রূপক বর্ধন রায়: ‘আমি কবি যত কামারের আর কাঁসারির আর
ছুতোরের মুটে মজুরের,
—আমি কবি যত ইতরের!’
লিখেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। সে লেখা পড়া ইস্তক প্রেমেন মিত্তির আমারও কবি। আর হবেনই বা না কেন! আমি পেশায় বিজ্ঞান-প্রযুক্তির শ্রমিক, আর মননে সাহিত্যের। কী ভাবছেন? ও দুটো আবার একত্রে হয় নাকি? হয়। একটু তলিয়ে ভাবলেই হয়। দু’-একটা স্তবক পেরিয়ে মিত্র সাহেব যখন লিখছেন,
‘কামারের সাথে হাতুরি পিটাই
ছুতোরের ধরি তুরপুন,
কোন সে অজানা নদীপথে ভাই
জোয়ারের মুখে টানি গুণ!’
তখন হাজার চাইলেও কি প্রযুক্তি ও শ্রমের ইতিহাসকে কবিতার থেকে আলাদা করে দেখতে পারবেন?
সুকুমার থেকে রাজশেখর
আমার ঈশ্বর নেই। তবে থাকলে তিনি নিশ্চিতভাবেই সুকুমার রায় হতেন। আসলে বিজ্ঞান তো কেবলই গুরুগম্ভীর চর্বিতচর্বণ নয়, তাতে মজা আছে, আনন্দ আছে, আর আছেন সুকুমার রায়। ‘হাতুড়ে’ কবিতাটা মনে পড়ে?
‘শুয়ে কেরে? ঠ্যাং ভাঙা? ধরে আন্ এখেনে-
স্ক্রুপ দিয়ে এঁটে দেব কিরকম দেখেনে,-’
একমাত্র সুকুমারের মতো বিদগ্ধ বিজ্ঞান-রসিকই মজার ছলে ডাক্তারি ও ইঞ্জিনিয়ারিংকে দু’লাইনে মিলিয়ে দিতে পারেন। একইভাবে ‘বিজ্ঞান শিক্ষা’ কবিতায় দুই লাইনের মশকরায় ভেক্টর-অ্যানালিসিস, নিউটোনিয়ান মেকানিক্স, অপ্টিক্স ও ম্যাগনেটিজমের মতো ফলিত পদার্থবিজ্ঞানের (অ্যাপ্লায়েড ফিজিক্স) দিকগুলিও উঠে আসে—
‘হিজিবিজবিজ বলল, মুণ্ডুতে ‘ম্যাগনেট্’ ফেলে, বাঁশ দিয়ে ‘রিফ্লেক্ট’ ক’রে
ইট্ দিয়ে ‘ভেলসিটি’ ক’ষে দেখি মাথা ঘোরে কি না ঘোরে।’
কল্পবিজ্ঞানে ‘আবোল তাবোল’-এর জুড়ি মেলা ভার। ‘কিম্ভূত’, ‘ট্যাঁশ গরু’র মতো তেমন অদ্ভুত জৈবিক মিশ্রণ টোলকিয়েনের মিডল আর্থেও পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ! আবার বিজ্ঞানমনস্কতার ক্ষেত্রে ‘হাত গণনা’ ও ‘গন্ধবিচার’ কবিতাদুটোও লা-জবাব! কাকে ছেড়ে কাকে ধরবেন? ‘হাত গণনা’য় ‘ও পাড়ার নন্দ গোসাই, আমাদের নন্দ খুড়ো’কে সদাই হুঁকো হাতে হাস্যমুখে দেখা যেত ঠিকই, তবে যেদিনই হাত গণনার মতো অবৈজ্ঞানিক অন্ধবিশ্বাসের দৌলতে তিনি জানতে পারলেন— ‘...ঘাড়ে আছেন শনি, ফাঁড়ায় ভরা আয়ুর রেখা’ সেদিন থেকেই আমরা দেখলাম ‘বুড়ো আছে নেইকো হাসি, হাতে তার নেইকো হুঁকো।’ যে কবিতা দিয়ে সুকুমার প্রসঙ্গ শুরু করেছিলাম, সেই ‘হাতুড়ে’ কবিতায় তিনি যখন লেখেন,
