Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

সন্তানের রেজাল্ট খারাপ, কীভাবে সামলাবেন?

জীবনের নানা বাঁকে পরীক্ষা, পাশ ফেল। নিজেকে যাচাই করতে করতে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই রয়েছে আসল রোমাঞ্চ। তবে এই পাশ ফেলের দুনিয়ার সঙ্গে পরিচিতি ঘটে শৈশবেই।

সন্তানের রেজাল্ট খারাপ, কীভাবে সামলাবেন?
  • ২৮ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রেজাল্ট! নামেই যেন ভীতিভাব। সেই ভয় শৈশব থেকেই মোকাবিলা করতে হয়। ব্যর্থতা না চাইলেও তা আসেই। তখন অভিভাবকের দায়িত্ব কী? জানালেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ অমিতাভ মুখোপাধ্যায়।  

Advertisement

জীবনের নানা বাঁকে পরীক্ষা, পাশ ফেল। নিজেকে যাচাই করতে করতে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই রয়েছে আসল রোমাঞ্চ। তবে এই পাশ ফেলের দুনিয়ার সঙ্গে পরিচিতি ঘটে শৈশবেই। ইদানীং পাশ ফেল প্রথা ক্লাস এইট অবধি উঠে গেলেও মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক সহ উচ্চশিক্ষার নানা পরীক্ষাতেই পাশ ফেল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শুধু পাশ-ফেলই বা বলি কেন? পাশ করারও নানা স্তর আছে। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার ফলের উপর নির্ভর করে উচ্চশিক্ষার ধাপ। তাই অভিভাবক ও ছাত্র-ছাত্রী সকলের কাছেই এই ফলের গুরুত্ব অসীম। 
তবে পরীক্ষার সাফল্য যেমন শিক্ষার্থীকে উচ্ছ্বসিত করে তোলে, তেমনই ব্যর্থতা তাদের অবসাদের দিকে ঠেলে দেয়। তাই ব্যর্থতা সামলাতে শিখতে হবে। আর এই শিখনপদ্ধতি শুরু হবে বাবা-মায়ের হাত ধরেই। মনস্তত্ত্ববিদ ডাঃ অমিতাভ মুখোপাধ্যায়ে মনে করেন, ছাত্র-ছাত্রীর অবসাদ তৈরি হওয়ার নেপথ্যে অনেকটাই বাবা-মায়ের হাত থাকে। সামাজিক সম্মান, পাড়া-প্রতিবেশীর কৌতূহল, আত্মীয়দের ব্যঙ্গোক্তি সর্বোপরি নিজের সন্তানকে সকলের সামনে ‘পড়াশোনায় ভালো’ প্রমাণ করার চক্রব্যূহে ঘুরপাক খেতে খেতে তাঁরা সন্তানের উপর চাপ দিয়ে ফেলেন। তারই ফলস্বরূপ শিক্ষার্থীদের মনে তৈরি হচ্ছে ইগো, ভয়, ব্যর্থতা। নিজে না শিখতে পারার চিন্তার চেয়েও তাদের কাছে বড়ো হয়ে উঠছে ‘বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারলাম না’ এই লজ্জা! 
অমিতাভবাবুর মতে, ‘পরীক্ষার ফলের চেয়ে যে জীবন অনেক বড়ো, সেই বোধ তৈরি করতে হবে শিশুকাল থেকেই। শুধু পরীক্ষা নয়, জীবনের নানা বাঁকে আসতে পারে ব্যর্থতা। তাকে সামলানোর জন্য অভিভাবকদেরও মানসিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তবেই তাঁরা সন্তানদের মধ্যে সেই মূল্যবোধ ও জীবনবোধ তৈরি করতে পারবেন।

 সন্তান ব্যর্থ, আপনি কী করবেন?
ব্যর্থতা মেনে নিন। এ কথা বলা যতটা সহজ, কাজে করে দেখানো ততটা সহজ নয়। অমিতাভর কথায়, সন্তান অনেকটাই বাবা-মায়ের চওয়া-পাওয়া ও ইচ্ছা-অনিচ্ছা দ্বারা চালিত হয়। তাই বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছলেও তার মনে কাজ করে, এই রেজাল্ট দেখে বাড়িতে মারবে বা বকবে, বাবা-মা মুখ দেখাতে পারবে না, এমন কিছু প্রচলিত ধারণা। ব্যর্থতা সকলের আগে মেনে নিতে হবে বাবা-মাকে। তবেই তাঁরা তাকে সামলাতে পারবেন। হয়তো সন্তান ফাঁকি দিয়েছে, হয়তো নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী খাটেনি। ফলে রাগ হবে। তবু উলটোদিকে দাঁড়ানো সন্তানের মানসিক অবস্থা ভেবে সেই রাগ রূপান্তর করুন ‘মোটিভেশনে’। ভেঙে না পড়ে নতুন উদ্যমে তৈরি হওয়ার রসদ সন্তান আপনার কাছেই পাবে। অনেক খারাপ ছাত্রছাত্রী জীবনে সফল হয়েছেন, আবার অনেক ভালো শিক্ষার্থীও সেভাবে কিছুই করতে পারেননি। কাজেই কেরিয়ার কার কোন পথে কোন দক্ষতার দ্বারা চালিত হবে একথা একটি রেজাল্ট ঠিক করে দেয় না। 

