সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত: ‘সিনেমার অনিষ্টের বিরুদ্ধে যদি আমি পিকেটিং শুরু করি, তবে হয়তো আমার জাতও থাকবে না, ‘মহাত্মা’ উপাধিও থাকবে না! আমি শুধু বলতে পারি, অধিকাংশ সিনেমাই ক্ষতিকর।’ অন্য কেউ নন, এই উপলব্ধি স্বয়ং মহাত্মা গান্ধীর। নিজের সম্পাদিত ‘হরিজন’ পত্রিকার ১৯৪২ সালের ৩ মে সংখ্যায় সেকথা প্রকাশ করতেও তিনি পিছ পা হননি। বিষয়টি আরও বিস্ময়কর এই কারণে যে, তিনি নিজের জীবদ্দশায় দেখেছিলেন একটিমাত্র চলচ্চিত্রের কিছু অংশ—বিজয় ভাট পরিচালিত ‘রাম রাজ্য’ (১৯৪৩)। পর্দার সেই জাদু তাঁর মন স্পর্শ করতে পারেনি। অথচ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা চেতনার উন্মেষে সিনেমার অবদানও কিছু কম ছিল না।
ভারতীয় সিনেমার বিকাশের সঙ্গেসঙ্গেই তৎকালীন সমাজে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের চেতনা তাকে প্রভাবিত করেছিল। শিল্প ও সংস্কৃতির এই নতুন ধারাটিতেও অগ্রণী ছিলেন এক বাঙালি। হীরালাল সেন। তাঁর হাত ধরেই তৈরি হয়েছিল প্রথম ভারতীয় রাজনৈতিক তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে প্রচারমূলক সিনেমা। ১৯০৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। বঙ্গভঙ্গের অপমানের বিরুদ্ধে উত্তাল জনসমুদ্র সেদিন কলকাতার টাউন হলকে পরিণত করেছিল জাগ্রত বাংলার স্পন্দিত হৃদয়ে। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে ক্যামেরা হাতে এগিয়ে এসেছিলেন হীরালাল সেন। তিনি কেবল একটি জনসভা ধারণ করেননি; বরং সময়কে বন্দি করেছিলেন চলমান আলোকচিত্রে। তাঁর নির্মিত তথ্যচিত্র ‘অ্যান্টি-পার্টিশন ডেমনস্ট্রেশন অ্যান্ড স্বদেশি মুভমেন্ট অ্যাট দ্য টাউন হল, কলকাতা অন ২২ সেপ্টেম্বর ১৯০৫’ দেশের প্রথম রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হিসাবে অমর হয়ে আছে।
স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অনেকে সিনেমা মাধ্যমটিকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। তার সবথেকে বড়ো প্রমাণ মেলে ১৯২২ সালে। সেই প্রথম ব্রিটিশ সরকার ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করল একটি নির্বাক চলচ্চিত্রকে—‘ভক্ত বিদুর’। ১৯২১ সালে নির্মিত এই নির্বাক চলচ্চিত্রটির পরিচালক কাঞ্জিভাই রাঠোর। কোহিনূর ফিল্ম কোম্পানির ব্যানারে তৈরি সিনেমাটিতে মহাভারতের বিদুর চরিত্রটিকে দেখানো হয়েছিল মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর আদলে। সমকালীন ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনাকেও প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছিল সেই সিনেমায়।
এরপর বহু চলচ্চিত্রে জাতীয়তাবোধ, স্বাধীনতার চেতনাকে তুলে ধরতে শুরু করেন তৎকালীন নির্মাতারা। যেমন ১৯৩০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ওরাথ (Wrath)। আর এস ডি চৌধুরী প্রযোজিত এই চলচ্চিত্রটিকেও নিষিদ্ধ করেছিল ব্রিটিশ সরকার। ১৯৩১ সালে ভি শান্তারাম পরিচালিত ‘স্বরাজ্য তোরণ’-এর উপরেও নেমে এসেছিল নিষেধাজ্ঞার খাঁড়া। মারাঠা সম্রাট শিবাজির কার্যকলাপ এবং স্বরাজের আদর্শ নিয়ে তৈরি সিনেমাটির নাম নিয়ে আপত্তি তোলে ব্রিটিশ সেন্সর বোর্ড। পরবর্তীতে ‘উদয়কাল’ নামে এটি মুক্তির অনুমতি পায়। এপ্রসঙ্গে কিংবদন্তি পরিচালক গুডাভল্লি রামব্রহ্মমের সিনেমা ‘রাইথু বিদ্দা’র (কৃষকের সন্তান) কথাও বলা দরকার। ১৯৩৯ সালে মুক্তিপাপ্ত এই তেলুগু চলচ্চিত্রটি এক যুগান্তকারী সামাজিক প্রতিবাদের দলিল হিসাবে আজও স্মরণীয়। নেল্লোর ও মাদ্রাজ সহ একাধিক অঞ্চলে ‘রাইথু বিদ্দা’-র প্রদর্শন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সেবছরই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমিতে নির্মিত হয় কে সুব্রহ্মণ্যম পরিচালিত তামিল সিনেমা ‘ত্যাগভূমি’। ১৯৪৪ সালে যুদ্ধকালীন কঠোর সেন্সরশিপের কারণে মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই) প্রেসিডেন্সিতে চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