‘ছেলে হও, বুড়ো হও, অন্ধ কি পঙ্গু,
মোর কাছে ভেদ নাই, কলেরা কি ডেঙ্গু’
তখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের হাত ধরে জাত-পাত-ধর্ম অতিক্রম করে মানুষের যাপন হয়ে ওঠে একান্নবর্তী। এই
লাইন দু’টির তুলনায় বিজ্ঞানমনস্ক সমাজবাদের বৃহত্তর উদাহরণ সমগ্র কাব্য ইতিহাসে আর পাওয়া যাবে কি না, সে বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার যথেষ্ট সংশয় আছে।
সুকুমার আমার ঈশ্বর হলে, বেঁচে থাকলে গদ্যরাজ, রসরাজ এবং রসায়ন-আচার্য রাজশেখর বসু যে আমার প্রিয় বন্ধু
হতেন, সেকথা তার গদ্য-প্রবন্ধ-পদ্যের লাইনে লাইনে টের পাওয়া যায়।
সারাদিন প্রযুক্তিগত ম্যানুফ্যাকচারিং ও গবেষণা সামলানোর পর, শেষ রাতে শুয়ে শুয়ে পড়ি—
‘অনন্তের কোলে রহিগো আমরা, অনন্ত হইতে এসেছি চলে।
অনন্তে আবার ফিরে যাব মোরা, বারেক হেরিয়া সুনীল জলে।’ (নাবিক)
এ লেখা আমায় বৃহত্তর মানব অস্তিত্বের দিকে নিয়ে যায়। আমি হারিয়ে যাই। সেদিন লেখালেখি নিয়ে নানান কথায় এক
বন্ধুকে তাই বলেই ফেললাম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি টান আর কবিতার প্রেম একইসঙ্গে ভিন্ন ও অভিন্ন। প্রথমটা টানে, পরেরটা স্বাধীন করে। যে উভয় দিকেই আগ্রহী, সে একই পৃথিবীকে দু’ভাবে দেখতে শেখে। সত্যের দিকে যাওয়ার দুই ভিন্ন অথচ অভিন্ন রাস্তা।
রস ও রসায়ন-রাজ রাজশেখরের কবিতায় হাস্যরসের উপস্থিতি যে সমপরিমাণে থাকবে, সেকথা বলাই বাহুল্য। ‘জামাইবাবু ও বউমা’ নামক কবিতার নীচে কবির নামের জায়গায় একমাত্র পরশুরামই লিখতে পারেন, ‘By a Veteran’; এবং এক অকর্মণ্যের ঢেঁকি বাঙালি জামাই ‘যাদু বাছাধনের’ নিজের কথায় তাঁর বিজ্ঞান বিমুখতার পরিচয়ে জানান,
‘কোথাকার এক বাঁকা প্যারাবোলা
ফোকাস্ কোথায় জানে কোন্শালা?
হাইপার বোলা খাক্ কাঁচকলা
মরুক এলিপ্স ঘোড়ার ডিম্।
BaCl2+K2SO4
এ সকল পড়ে কিবা লাভ মোর
ফিজিক্স্ কেমিস্ট্রী পড়ে গুলি খোর
ফিজিক্স্ তেঁতুল কেমিস্ট্রী নিম।’
স্টেথোস্কোপের ছড়া
দেশের গপ্পো তো হল। সাহিত্য-প্রযুক্তির প্রেম ও সমবর্তের কথাও এল। এবার ইংরেজি ভাষার একটা দিলখুশ কবিতা পড়া যাক!
