আগস্ট মাস মানে স্বাধীনতার মাস। অসংখ্য দেশপ্রেমীর প্রাণের বিনিময়ে দু’শো বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটেছিল। দেশের সেই বীর সেনানীদের স্মরণ করল দমদম রোড গভর্নমেন্ট স্পনসর্ড হাই স্কুলের ছাত্রীরা। ছবিও আঁকল তারা।
আগস্ট মাস মানে স্বাধীনতার মাস। অসংখ্য দেশপ্রেমীর প্রাণের বিনিময়ে দু’শো বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটেছিল। দেশের সেই বীর সেনানীদের স্মরণ করল দমদম রোড গভর্নমেন্ট স্পনসর্ড হাই স্কুলের ছাত্রীরা। ছবিও আঁকল তারা।
মৃত্যুঞ্জয়ী সূর্য সেন
পেশায় এক শিক্ষক হলেও দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি হলেন আমাদের অগ্নিযুগের মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেন। ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে গোপনে বিপ্লবী কার্যকলাপ পরিচালনা করতেন তিনি। নেতৃত্ব দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে। একবার ব্রিটিশ পুলিশ তাঁদের আস্তানা ঘিরে ধরেছিল। কোনো রকম বিচলিত না হয়ে অস্ত্র হাতে পুলিশের মোকাবিলা করেছিলেন তিনি। নেত্র সেন নামে এক বিশ্বাসঘাতক পুরস্কারের লোভে ১৯৩৩ সালে সূর্য সেনের গোপন ডেরার খবর ইংরেজদের জানিয়ে দিয়েছিল। গ্রেপ্তার হন মাস্টারদা। বিচারে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়। ফাঁসির আগে অত্যাচারী ব্রিটিশরা হাতুড়ি দিয়ে এই মহান বিপ্লবীর দাঁত এবং হাত ও পায়ের অস্থিসন্ধি ভেঙে দিয়েছিল। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি তাঁর ফাঁসি হয়। মৃত্যুর পর মাস্টারদার শেষকৃত্য করতে দেওয়া হয়নি। তাঁর মৃতদেহ বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আপামর বাঙালির মনে তিনি আজ অমর অগ্নিশিখা হয়ে জ্বলছেন।
—শর্মিষ্ঠা সাহা, দশম শ্রেণি
বীর বিপ্লবী ভগৎ সিং
১৯০৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত পাঞ্জাবের লায়ালপুরে এক জাঠ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ভগৎ সিং। কৈশোর বয়স থেকেই তাঁর মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা জাগ্রত হয়। নওজওয়ান ভারতসভা, কীর্তি কিষাণ পার্টি ও হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের মতো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। লালা লাজপত রায়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে তিনি ব্রিটিশ পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট মিস্টার স্যান্ডার্সকে গুলি করে হত্যা করেন। ১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল বটুকেশ্বর দত্তকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লি পার্লামেন্টে বোমা নিক্ষেপ করেন। ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ মাত্র ২৩ বছর বয়সে লাহোর সেন্ট্রাল জেলে তাঁর ফাঁসি হয়।
—সোনালি দাস, সপ্তম শ্রেণি
বীরাঙ্গনা রানি লক্ষ্মীবাই
১৮৫৮ সালের ৩ এপ্রিল। মাঝ রাত। ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই তাঁর পিঠে পুত্র দামোদর রাওকে নিয়ে ঘোড়ায় চেপে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দুর্গ থেকে ঝাঁপ দিলেন। ঝাঁসি দুর্গের সামনে খোলা প্রান্তর। ঘোড়া ছুটে চলল। রানি তাঁর কয়েকশো ঘোড়সওয়ারকে নিয়ে পরের কয়েক সপ্তাহ কাটালেন বুন্দেলখণ্ডের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। এরপর রানি এবং তাঁর সেনাবাহিনী কালপিতে পৌঁছালে সেখানে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় বিষ্ণুভট্ট গডসের। বিষ্ণুভট্ট গডসে তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘রানি একজন পাঠান পুরুষের মতো পোশাক পরেছিলেন এবং তাঁর মুখ ধুলোয় ঢেকে গিয়েছিল।’ এরপর রানি তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে গোয়ালিয়রে পৌঁছালে সিন্ধিয়ার ব্রিটিশ অনুগামী জয়জি রাওয়ের সেনারা বিদ্রোহ করে ঝাঁসির রানির পক্ষে যোগ দেয়। গোয়ালিয়রে রানির সঙ্গে সম্মুখসমরে উপস্থিত জেনারেল ক্লিমেন্ট ওয়াকার পরবর্তীকালে লিখেছিলেন, ‘ঘোড়ায় চড়ে হাতে তলোয়ার নিয়ে এক নারীকে সব জায়গায় দেখা যাচ্ছিল। আমাদের এক সেনা তাঁকে আঘাত করতে তিনি মাটিতে পড়ে যান। তখনই আমরা জানতে পারি, তিনি লক্ষ্মীবাই।’ ঝাঁসির রানি কখনোই চাইতেন না, তাঁর মৃতদেহ ব্রিটিশদের হাতে পড়ুক। তাই তাঁর সেনারা এক নির্জন জায়গায় রানির শেষকৃত্য করেছিলেন। ভারতের স্বাধীনতার লড়াইয়ে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র— রানি লক্ষ্মীবাই।
—সৃজনী গুপ্ত, দশম শ্রেণি
স্বাধীনতার অগ্নিশিখা মাতঙ্গিনী