সিনেমা নিয়েও গান্ধীর সঙ্গে মতপার্থক্য ছিল সুভাষচন্দ্র বসুর। সমাজে সিনেমার অবদানকে অস্বীকার করেননি নেতাজি। ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ক্রাফটের প্রতিষ্ঠাতা বীরেন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক। সিনেমা করতে নেমে বীরেন্দ্রনাথ প্রথমেই একটি চিত্রগৃহ তৈরি করলেন হাতিবাগানে, ‘চিত্রা’। সেটির আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করতে এসেছিলেন সুভাষচন্দ্র। ১৯৩০ সালের ২০ ডিসেম্বর চিত্রা সিনেমাহলের উদ্বোধনের দিন প্রদর্শিত হয়েছিল ‘শ্রীকান্ত’। সেদিন বীরেন্দ্রনাথ সরকারকে অনুরোধ করেছিলেন নেতাজি—বাঙালির জীবন ও সমাজব্যবস্থাকে মাথায় রেখে আধুনিক সিনেমা নির্মাণ করুন। পরে ১৯৩৯ সালের জুন মাসেও লাহোরে পাঞ্চালি পিকচার্স স্টুডিয়োরও উদ্বোধন করেন তিনি। শুধু সিনেমা নয়, রুপোলি পর্দার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যেও গভীর প্রভাব পড়েছিল জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের। শিশির ভাদুড়ী, প্রমথেশ বড়ুয়ারা জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সমর্থক ছিলেন। পৃথ্বীরাজ কাপুর, বলরাজ সাহনি, ভারতীয় চলচ্চিত্রের ‘ফার্স্ট লেডি’ নামে পরিচিত দেবিকা রানী, কে এল সায়গল ও অশোক কুমারের মতো জনপ্রিয় শিল্পীরাও নিজেদের চলচ্চিত্র ও গানের মাধ্যমে দেশপ্রেমের বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন মানুষের কাছে। বাংলা চলচ্চিত্রে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় মানেই অমলিন হাসি। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, এই কিংবদন্তি অভিনেতার জীবনের প্রথম পরিচয় ছিল একজন সাহসী দেশপ্রেমিক হিসেবে। ছাত্রজীবনেই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে। ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁর নামে হুলিয়া জারি করে। কলকাতায় এসে বিপ্লবী অনন্ত সিংহের সান্নিধ্য লাভ করেন ভানু। আর সেই অনন্ত সিংহ-ই পরে ‘শেষ পরিচয়’, ‘নতুন প্রভাত’, ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’-এর মতো ছবির প্রযোজনা করেছিলেন।
১৯৪৭ সাল ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মনোজ বসুর কাহিনি ‘ভুলি নাই’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র মুক্তি পায় সেবছর। তবে সাড়া ফেলে দিয়েছিল অ্যাসোসিয়েটেড পিকচার্সের ছবি, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাড়া জাগানো উপন্যাস অবলম্বনে ‘পথের দাবী’। এই ছবিতে সব্যসাচীর ভূমিকায় ছিলেন দেবী মুখার্জি, সুমিত্রার ভূমিকায় চন্দ্রাবতী দেবী এবং ভারতীর ভূমিকায় সুমিত্রা দেবী। স্বাধীনতা দিবসের ঠিক প্রাক্কালে, ১৪ আগস্ট মুক্তি পেয়েছিল এমপি প্রোডাকশনের ছবি ‘স্বপ্ন ও সাধনা’। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে তৈরি এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সন্ধ্যা রানি, পরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, নরেশ মিত্র, জহর গঙ্গোপাধ্যায় ও অজন্তা কর। উত্তরা সিনেমায় ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে হয়েছিল তার বিশেষ প্রদর্শনী। ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার খুশিতে কলকাতার অনেকগুলি প্রেক্ষাগৃহে বিনা টিকিটে সিনেমা দেখানোর কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। সর্বত্র ভেঙে পড়েছিল মানুষের ভিড়।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ইস্টার্ন ফিল্মস এক্সচেঞ্জ পরিবেশিত ১০০০ ফিটের খণ্ডছবি ‘শান্তিসাধনায় গান্ধীজী’ মুক্তিলাভ করে একাধিক চিত্রগৃহে। চিত্রগ্রহণ ও গ্রন্থনায় ছিলেন হারম্যান আরভিন। স্বাধীনতা ঘোষণার দিন অরোরা ফিল্মস কর্পোরেশনের ‘জয়তু নেতাজী’ নামে আরও একখানা খণ্ডছবি দেখানো হয় ‘স্বপ্ন ও সাধনা’র সঙ্গেই। এই সব সিনেমা ভারতীয়দের মনে এক গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তাতে সন্দেহ নেই।