‘There was a young man in Boston town,
He bought him a stethoscope nice and new,
All mounted and finished and polished down,
With an ivory cap and a stopper too.
It happened a spider within did crawl,
And spun him a web of ample size,
Wherein there chanced one day to fall
A couple of very imprudent flies.’
এই কাব্যাংশের রচয়িতা অলিভার ওয়েন্ডেল হোমস সিনিয়র (১৮০৯–১৮৯৪)। দীর্ঘ কবিতাটির নাম ‘দ্য স্টেথোস্কোপ সং: আ প্রফেশনাল ব্যালাড’। কবিতাটা এরকম: এক তরুণ চিকিৎসক স্টেথোস্কোপের উপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে গিয়ে তার ভেতরে বাসা বাঁধা মাকড়সা ও মাছির শব্দকে রোগীর শরীরের লক্ষণ বলে ভুল করেন এবং একের পর এক ভুল রোগনির্ণয় করেন। শেষ পর্যন্ত প্রকাশ পায় যে ভুল চিকিৎসার কারণ যন্ত্র নয়, চিকিৎসকের বিচারবুদ্ধির অভাব ও অন্ধ প্রযুক্তি নির্ভরতা। উনিশ শতকের আমেরিকায় ওয়েন্ডেল হোমস সিনিয়র বিজ্ঞান-সাহিত্য সেতুবন্ধনীর এক বিশিষ্ট উদাহরণ। তিনি একাধারে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক, চিকিৎসক, প্রাবন্ধিক এবং কবি। আধুনিক মার্কিনি ক্লিনিক্যাল চিকিৎসার প্রবক্তাদের অন্যতম হোমস চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রযুক্তির গুরুত্ব স্বীকার করলেও অন্ধ প্রযুক্তি নির্ভরতার তীব্র সমালোচক ছিলেন। সেখান থেকেই এই দীর্ঘ কবিতার জন্ম। যন্ত্র যে কখনও চিকিৎসকের মানবিক বিচারবুদ্ধির বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না, সে নিছকই বাসের হেল্পার, এই ছিল তাঁর মূল বক্তব্য। আসলে যে সময়ে স্টেথোস্কোপের জন্ম, সেই ১৮১৬ সালে ফরাসি চিকিৎসক রেনে-থেওফিল-হায়াসিন্থ লায়েনেকের হাতে, সে সময়ে চিকিৎসক ও সার্জনের মধ্যে সামাজিক মর্যাদার এক বিরাট তারতম্য ছিল। চিকিৎসকদের বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান ও বিচারক্ষমতাকে বিশেষ সম্মানের নজরে দেখা হলেও অস্ত্রোপচার সেই জায়গাটা তখনও করে উঠতে পারেনি। সে তখনও সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন। তার কারণ অবশ্যই সেই সময়ের প্রযুক্তিগত অপারগতা। কিন্তু স্টেথোস্কোপ তো আর কাটাছেড়ার যন্ত্র নয়! তবে?
সমস্যা অন্যত্র! যন্ত্রভীতি আমাদের মজ্জাগত; অনেক রোগী স্টেথোস্কোপ
দেখেই ভয় পেতেন। তখনকার দিনে অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি কেবল সার্জনরাই ব্যবহার করায় রোগীরা মনে করতেন- স্টেথোস্কোপ আছে মানেই বুঝি শীঘ্রই অস্ত্রোপচার হবে। তাছাড়া স্টেথোস্কোপ বহনেরও কিছু কিছু অসুবিধা ছিল।
কেউ কেউ টুপির ভিতর আড়াআড়িভাবে রেখে বহন করতে যাওয়ায় হাস্যকর বিপত্তি ঘটত। একবার যুদ্ধের সময় এডিনবরার এক মেডিকেল ছাত্রের টুপি থেকে স্টেথোস্কোপ পড়ে যাওয়ায় তাকে বিপজ্জনক অস্ত্র বহনের অভিযোগের মুখে পড়তে হয়। তাছাড়া স্টেথোস্কোপ দেখে মানুষ সার্জন বলে ভুল করবে ভেবে অনেক ডাক্তার ও পথ মাড়াতেনই না। শোনা যায় খানিকটা তেমনই ছিলেন আমাদের টেকনোস্কেপ্ট (প্রযুক্তিসন্দেহী) হোমস সাহেব। তাই তাঁর লেখা সেই ব্যঙ্গগাথা শেষমেশ প্রযুক্তি ও কবিতার সম্পৃক্ত-ইতিহাসের এক রেলিক হয়ে থেকে গিয়েছে।
অন্তর হ’তে বিদ্বেষ-বিষ নাশো...
