Bartaman Logo
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

বিষ আর অমৃত

রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর আজই প্রথম মোতিহারি এলেন রাজেন্দ্র প্রসাদ। এই বিহার, এই মোতিহারি থেকেই বলতে গেলে তাঁর উত্থান। সদ্য স্বাধীন দেশের এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে দাঁড়িয়েও সেকথা ভুলে যাননি তিনি।

বিষ আর অমৃত
  • ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাজা ভট্টাচার্য: রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর আজই প্রথম মোতিহারি এলেন রাজেন্দ্র প্রসাদ। এই বিহার, এই মোতিহারি থেকেই বলতে গেলে তাঁর উত্থান। সদ্য স্বাধীন দেশের এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে দাঁড়িয়েও সেকথা ভুলে যাননি তিনি। সেই কারণেই সবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েই ছুটে এসেছেন এখানে। পর পর মিটিং করেছেন সকাল থেকে। এইবার জনসভা। রাজেন্দ্র প্রসাদ জানেন, তাঁর কথা শোনার জন্য মুখিয়ে আছেন এই এলাকার মানুষজন। 

Advertisement

রাষ্ট্রপতিকে হাজারো নিয়ম মেনে চলতে হয়, যার সরকারি নাম ‘প্রোটোকল’। এখানে অবশ্য ওসবের তোয়াক্কা করলেন না তিনি। মঞ্চে বসা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মীদের জন্য নয়, আজ প্রথমবার তিনি রাষ্ট্রপতি হিসাবে এসেছেন তাঁর সহযোদ্ধাদের কাছে। সংক্ষেপে আনুষ্ঠানিকতা সেরে নিয়ে তিনি উঠলেন ভাষণ দিতে। 
‘মেরে আপনে ভাইয়োঁ অওর বহেনোঁ!’ খোলামেলা আন্তরিক গলায় বলতে শুরু করলেন তিনি, ‘এই মোতিহারির মাটি বড়ো পবিত্র। একদিন এখান থেকেই শুরু হয়েছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নতুন পর্যায়— আজ যাকে আমরা জানি সত্যাগ্রহ নামে।’ আরও একবার তিনি তাকালেন উৎসুক জনতার দিকে। কত আশা নিয়ে এঁরা তাকিয়ে রয়েছেন তাঁর দিকে!
পরক্ষণেই তাঁর কথা বন্ধ হয়ে গেল। একদৃষ্টে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একজন সাদামাটা মানুষের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। আস্তে আস্তে বড়ো হয়ে উঠছে তাঁর চোখ দুটো, যেন যা তিনি এই মুহূর্তে দেখতে পাচ্ছেন, তা বিশ্বাস করতে পারছেন না। 
প্রায় এক মিনিট স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর অপরিসীম বিস্ময়ের সঙ্গে রাজেন্দ্র প্রসাদ বললেন, ‘আমি কি ঠিক দেখছি?’ 
জনতার মধ্যে গুঞ্জন শোনা গেল। মাননীয় রাষ্ট্রপতির হাবভাব এরকম বদলে যাওয়ার কারণ তাঁরা বুঝতে পারছেন না। 
‘আমি ঠিকই দেখছি তো?’ আবার বললেন রাজেন্দ্র প্রসাদ, ‘আপ ওহি হো? সচ মে?’ 
সভার শ্রোতারা এবার একে-অপরের দিকে সবিস্ময়ে তাকাচ্ছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন না, রাষ্ট্রপতি কাকে উদ্দেশ্য করে এসব বলছেন। 
‘মহাশয়, আপ বাতক মিয়াঁ হি হো না? জি ম্যায় আপ-হি সে বোল রহা হুঁ!’ স্বভাববিরুদ্ধ উঁচু গলায় বললেন রাষ্ট্রপতি। 
এইবার সমস্ত চোখ ঘুরে গেল ভিড়ের মধ্যে প্রায় লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক মধ্যবয়সি মানুষের দিকে। তাঁর পরনে অসম্ভব জীর্ণ এবং মলিন পাঞ্জাবি আর খাটো ধুতি, গালে পাকা দাড়ি, অযত্নে কামিয়ে রাখা গোঁফ, হাতে একটা লাঠি। 
একজন দরিদ্র মুসলমান বৃদ্ধ, যেমনটা সমস্ত গ্রামেই দেখা যায়। এঁকে দেখে রাষ্ট্রপতি এমন বিহ্বল হয়ে পড়লেন কেন? 
