Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

কীভাবে বাঁচবে হাতে বোনা পোশাক

হাতে বোনা কাপড় মানে মাটির গন্ধ, মাটির ছোঁয়া। ইদানীং হাতে বোনা অর্থাৎ হ্যান্ডলুম পোশাকের কদর বেড়েছে একথা যেমন ঠিক, তেমনই প্রদীপের তলার অন্ধকারের মতো বুননশিল্পীরা নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন।

কীভাবে বাঁচবে  হাতে বোনা পোশাক
  • ৩০ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

আগস্টেই ছিল জাতীয় হ্যান্ডলুম দিবস। বুননশিল্পীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বললেন জয়া জেটলি।

Advertisement

হাতে বোনা কাপড় মানে মাটির গন্ধ, মাটির ছোঁয়া। ইদানীং হাতে বোনা অর্থাৎ হ্যান্ডলুম পোশাকের কদর বেড়েছে একথা যেমন ঠিক, তেমনই প্রদীপের তলার অন্ধকারের মতো বুননশিল্পীরা নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন। তা নিয়েই কথা বলতে সম্প্রতি ন্যাশনাল হ্যান্ডলুম ডে উপলক্ষ্যে কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটি-তে এসেছিলেন বর্ষীয়ান টেক্সটাইল কিউরেটর জয়া জেটলি। ‘প্রযুক্তির যুগে হাতে বোনা পোশাকের ভবিষ্যৎ’ বিষয়ে বিশদে আলোচনা করলেন তিনি।
সৃষ্টিশীলতা থেকে শুরু করে পেশা টিকিয়ে রাখা— সবকিছুই আজ বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে। মানুষের স্বাভাবিক সত্তা, বুদ্ধিবৃত্তি কোথাও যেন আংশিক ধাক্কা খাচ্ছে কৃত্রিম মেধার (এআই) দাপটে। অন্য সব পেশার মতো তার ছায়া পড়েছে বুননশিল্পেও। সৃষ্টির সঙ্গে মনের আনন্দলাভের একটা ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। এইরকম একটা সময়ে দাঁড়িয়ে জয়া জেটলি বুঝিয়ে দিলেন কৃত্রিম মেধা কীভাবে এক পলকে কেড়ে নিতে পারে মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা।
কৃত্রিম মেধার দাস না হয়ে কীভাবে নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তি এবং সৃজনশীলতা বাঁচিয়ে রাখা যায়, সেকথা ফের মনে করিয়ে দিলেন তিনি। এই ভাবনাটি মনের মধ্যে সক্রিয় না থাকলে বুননশিল্প হোক বা অন্য কোনও কাজ, নিস্তার নেই কারও। 
বেনারসের ঘাট নিয়ে তৈরি একটি অপূর্ব সূচিশিল্প (আর্ট ইনস্টলেশন) এখন শোভা পাচ্ছে দিল্লির নতুন পার্লামেন্ট ভবনের গ্যালারিতে। কথা বলতে বলতে সেই ছবিটি দেখালেন জয়া। বিভিন্ন বুননশৈলীর মাধ্যমে গড়ে ওঠা ওই সৃষ্টির নাম ‘যাত্রা’। তিনি জানালেন, ৯২ ইঞ্চি লম্বা এই ছবিতে বেনারসের ঘাটের প্রকৃত চিত্র থেকে পুরো আবহই শিল্পীরা হাতের বুননে ফুটিয়ে তুলেছেন। রয়েছে সিল্ক, রুপো এবং সোনালি জরি। ছবিতে দেখানো প্রতিটি বাড়িতে আছে পৃথক পৃথক বুননের কাজ। জয়ার দাবি, এমন শিল্পকর্ম ভারতে আগে কখনও তৈরি হয়নি। রাতের আকাশ, নদী, নৌকা, ঘাট, বাড়িঘর, মন্দির, ছাতা সবই রেশমি সুতো বা জরিতে উঠে এসেছে আসলের মতো। একটি হেলে থাকা বাড়ি রয়েছে সূচিছবিতে, যা বাস্তবেও কিছুটা হেলে থাকা অবস্থায় রয়েছে। ঘাটগুলির প্রতিটি অংশের ছবি তুলে প্রথমে তার ড্রয়িং করা হয়। তারপর সেখান থেকে একটু একটু করে জ্যাকার্ড প্যাটার্নে এগিয়েছে বুনন। 