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও যিনি স্বাধীনতার পতাকাকে নত হতে দেননি সেই অগ্নিশিখার নাম মাতঙ্গিনী হাজরা। স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর সাহস, সংগ্রাম আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি কোনো রাজবংশের মানুষ ছিলেন না, ছিল না কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা। অথচ, সেই সাধারণ নারীই পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি মাতঙ্গিনী হাজরা। বাংলার অমর বীরাঙ্গনা। তিনি ‘গান্ধী বুড়ি’ নামে বিখ্যাত ছিলেন। তিনি ছিলেন গান্ধীজির আদর্শে অনুপ্রাণিত। গান্ধীজির দেখানো পথে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৩২ সালে মাতঙ্গিনী হাজরা আইন অমান্য আন্দোলনে অংশ নেন। লবণ আইন ভঙ্গ করেন এবং গ্রেপ্তার হন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও চৌকিদারি করের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যান। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ২৯ সেপ্টেম্বর তমলুকে একটি মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে আহত হন। গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেও তিনি পতাকা হাতে এগিয়ে যান এবং ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি দিতে দিতে শহিদ হন।
—চন্দ্রিমা হুই, ষষ্ঠ শ্রেণি
অনুপ্রেরণার প্রতীক বল্লভভাই
ইতিহাস আমাদের জানতে শেখায়। চিনতে শেখায় নিজের শিকড়কে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তেমনই আদর্শ মানুষ হলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। চারদিকে যখন দেশভাগের অস্থিরতা, জাতিভেদের টানাপোড়েন দেশকে বিপর্যস্ত করে রেখেছিল, তখন তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও দৃঢ় নেতৃত্ব ভারতকে দিয়েছিল স্থিতিশীলতা। তিনি ছিলেন দেশের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কৃষক আন্দোলনের ১৯২৮ সালে বারদৌলি সত্যাগ্রহের সময় তিনি সফলভাবে কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাই বল্লভভাইকে ‘সর্দার’ উপাধি দেওয়া হয়। তাঁর দূরদর্শিতা আজও দেশবাসীকে অনুপ্রেরণা জোগায়।
—অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায়, একাদশ শ্রেণি
ভারতমাতার বীর সন্তান সুভাষচন্দ্র
১৫ আগস্ট ভারতমাতার বীর সন্তান নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অদম্য সাহস ও আপসহীন সংগ্রামকে স্মরণ করার দিন। ব্রিটিশ সরকারের কড়া নজরবন্দি এড়িয়ে ১৯৪১ সালে সহম্মদ জিয়াউদ্দিন ছদ্মবেশে ভারত ত্যাগ করেন। আফগানিস্তান হয়ে পৌঁছান জার্মানি। তারপর সাবমেরিনে চড়ে জাপান। নেতাজির মহানিষ্ক্রমণ। স্বাধীনতার লড়াইয়ে নারীদের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করতে তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজে গড়ে তোলেন ‘ঝাঁসির রানি বাহিনী’। ১৯৪২ সালে বার্লিন থেকে আজাদ হিন্দ রেডিওর মাধ্যমে ‘জয় হিন্দ’ ধ্বনি তুলে প্রবাসী ভারতীয়দের ঐক্যবদ্ধ করেন। পরবর্তীকালে মুক্ত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের তিনি নাম রাখেন ‘শহিদ’ ও ‘স্বরাজ’ নগর। এর আগে ১৯৪১ সালে বার্লিনে ‘ইন্ডিয়ান লিজিয়ন’-এ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জনগণমন’ গানটিকে আনুষ্ঠানিক জাতীয় গান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। যা পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পায়। নেতাজি আজও যুব সমাজকে সমানভাবে অনুপ্রাণিত করেন।
—তিয়াশা দাস, অষ্টম শ্রেণি
প্রধান শিক্ষিকার কলমে: দমদম রোড গভর্নমেন্ট স্পনসর্ড হাই স্কুল ফর গার্লস
দেশ তখন স্বাধীন। কিন্তু বিদেশি শাসনের কুফল ভোগ করছিল গোটা সমাজ। সেই সঙ্গে জুড়েছিল দেশভাগের যন্ত্রণা। ওপার বাংলা থেকে দলে দলে শরণার্থী ঢুকছে এপার বাংলায়। খাদ্য, শিক্ষা, বাসস্থান সব কিছুরই তখন যেন আকাল।
এই সবকিছুর অভাব দূর করতে পারে প্রকৃত শিক্ষা। সে সময় একথা উপলব্ধি করেন সরকারি আধিকারিক ডঃ করুণাকেতন সেন। কলকাতা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্টের বসতি রিহ্যাবিলেটেশন স্কিমের আওতায় তাঁর উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল ন’টি স্কুল। তার মধ্যে দমদম রোডের স্কুলটি অন্যতম। ১৯৬২ সালে দমদম জুনিয়র হাই ইন্টিগ্রেটেড স্কুলের সূচনা হয়। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৬৮ সালে মাধ্যমিক এবং ১৯৭০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পঠনপাঠনের অনুমোদন পায়। বর্তমানে বিজ্ঞান, কলা ও বাণিজ্য বিভাগ রয়েছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ছাত্রী পড়াশোনা করে। এই স্কুলের ছাত্রীরা স্কাউট, ক্রাফট, গান-বাজনা ও চারুকলায় পারদর্শী। প্রাক্তনীদের তালিকায় রয়েছেন সংগীতশিল্পী স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত সহ অনেক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তবে, স্কুলের অনেক সংস্কার কাজ প্রয়োজন। স্মার্ট ক্লাসরুম, বেঞ্চ, ল্যাবরেটরি, কম্পিউটার প্রয়োজন। আগামী দিনে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আরও এগিয়ে যাবে এই আশা রাখব।
—রূপশ্রী ঘোষ, প্রধান শিক্ষিকা
সংকলক: শম্পা সরকার ছবি: দীপেশ মুখোপাধ্যায়