‘আপনি ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন, মিয়াঁ? এখানে আসুন! এই মঞ্চে!’ অধৈর্য ভঙ্গিতে বলে উঠলেন রাজেন্দ্র প্রসাদ। 
বোঝাই যাচ্ছে, যাঁকে উদ্দেশ্য করে এই কথাগুলো বলা হচ্ছে, তিনি নিজের কর্তব্য ঠিক করে উঠতে পারছেন না‌। জনতা যে নিজের অজান্তেই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গিয়ে তাঁকে পথ করে দিয়েছে, সেটাও তিনি লক্ষ করেননি। 
‘আরে মিয়াঁ, আপ আইয়ে ইঁয়াহা, ইস মঞ্চ্ পর!’ আবার শোনা গেল রাষ্ট্রপতির গলা। সেই বৃদ্ধ মুসলমান কিন্তু এখনও একইরকম হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। 
আর থাকতে পারলেন না রাজেন্দ্র প্রসাদ। সমস্ত প্রোটোকল বিসর্জন দিয়ে দ্রুত পায়ে তিনি নেমে এলেন মঞ্চ থেকে, তারপর ছুটে-আসা দেহরক্ষী বাহিনীর এতটুকু পরোয়া না করে সরাসরি তিনি এগিয়ে গেলেন সেই বৃদ্ধের দিকে। ডানহাত দিয়ে মানুষটিকে প্রায় জড়িয়ে ধরে তিনি তাঁকে নিয়ে চললেন মঞ্চের দিকে, তারপর বসিয়ে দিলেন নিজের আসনের ঠিক পাশের চেয়ারটিতে। উপস্থিত দর্শকেরা স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল সেই দৃশ্যের দিকে। রাজেন্দ্র প্রসাদ কিন্তু ফিরেও তাকাচ্ছেন না। নীচু গলায় কথা বলে চলেছেন ছেঁড়াখোঁড়া জামা পরা বুড়ো মানুষটির সঙ্গে।
প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে আবার মাইকের সামনে ফিরে এলেন রাষ্ট্রপতি। তাঁর মুখের ভাব সম্পূর্ণ পালটে গিয়েছে, চোখে তীব্র বিস্ময়। 
‘মেরে ভাইয়োঁ অওর বেহেনোঁ!’ এবার যখন তিনি কথা বললেন, তখন তাঁর কণ্ঠস্বর আমূল বদলে গিয়েছে, ‘মোতিহারি আমাকে অনেক দিয়েছে। কিন্তু আজ যা দিল, তার চাইতে বড়ো উপহার এ জীবনে আর কখনো পেয়েছি কিংবা পাব বলে মনে হয় না।’ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে তিনি যোগ করলেন, ‘মোতিহারি আজ এই মানুষটিকে ফিরিয়ে দিয়েছে।’
প্রত্যেকের চোখ ঘুরে গেল রাষ্ট্রপতির পাশের চেয়ারে বসে থাকা বুড়ো মানুষটির দিকে। অসম্ভব সংকোচে গুটিসুটি মেরে বসে আছেন তিনি। 
আর এইবার ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতির মুখ থেকে উপস্থিত মানুষেরা শুনতে পাচ্ছেন এক আশ্চর্য কাহিনি, যা এর আগে কখনো প্রকাশ্যে আসেনি। 
‘ইয়ে বড়ি পুরানি বাত হ্যায়।’ বলে চলেছেন রাষ্ট্রপতি, ‘তেত্রিশ বছর আগের কথা। শুক্লাজি, মাননীয় রাজকুমার শুক্লাজির আমন্ত্রণে বাপু— মানে মহাত্মা গান্ধী প্রথম এলেন চম্পারণে। এখানকার নীলচাষিদের জন্য সত্যাগ্রহ শুরু করলেন তিনি।’ 
থরথর করে কাঁপছে রাজেন্দ্র প্রসাদের গলা, তন্ময় হয়ে শুনে চলেছে উপস্থিত জনতা এক আশ্চর্য বৃত্তান্ত, যা আজকের আগে পর্যন্ত ইতিহাস লিখে রাখার দরকার বলে মনে করেনি, অথচ যা না ঘটলে বদলে যেত ভারতের ইতিহাস। 
চম্পারণ সত্যাগ্রহ শুরু হল ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে। গান্ধীজি তখন ঘুরে বেড়াচ্ছেন চম্পারণের গ্রামে গ্রামে। ছড়িয়ে দিচ্ছেন সত্যাগ্রহের আদর্শ। অহিংসা যে আন্দোলনের হাতিয়ার হতে পারে, তা প্রথম জানতে পারছেন বিহারের ছোটো ছোটো গ্রামে থাকা অত্যাচারিত মানুষেরা। 
এর প্রায় দু’দশক আগেই জার্মানিতে আবিষ্কার হয়ে গিয়েছে কৃত্রিম নীল। ফলে নীলচাষিদের উপর যে ভয়ংকর অত্যাচার হত, তাও থেমে গিয়েছে। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি থেকে নীলের রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। ফলে নীলচাষ আবার হয়ে দাঁড়াল একটা লাভজনক ব্যবসা। বিহারের গ্রামেগঞ্জে নতুন করে শুরু হল ভারতীয় এবং ইংরেজ জমিদারদের অত্যাচার। চাষিদের তারা বাধ্য করতে লাগল জমির একটা অংশে নীল চাষ করতে। রাজকুমার শুক্লা গান্ধীজিকে সেই সংবাদ দিলেন। শুরু হল চম্পারণ সত্যাগ্রহ। 
