Bartaman Logo
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

রোহিতের উত্তরণ

বন কখনোই সহজ সরলরেখায় চলে না। বরং পথের বাঁকে বাঁকে প্রায়শই থাকে অজানা মোচড়। যা অনেক ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে যায় কল্পনা, পালটে দেয় জীবন।

রোহিতের উত্তরণ
  • ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পরিবারের অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে লড়াই করে কীভাবে সাফল্যের চূড়ায় উঠলেন ‘হিটম্যান’ রোহিত শর্মা। সেই লড়াইয়ের গল্পই শোনালেন সৌরাংশু দেবনাথ।

Advertisement

বন কখনোই সহজ সরলরেখায় চলে না। বরং পথের বাঁকে বাঁকে প্রায়শই থাকে অজানা মোচড়। যা অনেক ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে যায় কল্পনা, পালটে দেয় জীবন। গলি থেকে রাজপথে ঘটে উত্তরণ। রোহিত শর্মাই এর উদাহরণ। কৈশোরে মুম্বইকরের জীবনও হঠাৎই পালটেছিল একশো আশি ডিগ্রি। পরশপাথরের মতোই যা এনেছিল সোনালি স্পর্শ। নইলে হিটম্যান হয়তো হারিয়েই যেতেন হাজারো প্রতিভার গোলকধাঁধায়!  
ছেলেবেলায় রোহিত প্রধানত ছিলেন অফস্পিনার। ব্যাটও করতেন, তবে স্কুল-জীবনে সবাই চিনত স্পিনার হিসাবেই। অনূর্ধ্ব-১২ পর্যায়ে খেলার সময় প্রথমবার কোচ দীনেশ লাডের চোখে পড়েন। রত্ন চিনতে দেরি হয়নি গুরুর। জহুরির মতোই সুপ্ত প্রতিভা চিনেছিলেন এক লহমায়। তখন ‘স্বামী বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’-এর ক্রিকেট কোচ দীনেশ। উপলব্ধি করলেন, ঠিকঠাক গড়েপিটে নিতে একে নিজের কাছে রাখা জরুরি। তবেই যথাযথ বিকাশ সম্ভব। তারজন্য স্কুল বদলাতে হবে। কিন্তু তা রোহিতের বাবা-মায়ের অনুমতি ছাড়া সম্ভব নয়। দীনেশ তাই ডাকলেন তাঁদের। আর সমস্যা এখানেই!
আর্থিক সচ্ছলতা নেই শর্মা পরিবারে। ডম্বিভলিতে একটা ওয়্যারহাউসের কেয়ারটেকার বাবা। থাকেন এক কামরার ফ্ল্যাটে। ছেলেকে সঙ্গে রাখার সঙ্গতি নেই বাবা, মায়ের। ‘শর্মাজি কা বেটা’র ঠিকানা তাই বরিভলি। সেখানে কাকার সঙ্গে থাকতে হয় রোহিতকে। বাবার পক্ষে কাজকর্ম ছেড়ে স্বামী বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে এসে দীনেশের সঙ্গে দেখা করা সম্ভবই নয়। তাই দিন কয়েক পর ভাইপোকে নিয়ে কাকাই কথা বলতে এলেন স্কুলে। সঙ্গে সঙ্গে ডিরেক্টর যোগেশ প্যাটেলের কাছে অ্যাডমিশনের জন্য রোহিতকে নিয়ে গেলেন দীনেশ। যে কোনো স্কুলেই ভরতির নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। সেই সংক্রান্ত কথাবার্তা সব হয়ে গেল। এরপরই গোলযোগ। আচমকা গজিয়ে উঠল সমস্যা। আর তা রীতিমতো জটিল।
তখন আওয়ার লেডি অব ভাইলানকান্নি হাই স্কুলের ছাত্র রোহিত। সেখানে মাসিক ফি দিতে হয় মাত্র ৩০ টাকা। অথচ, স্বামী বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ভরতি হলে প্রতি মাসে দিতে হবে ২৭৫ টাকা। যা শর্মা পরিবারের সাধ্যের বাইরে। নিরুপায় কাকা বলেই ফেললেন, ‘এখানে ভরতি হওয়ার জন্য বলায় আমরা সম্মানিত। ধন্যবাদ জানাচ্ছি তার জন্য। কিন্তু এত টাকা আমরা দিতে পারব না। ফলে ভরতি হওয়া অসম্ভব।’ 
চোখের সামনে যেন পৃথিবীটা দুলে উঠল দীনেশের। হাতছাড়া হয়ে যাবে এমন প্রতিভা? মাথায় যেন বজ্রাঘাত! কী করে এর সমাধান সম্ভব, খুঁজতে থাকলেন জলদি। একটা রাস্তা মিলেও গেল। স্কুলের ডিরেক্টরকে সরাসরি তদ্বির করলেন, নিখরচায় ভরতি করতে হবে রোহিতকে। কিন্তু স্কুলের ৪০ বছরের ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত নেই। কী করে এটা সম্ভব হবে? দীনেশ যদিও হাল ছাড়ার পাত্র নন। তিনি বোঝানোর মরিয়া চেষ্টা করলেন আবার। যুক্তি দিলেন যে, এমন ট্যালেন্টের যথাযথ গাইড প্রয়োজন। গরিব পরিবারের বলেই রোহিতের আরও বেশি প্রয়োজন তা। আর পকেটে টাকা না থাকা অপরাধ নয়। বরং এমন প্রতিভার পাশে না থাকাটাই ঘোরতর অন্যায়। সেটা হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলার মতোই অবিবেচকের কাজ হবে। আর অকালে এমন প্রতিভা ঝরে গেলে নিজেদের ক্ষমাই বা করবেন কীভাবে?
