ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন যে তখনও চোখে। সেই স্বপ্ন পূরণেই ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমির প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসেন শুভাংশু। প্রথমবারেই সেই পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করেন। নিজের অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম, একাগ্রতা আর স্বপ্নপূরণের তীব্র ইচ্ছা তাঁকে একজন সফল বায়ুসেনা আধিকারিকে পরিণত করে। ২০০৫ সালে এনডিএ থেকে স্নাতক হওয়ার পর তিনি বিটেক করেন। তাঁর কারিগরি ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা আরও তীক্ষ্ণ হয়। এখান থেকেই তিনি একজন ফাইটার পাইলট, টেস্ট পাইলট হিসেবে ডানা মেলতে শুরু করেন।
২০০৬ সালে শুভাংশু যুক্ত হন ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সে। উড়ানে চমৎকার দক্ষতায় সকলের নজর কাড়েন তিনি। এক বছরের মধ্যেই তিনি সু-৩০, মিগ-২১, মিগ-২৯, ডরনিয়ার-২২৮ সহ বেশ কয়েকটি বিমান ওড়ানোর দক্ষতাও অর্জন করে ফেলেন। প্রায় ২০০০ ঘণ্টা উড়ান চালানোর অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। ২০১৯ সালে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো ‘গগনযান’ মিশনের জন্য নির্বাচিত করে শুভাংশুকে। এটিই হতে চলেছে ভারতের প্রথম মানব মহাকাশযান মিশন। অর্থাৎ, মহাকাশে মানুষ পাঠানোর অভিযান।
রাশিয়ার ইউরি গ্যাগারিন কসমোনট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নেন শুভাংশু। যাতে মহাকাশে যাওয়ার আগে সংক্রমণজনিত কোনও রোগে অসুস্থ না পড়েন, সে জন্য গত এক মাস ধরে চারজন অর্থাৎ ভারতের শুভাংশু শুক্লা, আমেরিকার রেগি হুইটসন, পোল্যান্ডের স্লায়োস উজনানস্কি-উইসনিউস্কি ও হাঙ্গেরির টিবর কাপুকে থাকতে হয়েছিল নিভৃতবাসে (কোয়ারেন্টাইন)। আগামী ১৪ দিন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকবেন এই চার নভশ্চর। সেখানে অন্তত ৬০টি পরীক্ষানিরীক্ষা চালাবেন তাঁরা। এর মধ্যে ৭টি এক্সপেরিমেন্ট ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর পরিকল্পনায় তৈরি। এটি শুধু ভারতের মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে নয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও এক বিশাল পদক্ষেপ। শুভাংশুর এই ঐতিহাসিক যাত্রা ঘিরে গোটা দেশে এখন উৎসবের আবহ। স্কুল, কলেজ, বায়ুসেনার প্রাক্তন সহকর্মীরা প্রত্যেকেই গর্বিত। কারণ এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, এই অভিযান ভারতের মহাকাশ অভিযানে নতুন যুগের সূচনা করল।
প্রাথমিকভাবে ২৯ মে এই অভিযানটি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রকেটে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সেই মিশন স্থগিত হয়েছিল। তার আগেও একাধিকবার এই মিশন পিছিয়ে গিয়েছে। গত ১০ জুন এই মিশনের জন্য চূড়ান্ত দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেবার আবহাওয়ার কারণে তা পিছিয়ে ১১ জুন করা হয়েছিল। তবে গত ১১ জুনও এই মিশন স্থগিত করা হয়েছিল। তখন জানানো হয়েছিল, ২২ জুন এই মিশন শুরু হবে। আবারও সেই নির্ধারিত দিনের দু’দিন আগে ফের মিশন স্থগিত করার ঘোষণা করা হয়। অবশেষে ২৫ জুন এই মিশন লঞ্চ করা হয়। আর রাকেশ শর্মার পর (ভারতীয় বংশোদ্ভূত কল্পনা চাওলা ও সুনীতা উইলিয়মস) ভারতীয় নাগরিক হিসেবে মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে নাম তুলে ফেললেন শুভাংশু শুক্লা।

 

পরিচিতি

নাম: শুভাংশু শুক্লা
জন্ম: ১০ অক্টোবর, ১৯৮৫
জন্মস্থান: লখনউ, উত্তরপ্রদেশ
বয়স: ৩৯ বছর
পড়াশোনা: সিটি মন্তেসরি স্কুল, 
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স বেঙ্গালুরু (এমটেক), ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্স অ্যাকাডেমি, ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমি, জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি (বিএস)।
পদমর্যাদা: গ্রুপ ক্যাপ্টেন, 
ভারতীয় বায়ুসেনা

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