জমিদার ও প্ল্যান্টাররা প্রমাদ গুনলেন। তাঁরা বুঝতে পারছিলেন, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী নামের এই অগ্নিশিখাটিকে দ্রুত নিভিয়ে দিতে না-পারলে তা একদিন সমস্ত ভারতেই জ্বালিয়ে তুলবেন বিদ্রোহের আগুন। এই বিষবৃক্ষের অঙ্কুরেই বিনাশ হওয়া চাই। 
আর তার জন্য এক ইংরেজ প্ল্যান্টার— তার নাম আরউইন— এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র করলেন। 
বিস্তৃত আলোচনার জন্য একদিন তিনি গান্ধীজিকে নিমন্ত্রণ করলেন নৈশভোজে। আমন্ত্রণটি এসে পৌঁছল রাজেন্দ্র প্রসাদের কাছে। গান্ধীজি তা জানতে পেরে মৃদু হেসে বললেন, ‘আমার খাদ্যাভ্যাসের কথা তো তোমার জানাই আছে। তাই নৈশভোজের নিমন্ত্রণ গ্রহণটা বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না?’ 
রাজেন্দ্র প্রসাদ ও গান্ধীজির অন্য ঘনিষ্ঠ অনুগামীরা অবশ্য জানেন সে কথা। গান্ধীজি প্রায় কিছুই খান না। একেই তিনি কঠোরভাবে নিরামিষাশী। তার উপর নিতান্ত সাদামাটা খাওয়া-দাওয়া করেন। শুধু খাওয়ার শেষে সামান্য ছাগলের দুধ পান করেন। 
রাজেন্দ্র হাসতে হাসতে বললেন, ‘মনে করুন আমরা আলোচনা করতেই যাচ্ছি। নৈশভোজ ব্যাপারটা সত্যিই আপনার পক্ষে একটু বেমানান হয়ে যাবে।’ 
নির্দিষ্ট দিনে সকলে গিয়ে পৌঁছালেন আরউইন সাহেবের বাংলোতে। বিলাসবহুল বাংলো। আহারের আয়োজন বড়ো কম নয়। তা দেখে গান্ধী মনে মনে হাসতে লাগলেন। তাঁর সঙ্গীরাও বহু কষ্টে হাসি সংবরণ করলেন। 
ফল এবং কাঁচা সবজি— শুধু এই খেলেন মহাত্মা। কথা চলতে লাগল। ক্রমেই বোঝা যাচ্ছিল, আরউইন আর যাই হোক, সমস্যার নিরসনের জন্য গান্ধীকে আমন্ত্রণ জানাননি। তিনি একগুঁয়ের মতো ক্রমাগত তর্ক করে চললেন। এসব ব্যাপারে অবশ্য গান্ধীজির ধৈর্য অপরিসীম। তিনি ক্রমাগত যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে চললেন, বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগলেন— চাষিরাই এই দেশের মেরুদণ্ড। তাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ যদি বিনষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আখেরে জমিদারেরাও ধ্বংস হয়ে যাবেন।
এমন সময় সেখানে প্রবেশ করল এক ভৃত্য। তার হাতে একটি প্লেটের উপর কাচের গেলাস। তাতে গান্ধীজির প্রিয় সেই পানীয়। ছাগদুগ্ধ। এতক্ষণে প্রিয় খাবার দিকে দেখতে পেয়ে গান্ধীজি সোৎসাহে হাত বাড়িয়ে দিলেন। 
ঠিক তখনই প্রথমবার এক অদ্ভুত অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেন রাজেন্দ্র প্রসাদ। যে ভঙ্গিতে সাহেবের এই কর্মচারীটি গান্ধীজির দিকে এগিয়ে আসছে, যেভাবে তার ধরে থাকা প্লেট ও গ্লাস ক্রমাগত কাঁপছে, তা ঠিক স্বাভাবিক নয়। নিজের অজান্তেই সোজা হয়ে বসলেন রাজেন্দ্র প্রসাদ। গান্ধীজি আরউইনের সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত। তিনি কর্মচারীটির বিচিত্র হাবভাব লক্ষ্য করেননি। অন্যমনস্ক অবস্থায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন গ্লাসটি নেওয়ার জন্য। 
আর ঠিক তখনই প্রায় অস্ফুটে, বিড়বিড় করে সেই মলিন পোশাক পরা মানুষটি বিশুদ্ধ ভোজপুরি ভাষায় বলে উঠল, ‘ই-মা জহর বা!’ 