অবশেষে মন গলল ডিরেক্টরের। সম্মতি দিলেন তিনি। ঠিক হল, স্কলারশিপ দেওয়া হবে রোহিতকে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন দীনেশ। সপ্তম শ্রেণিতে ভরতি হলেন রোহিত। তখনও পরিচিতি অফস্পিনার হিসাবেই। নেটে ব্যাট কার্যত করতেন না। একদিন স্কুলে ঢোকার মুখে যেন বিদ্যুতের ‘শক’ খেলেন দীনেশ। নেটে হেলমেট পরা অচেনা ছেলেটা কে? দারুণ নকিং করছে তো! হাতে স্ট্রোকের ফুলঝুরি। ব্যাটিং ভঙ্গিও সাবলীল, অদ্ভুত রাজকীয়। বিস্ময় ক্রমশ বাড়ছিল দীনেশের। কিছুক্ষণ পরে টের পেলেন, এটা রোহিত নামের স্কলারশিপে ভরতি হওয়া ছেলেটা! এরপরই বদলাল নেটের রুটিন। অনুশীলনে ক্রমশ ব্যাটসম্যান হিসাবেও মিলল গুরুত্ব। স্কুলের ম্যাচে রোহিত নামতে থাকলেন ছয়-সাত নম্বরে। সেখান থেকেই একদিন প্রোমোশন পেয়ে এলেন শুরুতে। অনূর্ধ্ব-১৪ জাইলস শিল্ডে ওপেন করে ১৪০ রানের ঝকঝকে ইনিংসের পর অবশ্য আর ফিরে তাকাতে হয়নি। 
তখনই রোহিতের আত্মবিশ্বাস মুগ্ধ করত কোচকে। কোনো পরিস্থিতিতেই ঘাবড়ায় না ছেলেটা। চাপের মুখেও থাকে অবিচল। স্কুল ক্রিকেটে একটা ম্যাচে যেমন টার্গেট আড়াইশোর মতো রান। চার উইকেট পড়ে গিয়ে রীতিমতো ধুঁকছে দল। ড্রিংকস ব্রেকে টেনশনে পড়ে যাওয়া কোচ মেসেজই পাঠিয়ে ফেললেন। জিতিয়ে ফিরতে হবে, রোহিতের জন্য থাকল সতর্কবার্তা। অবাক করার হল, ওপ্রান্ত থেকেও এল পালটা মেসেজ। স্যার, চিন্তা করবেন না, আমি আছি তো! নিছক মুখের কথা নয়, করেও তা দেখালেন। এল ১৬০ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংস। চিন্তা কীসের, রোহিত হ্যায় না!
আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের গোড়ার দিকে অবশ্য নিজেকে মেলে ধরতে পারছিলেন না। সুযোগ আসছিল, কিন্তু সদ্ব্যবহার কোথায়? ক্রিকেটমহলে ফিসফাস ক্রমশ বাড়ছিল। ক্রমাগত ব্যর্থতার পরও কেন খেলানো হচ্ছে রোহিতকে? ঘরের মাঠে ২০১১ বিশ্বকাপের স্কোয়াডে অবশ্য রাখাই হল না। আশাভঙ্গের যন্ত্রণায় রোহিতের অবস্থা তখন শোচনীয়। ধাক্কাটা হজমই হচ্ছে না। মন খারাপ, ক্রিকেটেই যেন হারিয়েছে উৎসাহ। শিষ্যের এমন বিপর্যস্ত দশা উদ্বেগ বাড়াল দীনেশের। একদিন বাড়িতে ডেকে পাঠালেন ছাত্রকে। রোহিত আসতেই শুরু বকাবকি। ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘এমন ট্যালেন্ট তোর। এত সাপোর্টও পাচ্ছিস। কিন্তু ক্রিকেটে সময় দিচ্ছিস না একেবারেই। এভাবে চললে লোকে কিন্তু ভুলে যাবে তোকে। কেউ মনেই রাখবে না। সেটাই কি চাইছিস?’ মাথা নীচু রোহিতের। একবারও প্রতিবাদ করেননি। সব অভিযোগই যে সত্যি। চোখের কোণে অবশ্য ঝলসে উঠল নীরব প্রতিজ্ঞা। সেটাই শব্দের আকার নিল, ‘স্যার, আমার নামে আর কোনো অভিযোগ পাবেন না। প্রমিস।’ কথা রেখেছিলেন হিটম্যান!
ব্যাট হাতে এরপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেটে পড়ে থাকতেন। সাধনায় সিদ্ধিলাভে সাদা বলের ক্রিকেটে ক্রমশ অপরিহার্য হয়ে উঠলেন। ২০১৪ সালে ইডেনে একদিনের ক্রিকেটে সর্বাধিক ২৬৪ রানের এভারেস্টে পড়ল পা। টেস্টে ওপেনার হিসাবেও মিলল প্রতিষ্ঠা। ধীরে ধীরে তাঁর ব্যাটে চুরমার রকমারি রেকর্ড। গড়লেন একের পর এক কীর্তি। তিন ঘরানায় দেশের নেতৃত্বও দিলেন। মুকুটে যোগ হল বাহারি সব পালক। ক্যাপ্টেন হিসাবে কুড়ি ওভারের বিশ্বকাপ জেতা যেমন অনন্য কীর্তি। পকেটে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিও। আইপিএলের দুনিয়াতেও রয়েছে চোখধাঁধানো সাফল্য। মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের ক্যাপ্টেন হিসাবে পাঁচবার ধরেছেন ট্রফি। এমন আকাশছোঁয়া সাফল্য খুব কম ক্রিকেটারেরই আছে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