দেশ, কাল, ধর্ম, লিঙ্গ নির্বিশেষে কখন যে কবিতার মোড়কে প্রযুক্তি বা বিজ্ঞানের মোড়কে সাহিত্যে ঢুকিয়ে সেকালের প্রেমেন মিত্র, হোমস, সুকুমার, রাজশেখর, বা হালের মালা রাধাকৃষ্ণণ, অনিতা থাম্পিরা আমাদের সমাজকে নানান দ্বন্দ্বমূলক বাঁকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেন, সেটা কি তাঁরা নিজেরাও জানতে পারেন? প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের সঙ্গে আমাদের ও আমাদের সমাজের এই যে লাভ-হেট রিলেশন, কয়েক সহস্রাব্দ জোড়া প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতায় সেটা যে বস্তুটি বাঁচিয়ে রেখেছে তার নাম সাহিত্য। সেই সাহিত্যের আদিমতম এক রূপ কাব্য, আর আধুনিকতম রূপগুলির অন্যতম সিনেমা।
বিজ্ঞান ও কবিতাকে আলাদা করে ভেঙে দু’টুকরো করে দেখার সমস্যা আমাদের মজ্জাগত নয়, এই পৃথকীকরণ আমরা স্বেচ্ছায় মিথ্যে-আধুনিকতার নামে আমদানি করেছি। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক অধ্যাপক সি পি স্নো যখন বলেন, ‘What we need to do is to humanize the scientist and simonize the humanist.’ আমরা সবিস্ময়ে খেয়াল করি যে আমাদেরই প্রণম্য আরেক প্রথিতযশা বিজ্ঞানী কয়েক দশক আগেই বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে জানতে চেয়েছিলেন- ‘...প্রশ্ন হইতে পারে, সাহিত্য-ক্ষেত্রে কি বিজ্ঞানসেবকের স্থান আছে?’
সম্মেলনের সভাপতি হিসাবে বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর ভাষণে উঠে এসেছিল এই প্রশ্ন। পরে অবশ্য ‘বিজ্ঞানে সাহিত্য’ নামক প্রবন্ধ হিসাবে তাঁর ‘অব্যক্ত’ গদ্যগ্রন্থে (১৯২১) সেই লেকচারের ঠাঁই হয়। সে বই পড়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিঠিতে তাঁকে লেখেন—‘...যদিও বিজ্ঞানবাণীকেই তুমি তোমার সুয়োরাণী করিয়াছ, তবু সাহিত্যসরস্বতী সে পদের দাবী করিতে পারিত—...’। আমারদের মতো সাহিত্য-ব্রতী প্রযুক্তি-শ্রমিকের এ জীবনে আর কী চাওয়ার থাকে বলুন? আসলে ওই যে রস-রাজশেখর বলে গেছেন ‘সর্বভুক পাঠক হাঁ করিয়া আছেন। ... রসস্রষ্টা কাহাকেও বঞ্চিত করিতে ... পারেন না’; এই ভেঙে টুকরো করে দেখার দিনে আমরা অর্থাৎ সংস্কৃতির ব্রিজ-মিস্তিরিরা তাই একাত্মবোধের রোম্যান্টিসিজমেই বুক বেঁধেছি।