ছবির কথা বলতে বলতেই জয়া চলে গেলেন কারিগরদের প্রসঙ্গে। যন্ত্রচালিত এবং হস্তচালিত বুনন নিয়ে একটা বিরোধ আছে। বস্ত্রশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে যতটুকু প্রাযুক্তিক সাহায্য নেওয়া দরকার, সেটা সময়ের সঙ্গে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। যন্ত্র মানেই খারাপ, তা তো নয়। এই বুননে যে যন্ত্র ব্যবহার হয়, তাও অনেক সময়ই দেশীয় মানুষের হাতে তৈরি। কিন্তু এআই সবটাই গিলে ফেলার মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে, সতর্ক করলেন জয়া। আমাদের দেশে কাপড় বোনার সঙ্গে একটি পরিবার, একটি গোটা গ্রাম জড়িয়ে থাকে। তাঁরা কোনও ব্র্যান্ড হিসেবে কাজ করেন না। তাঁদের স্থানীয় পরিচয়টাই বড় হয়ে ওঠে। অর্থাৎ আমরা যেভাবে শাড়ি চিহ্নিত করি, অমুক রাজ্যের অমুক গ্রামের বুননে তৈরি শাড়ি। এখানে কেউ কারও নকশা নকল করে নেবে এই ভয়ে কাজ করেন না। এটা একটি সম্প্রদায়ের মিলিত কাজের মতো, সবাই একযোগে জান লড়িয়ে কাজে শামিল হন। গল্প করেন, গল্পের মধ্যেই চলে বুনন। এইভাবেই তৈরি হয় বুনন সংস্কৃতি। কারিগরের সংস্কৃতি। এখানে প্রতিযোগিতা নেই। প্রকৃতির জন্য ভালোবাসা আছে, প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে সহাবস্থান আছে। নিজেদের মতো করে তাই বুননকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইটা করে যেতে চান জয়ারা। 
ঘাস থেকে প্রক্রিয়াকরণ করে কীভাবে সুতো তৈরি করা হয়, সেই সুতো থেকে কীভাবে পোশাক তৈরি করেন শিল্পীরা, ব্যাখ্যা করছিলেন জয়া। এই প্রক্রিয়ায় যন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে ঠিকই, তা কাজের পদ্ধতিগত সুবিধার জন্যই। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে দেশীয় সংস্কৃতির উপর নির্ভর করে কীভাবে পোশাক বা শাড়ি বোনা হয়, জানাচ্ছিলেন তিনি। সেখানে বুননশিল্পীদের কষ্ট অনেক ক্ষেত্রেই অবর্ণনীয়। কম অর্থ, বুননের সময় ঘরে অপর্যাপ্ত আলো এইসব সমস্যার মধ্যেই মানিয়ে নিয়ে চলতে হয় তাঁদের। তবুও যন্ত্র তাঁদের উপরে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলা যায় না। তাঁরা সময়ের সঙ্গে যন্ত্রচালিত তাঁত বা বুনন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছেন, বিষয়টাকে আত্মীকরণ করার মাধ্যমে। কিন্তু আজ কম্পিউটারে বসে এআই-এর কাছে চাইলে একটা গোটা ডিজাইন আমরা পেয়ে যেতে পারি। এটা তো একরকম চাপিয়ে দেওয়া, বলছিলেন জয়া। এতে আমাদের দেশজ শিল্পীরা কীভাবে কাজ করবেন? কোথায় পাব আমরা সেসব দেশীয় নকশা? তার অনুকরণে এআই ঠিক কিছু বানিয়ে দেবে। কিন্তু সম্প্রদায় মিলে যে সৃষ্টি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঁচিয়ে রেখেছেন, তা এক নিমেষে হারিয়ে যেতে পারে। সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্পগুলোও খোয়া যাবে। এই সূত্রেই প্রকাশিত হয়েছে জয়ার লেখা বই ‘দ্য লিটল ইন্ডিয়ান গামছা বুক’।
পাওয়ার লুম আর হ্যান্ডলুমের দ্বন্দ্বে ব্যতিক্রমী দিকে আলো ফেললেন জয়া। তাঁর কথায়, ‘আমরা তথাকথিত ‘প্রগতিশীল পরিবেশ সচেতনরা’ গলা ফাটাচ্ছি পাওয়ার লুম মানেই খারাপ, কিন্তু এটা কি আমরা কখনও ভেবে দেখেছি যে কারিগর নিজে যদি মনে করেন হ্যান্ডলুমের পরিবর্তে কিংবা পাশাপাশি পাওয়ার লুমও রাখব, সেখানে আমাদের আপত্তির কিছু থাকে না। কারণ কারিগররা তাঁদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় বুঝেছেন, হ্যান্ডলুমের কদর বেশি থাকলেও তা বেশ দামি এবং সাধারণ ক্রেতা সবসময় খাঁটি শাড়ি বা পোশাক চাইছেন, এমনটা নয়। অন্যদিকে পাওয়ার লুমে কাজ করলে তাঁর ঘরে দুটো পয়সা বেশি আসে। যা তাঁকে তাঁর শিল্প বাঁচিয়ে রাখার রসদ জোগায়। জয়া বলছেন, বুননশিল্পীদের কাছে আর্জি, যে ক্রেতা সস্তা জিনিস খোঁজেন, তাকে পাওয়ার লুমে তৈরি পোশাক বেচুন, কিন্তু সেটা বলে দিন। এই সততা যেন থাকে। আর হ্যান্ডলুমে তৈরি পোশাক যেন মূল্য দিয়েই বেচতে পারেন। এতে ঐতিহ্য বাঁচবে। কারিগরও বাঁচবেন। 
অন্বেষা দত্ত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