


কীভাবে যাবেন: ট্রেনে জম্মু পৌঁছে সেখান থেকে শ্রীনগর হয়ে কার্গিল পৌঁছতে পারেন বাসে। অথবা বিমানে লাদাখের রাজধানী লে পৌঁছে সেখান থেকেও কার্গিল যেতে পারেন বাস বা গাড়িতে।
ভোরে ঘুম ভাঙতেই পর্দা সরিয়ে দেখি জানলার কাচে পুরু কুয়াশা জমেছে। সোয়েটার টুপি পরে বাইরে বেরতেই শিরশিরে হাওয়া জানান দিল হেমন্ত এসে গিয়েছে। এখন তো ঋতু মোট তিনটি। গ্রীষ্ম, বর্ষা আর শীত। হেমন্ত টের পেতে বইয়ের পাতা উল্টোতে হয়, যেখানে কবি তাঁর কাব্যে ঋতুরঙ্গ সাজিয়েছেন।
কিন্তু প্রকৃতির মাঝে হেমন্তের পরশ পেতেই আমরা পাড়ি দিয়েছিলাম লাদাখের প্রত্যন্ত জেলা কার্গিলে। ধূসর শীতল মরুঅঞ্চল লাদাখ। এর মাঝেই বিভিন্ন নদীর আঁকিবুঁকি বয়ে আনে সবুজের ইতিউতি আনাগোনা। আর এই নদী উপত্যকা ঘিরেই রয়েছে লাদাখি, বালতি প্রভৃতি উপজাতিদের বাস। কাশ্মীরে ‘হারুদ’ বা পাতাঝরার গল্প শুনতে যখন বেরলাম, আমাদের ভ্রমণসূচিতে একদিনের জন্য জায়গা করে নিল কার্গিল। কার্গিলের নাম শুনলেই মনের মধ্যে নেমে আসে ১৯৯৯ সালের ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ, অপারেশন বিজয়। বিক্রম বাত্রা, মনোজ পাণ্ডেদের আত্মবলিদানের গাথা আজও ছড়িয়ে রয়েছে কার্গিলের আকাশে বাতাসে। কার্গিলের ওয়ার মেমোরিয়ালে সেই যুদ্ধের প্রতিটা মুহূর্ত যখন বর্ণিত হয়, তখন গায়ে কাঁটা দেয়। কিন্তু কার্গিল শুধুই যুদ্ধের কথা বলে না, বোমা-বারুদের গন্ধ বয়ে আনে না। এখানে হেমন্ত এখনও আসে ফি বছর নিয়ম করে। বছরের এই একটা সময় অদ্ভুত মায়াবী হয়ে ওঠে এই ছোট্ট জেলাটি। আকাশের নীল রং আরও গাঢ় হয়। সূর্যের সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের উইলো গাছে।
ভারতের উত্তরের সীমান্তে, কার্গিল জেলার অন্তর্গত সুরু ভ্যালি যেন প্রকৃতির এক নিঃশব্দ কবিতা। লাদাখের রুক্ষ পাহাড়ি প্রান্তরের মাঝে এমন সবুজ, এমন প্রাণবন্ত সৌন্দর্য দেখে প্রথমে বিশ্বাসই হয় না। পাথুরে পর্বতের বুক চিরে বয়ে চলেছে নীলচে সুরু নদী, তার দু’ধারে ছোট ছোট গ্রাম, সানকু, পানিখার, রাংদুম যেন ছবির মতো সাজানো।
এই উপত্যকা তার অপার সৌন্দর্য, শান্ত পরিবেশ এবং অনাবিল সংস্কৃতির জন্য পর্যটকদের মন জয় করে নিয়েছে। যেখানে লাদাখের অধিকাংশ অঞ্চল শুষ্ক ও পাথুরে, সেখানে সুরু ভ্যালি এক ব্যতিক্রমী সবুজ অভয়ারণ্য। বরফঢাকা পর্বত, নদীর ধারে ছড়িয়ে থাকা গ্রাম, আর আকাশ ছোঁয়া নুন ও কুন শৃঙ্গ, সবমিলিয়ে এটি এক স্বপ্নময় গন্তব্য। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় তিন হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত সিন্ধুনদের অন্যতম উপনদী সুরু কাৰ্গিলকে লাদাখের জাঁসকার উপত্যকা থেকে আলাদা করেছে। সর্পিল কালো পিচের রাস্তার দু’পাশে উইলো বার্চ গাছের সারি যেন ঝাড়লণ্ঠনের মতো সেজে রয়েছে। ধূসর শীতল মরুভূমি বছরের এই সময়টায় সেজে ওঠে অ্যাপ্রিকটের লাল, কমলা, হলুদ রঙে। পাতাঝরার মরশুম শুরু হওয়ার আগে প্রকৃতি যেন শেষবারের মতো গায়ে জড়িয়ে নেয় তার প্রিয় হলদে শাড়িটি। সঙ্গে আকাশের নীল মেখে সুরু নদী চঞ্চলা ষোড়শীর মতো এগিয়ে চলে রাস্তার ধার ঘেঁষে। সম্প্রতি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের তকমা পাওয়া লাদাখের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত কার্গিল জেলার আশপাশে ছড়ানো রয়েছে বেশ কিছু জায়গা যা সহজেই একদিনে ঘুরে নেওয়া যায়। প্রকৃতি, ইতিহাসের হাতছানি, সংস্কৃতির আলিঙ্গন ইত্যাদি মিলিয়ে সুরু উপত্যকা যেন সব পেয়েছির আসর। দিগন্ত বিস্তৃত অপার্থিব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য একই ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ‘অন্যতম সুন্দর স্থান’ হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছে এই উপত্যকা।
কার্গিল থেকে শুরু করে পেন্সিলা পর্যন্ত বিস্তৃত এই উপত্যকায় মাত্র পঁচিশ হাজার মানুষের বাস। আবহাওয়া ভালো থাকলে এখান থেকে দেখতে পাওয়া যায় নুন-কুন শৃঙ্গশ্রেণি ও পারকাচিক হিমবাহ। কার্গিল থেকে প্রায় ৪৫ কিমি দূরে এই উপত্যকার একটি ছোট্ট গ্রাম মুলবেক। এখানে একটি সুউচ্চ পাহাড়ের ওপর খরোষ্ঠী শিলালিপি পরিবেষ্টিত প্রথম খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ষষ্ঠ খ্রিস্টপূর্বাব্দের এক মৈত্রেয় বুদ্ধের অবয়ব খোদাই করা আছে। প্রায় ৩০ ফুট উঁচু এই বুদ্ধমূর্তি কুষাণ সাম্রাজ্যের সময়ের ইতিহাস আজও বহন করে চলেছে। এই মৈত্রেয় বুদ্ধের মূর্তিটি স্থানীয় ভাষায় ‘চাম্বা’ নামে পরিচিত। মৈত্রেয় বুদ্ধ হল ভবিষ্যতের বুদ্ধ, ভক্তদের বিশ্বাস তিনি পৃথিবীতে আসবেন মানবজাতিকে মুক্তির পথ দেখাতে। এই মূর্তি তাই শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়, বরং এক গভীর আধ্যাত্মিক প্রতীক। এটি দ্রুকপা ও গেলুগপা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের দুটি প্রাচীন গোম্পা- সারদুং গোম্পা ও রগালদান-সে গোম্পা দ্বারা পরিবেষ্টিত। আজও এখানে ভক্তের সমাগম হয়। প্রকৃতির কোলে প্রকৃতির স্পর্শে জানিয়ে দিয়ে যায় তাদের প্রার্থনা। লাদাখের তৃতীয় বৃহত্তম এই বুদ্ধমূর্তিটি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র বলে গণ্য হয়। মুলবেকে পৌঁছনোর সময় দূর থেকে দেখা যায় মৈত্রেয় বুদ্ধের মুখ— শান্ত, স্থির, যেন অনন্তের দিকে তাকিয়ে। এই নৈঃশব্দ্য স্মরণ করিয়ে দেয় সময়ের অমরতা ও মানব জীবনের ক্ষণস্থায়ী প্রতিমূর্তি।
এরপর এখান থেকে আমরা চললাম প্ল্যাটুনাথ শিবমন্দিরে। ১৯৭১ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের সময় এই মন্দিরের চারপাশে প্রচুর সেনাবাহিনীর গুলি-বোমা পড়েছিল। তবে লোকমুখে শোনা যায় এই অলৌকিক মন্দির চত্বরে ও তার আশপাশে কোনও বোমাই নাকি ফাটেনি! শোনা যায় যে, চত্বরে পড়ে থাকা বোমাগুলি পরে যখন নদীতে ফেলে দেওয়া হয় তখন তা সশব্দে ফেটে যায়। বর্তমানে এই মন্দিরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।
এছাড়াও এখান থেকে যাওয়া যায় ভারতের শেষ গ্রামে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই গ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্গত ছিল। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর ভারতীয় সেনারা এই গ্রাম দখল করে নেয়। বহু বছর এই গ্রামটি জনবসতি শূন্য ছিল। এরপর ২০১৫ সালে ভারত সরকার এই গ্রামে এক জাদুঘর তৈরি করে। এখানে কান পাতলে এখনও শোনা যায় যুদ্ধের গল্প, পাওয়া যায় বোমা বারুদের গন্ধ।
এরই পাশেই মুন্সি আজিজ ভট জাদুঘর। সমাজ সংস্কারক মুন্সি আজিজ ভট প্রাচীন রেশম পথে অন্যতম ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর বাড়িতেই গড়ে ওঠা এই জাদুঘরে অত্যন্ত যত্নে পুরনো দিনের চিঠি, মুদ্রা সংরক্ষিত আছে।
কার্গিল তাই শুধু যুদ্ধ বিজয় নয়, এখানকার প্রকৃতিও ভিন্ন ধারার গল্প বলে পর্যটকদের।
মুন জানা
ছবি: তাপস রায়