 কিছু বিষয় খেয়াল রাখুন
 কখনো অন্য কোনো পড়ুয়ার সঙ্গে তুলনা করবেন না। পাশের বাড়ির ছেলে, নিকটাত্মীয়র সন্তান কে কী করল সেসব টেনে এনে কথা শোনানোর মতো ভুল হয় না। কোনো পরীক্ষার রেজাল্টই জীবনের পথ তৈরি করে না। যাতে ভালো হয়, সেই দিকে খেয়াল রাখুন। প্রয়োজনে সমস্যার জায়গাগুলো নিয়ে ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন সন্তানের সঙ্গে।
 নিজে বুঝুন, রেজাল্ট মানেই কেরিয়ার নয়। তবে উচ্চশিক্ষার জন্য রেজাল্টের দাম আছে। এটুকু সন্তানকেও বোঝান। 
 পরীক্ষায় খারাপ ফল হওয়ায় সন্তান কান্নাকাটি করতে পারে। সে যদি কেঁদে হালকা হতে পারে, তবে তাকে কাঁদতে দিন। তবে খেয়াল রাখুন, আবেগের বশে হঠকারী সিদ্ধান্ত যেন না নেয়। তাই কান্নাকাটির বাড়াবাড়ি দেখলে বা একা একটা ঘরে ছেড়ে দিতে বললেও খেয়াল রাখুন তার দিকে। কোনো কথা না বলে তার পাশে গিয়ে বসে থাকুন। হাত ছুঁয়ে থাকুন। এই সময় সন্তান বাবা-মায়ের স্পর্শ সবচেয়ে বেশি চায়। কী কী ভুল করেছিল, ফাঁকি কেন দিল এসব প্রসঙ্গ তখনই তুলবেন না। প্রাথমিক ধাক্কা কাটার পর এসব বলবেন। 
 ব্যর্থতা একটা শিক্ষা। কেন রেজাল্ট খারাপ হল সেই ভুল যদি একসঙ্গে বসে বুঝতে পারেন, তাহলে পরেরবার সেই ভুল এড়িয়ে চলুন।
 সন্তানকে শিক্ষা দিতে গিয়ে একা করে দেবেন না। ওকে বোঝান জীবনে সফল হোক বা ব্যর্থ— প্রতি মুহূর্তে আপনি ওর পাশেই আছেন। ইতিবাচক কথা বলে তাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তুলুন।
 ওর মন ভালো করতে ওর পছন্দের কিছু রান্না করুন, কোথাও বেড়াতে নিয়ে যান। একসঙ্গে বসে মন ভালো করা বা মোটিভেশনাল সিনেমাও দেখতে পারেন। এতে সন্তান বুঝবে তার মা-বাবাই সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ও বিপদে পাশে থাকার মানুষ। ফলে তার পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়বে। নিজের প্রতিও সে দায়িত্বশীল হবে। পরের বার আরও বেশি সিরিয়াস হবে পড়াশোনায়।
 শিশুরা খুব ছোটো থেকে স্কুলে যায়। প্রতিযোগিতা তাদের জীবনে ঢুকে যায় শৈশব থেকেই। তাই তার মন ভালো রাখার দায় অভিভাবকেরই। সকলেই একশোয় একশো পাবে না, সকলে প্রথম হবে না। কেউ কেউ ৫০-৬০ বা তার কমও পাবে। এই সহজ সত্য অভিভাবকরা মেনে নিলে তবেই ওদের সামলানো সহজ হবে।
 নিজে জীবনে যা করতে পারেননি, সেই স্বপ্নের বোঝা নিজের সন্তানের উপর চাপাবেন না। তাকে তার উৎসাহ ও আগ্রহের কাজ করতে দিন। পড়াশোনা ছাড়াও অন্য অনেক গুণ দিয়েই কেরিয়ার হয়, প্রয়োজনে সেসবে যত্নবান হন।
মনীষা মুখোপাধ্যায়

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