মুহূর্তের জন্য রাজেন্দ্র প্রসাদের মনে হল, তিনি যেন নিজের আসনে জমে গিয়েছেন। তাঁর হাত-পা নড়ছে না। মস্তিষ্ক হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। 
‘এতে বিষ আছে!’ 
আরউইন মন দিয়ে শোনেননি কথাটা। তাঁর চোখ গান্ধীজির উপরে স্থির হয়ে রয়েছে, যেন দুধ নিয়ে একজন পরিচারকের এগিয়ে আসার এই দৃশ্যটা তিনি খেয়ালই করেননি। 
ইতিমধ্যে গান্ধীজি নাগাল পেয়ে গিয়েছেন লোকটির হাতে থাকা গ্লাসের। স্বাভাবিকভাবেই প্লেটের উপর থেকে সেটি তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। 
আর এবার সকলকে স্তম্ভিত করে দিয়ে সেই গ্লাসটিকেই চেপে ধরল চাকরটি। থরথর করে কাঁপছে তার হাত, যেন শেষ মুহূর্তে সে ঠিক করে ফেলেছে— কোনোক্রমেই গান্ধীজির হাতে সে তুলে দেবে না গ্লাসটা। প্রায় কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে সে গ্লাসটাকে।
এতক্ষণে গান্ধীজির ব্যাপারটা খেয়াল হল। সামান্য বিস্মিত হয়ে তিনি ফিরে তাকালেন চাকরটির মুখের দিকে। তার গালে দাড়ি, গোঁফ কামানো, পরনে চাপরাশির মলিন উর্দি। চোখ দু’টি জলে ভরে গিয়েছে। ধীরে ধীরে নড়ছে মাথা, যেন এক অলঙ্ঘ্য নিষেধাজ্ঞা। 
এতক্ষণে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলেন রাজেন্দ্র প্রসাদ। এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় তিনি বললেন, ‘চলিয়ে বাপু। অব হমে যানা চাহিয়ে।’ 
অসম্ভব অবাক হয়ে ফিরে তাকালেন গান্ধীজি, ‘কেয়া হো গয়া?’ 
‘কুছ নেহি। আপ চলিয়ে। আভি।’ পরিস্থিতি আজ রাজেন্দ্র প্রসাদকে বাধ্য করছে মহাত্মার সঙ্গেও প্রায় আদেশের সুরে কথা বলতে। 
হতভম্ব গান্ধীজি দ্রুত উঠে পড়লেন। কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না তাঁর। কিন্তু রাজেন্দ্র প্রসাদের বলার ভঙ্গির মধ্যেই এমন কিছু আছে যে, তিনি সে কথা অমান্য করতে পারছেন না। 
ঠিক এইভাবেই সেদিন মহাত্মা গান্ধীর প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন এই মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির পাশের চেয়ারটিতে বসে থাকা হতদরিদ্র মানুষটি। যাঁর নাম বাতক মিয়াঁ। কাঁপা গলায় সেই ঘটনার বিবরণ দিয়ে চললেন রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ। বিস্ফারিত চোখে দর্শকেরা তাকিয়ে রইলেন চেয়ারের মধ্যে প্রায় মিশে যাওয়া লজ্জিত বিড়ম্বিত মানুষটির দিকে। 
‘আর এর ফলে সর্বস্ব হারাতে হয়েছিল বাতক মিঞাকে,’ বলে চললেন রাষ্ট্রপতি, ‘চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় তাঁকে। সাংঘাতিক শারীরিক অত্যাচার করা হয়। শেষ পর্যন্ত গ্রাম থেকেও বহিষ্কার করা হয় তাঁকে। আর সেই কথাগুলো কি না আমি জানতে পারলাম আজ! সেই ঘটনা ঘটে দেওয়ার তেত্রিশ বছর পর! এ তো আমারও লজ্জা!’ অসম্ভব ব্যক্তিত্ববান রাজেন্দ্র প্রসাদকে এমন আবেগতাড়িত হয়ে পড়তে কেউ কখনো দেখেনি।
গান্ধীজির প্রাণ বাঁচিয়ে নিজে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সেই গরিব মানুষটি অবশ্য এখন উঠে দাঁড়িয়েছেন আসন ছেড়ে। হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে বারবার বলে চলেছেন, ‘আমার জায়গায় যে-ই থাকত, সে-ই এই কাজ করত, হুজুর! এ তো আমার কর্তব্য... আমাদের কর্তব্য!’ 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