নয়া জালিয়াতি? রক্ষার উপায় জানালেন সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞ সাম্যজিৎ মুখোপাধ্যায়।
নয়া জালিয়াতি? রক্ষার উপায় জানালেন সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞ সাম্যজিৎ মুখোপাধ্যায়।
গত বছরের শেষ দিক। দার্জিলিং বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন কলকাতার এক তরুণ দম্পতি। ইন্টারনেটে আকর্ষণীয় অফার দেখে তাঁরা একটি হোটেলও বুক করেন। ওয়েবসাইটে সুন্দর ছবি, বিরাট ছাড়, খাবারদাবারের সুবিধা— সব মিলিয়ে সস্তায় পুষ্টিকর। বুকিং নিশ্চিত করতে অগ্রিম টাকাও পাঠিয়ে দেন। কিন্তু দার্জিলিং পৌঁছে আঁচ পেলেন আসল বিপদের। ওই নামে কোনো হোটেলের অস্তিত্বই নেই! ওয়েবসাইটটিও আর খুঁজে পাওয়া গেল না। কয়েক হাজার টাকার ক্ষতির সঙ্গে ভ্রমণের আনন্দ মাটি।
বাঙালি মানেই পায়ের তলায় সরষে। ভ্রমণপিপাসুদের মুশকিল আসান করেছে অনলাইনে হোটেল বুকিং। তবে প্রযুক্তির সুবিধা যত বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে প্রতারণার ঝুঁকিও। নানা কৌশল ব্যবহার করে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করছে প্রতারকরা। তারপর হাতিয়ে নিচ্ছে কষ্টার্জিত টাকা। তা থেকে বাঁচতে অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কীভাবে হয় প্রতারণা?
• প্রতারকরা জনপ্রিয় বুকিং প্ল্যাটফর্মের মতো দেখতে ভুয়ো ওয়েবসাইট তৈরি করে। সেখানে আসল হোটেলের ছবি ও তথ্য ব্যবহার করা হয়। সাধারণ ব্যবহারকারীরা সহজেই বিশ্বাস করেন সেটি। এই ওয়েবসাইট দেখতে এতটাই নিখুঁত হয় যে আসল-নকলের ফারাক বোঝা যায় না।
• সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ ছাড়ের অফার দেওয়া হয়। ‘আজই বুক করলে ৫০ শতাংশ ছাড়’, এই ধরনের অফারের ফাঁদে পড়ে বহু মানুষ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।
• ভুয়ো কাস্টমার কেয়ার নম্বরের ফাঁদেও পড়েন অনেকে। গুগলে কোনো হোটেলের নম্বর খুঁজতে গেলে অনেক সময়ই ভুয়ো নম্বর সামনে আসে। সাধারণত যে নম্বর প্রথমে আসবে, সেটাতেই বিশ্বাস করেন মানুষ। ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রেও এমন হয়। ওই নম্বরে ফোন করলে তারা নিজেদের হোটেল বা বুকিং এজেন্ট পরিচয় দিয়ে টাকা চায়।
• কখনো কখনো প্রতারকরা ভুয়ো বুকিং কনফার্মেশনও পাঠায়। সেখানে লিংক থাকে। ব্যবহারকারী সেই লিংকে ক্লিক করলেই একটি নকল পেমেন্ট পেজ খুলে যায়।
ভুয়ো ওয়েবসাইট চিনবেন কীভাবে?
ভুয়ো ওয়েবসাইট চেনা কষ্টসাধ্য। তা সত্ত্বেও সতর্ক থাকা জরুরি। ওয়েবসাইটের ইউআরএল (ঠিকানা) ভালো করে দেখে নেবেন। অনেক সময় প্রতারকরা আসল সাইটের মতো দেখতে ডোমেইন ব্যবহার করে। কিন্তু বানানোর সময় সামান্য পরিবর্তন করতে হয় ইউআরএল। একটি অক্ষর যোগ করা হয় বা বদল করা হয়। এগুলির দিকে খেয়াল রাখলে প্রতারণা এড়ানো সম্ভব হয়। এছাড়াও ওয়েবসাইটে যোগাযোগের ঠিকানা, রিভিউ ও নিরাপত্তা চিহ্ন (https) রয়েছে কি না, দেখে নেবেন।
সচেতনতার অ-আ-ক-খ
• নতুন বা অচেনা ওয়েবসাইটে বড়ো অঙ্কের অগ্রিম টাকা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে অনেক হোটেল বুকিংয়ের অফার দেখা যায়। যে হোটেল বুক করছেন, সেটির নাম লিখে আলাদাভাবে সার্চ করে রিভিউ পড়ে নিন।
• বর্তমানে অফবিট জায়গার চাহিদা বেড়েছে। অচেনা জায়গার বুকিং করার আগে ভালো করে জায়গাটি সম্পর্কে জেনে নেবেন।
• সাধারণ ভাড়ার তুলনায় অস্বাভাবিক কম দাম দেখালে সন্দেহ হওয়া উচিত। সেটা যাচাই করতে ভুলবেন না।
• বর্তমানে ভুয়ো রিভিউও লেখা যায় ওয়েবসাইটে। তাই একটি ওয়েবসাইটের উপরেই ভরসা না করে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে রিভিউ পড়ুন।
• হোটেল বুকিংয়ের জন্য জনপ্রিয় ও বিশ্বস্ত অ্যাপ ব্যবহার করাই ভালো।
• একান্তই ওয়েবসাইট থেকে করতে হলে সংস্থার অফিশিয়াল ওয়েবসাইট দেখে নেবেন। অচেনা ওয়েবসাইট থেকে কখনোই হোটেল বুকিং করবেন না। তাতে কিছু টাকা বেশি লাগতে পারে, কিন্তু সেটি অনেক বেশি নিরাপদ।
• হোটেল বুকিংয়ের আগে ভালো করে সমস্ত শর্ত পড়ে নেবেন। প্রয়োজনে অফিশিয়াল নম্বরে ফোন করে কথা বলে নিন।
• ওয়েবসাইটে দেখানো ছবি দেখেই হোটেল বুক করে নেবেন না। আগে ঘুরে এসেছেন, এমন কারও রিভিউ, ছবি দেখে যাচাই করে নেবেন।
নিরাপদে পেমেন্ট
পেমেন্ট করার সময়ও সতর্ক থাকা গুরুত্বপূর্ণ। বাড়তি ছাড়ের আশায় তাড়াহুড়ো করবেন না। পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ। ইউপিআই ব্যবহার করুন। সরাসরি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর পরিবর্তে অফিশিয়াল পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করুন। বুকিংয়ের আগে হোটেলের অফিশিয়াল নম্বরে ফোন করে বুকিং নিশ্চিত করে নিন। সম্ভব হলে ‘পে অ্যাট হোটেল’ বা ‘রিফান্ডেবল বুকিং’-এর মতো অপশন বেছে নিন।
প্রতারণার শিকার হলে?
সমস্ত সতর্কতা নেওয়ার পরেও যদি কেউ প্রতারণার শিকার হন, তাহলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রথমেই ১৯৩০ নম্বরে ফোন করুন। এবং অভিযোগ জানান এই নম্বরেই। এছাড়াও ভারত সরকারের জাতীয় সাইবার অপরাধ পোর্টাল www.cybercrime.gov.in –এর মাধ্যমে অনলাইনে অভিযোগ জমা দিতে পারেন। স্থানীয় থানাতেও অভিযোগ জানিয়ে রাখবেন। অভিযোগ করার সময় লেনদেনের রশিদ, স্ক্রিনশট ও সংশ্লিষ্ট সমস্ত তথ্য নিজের কাছে রাখবেন। প্রয়োজনে সবই কাজে লাগতে পারে।
শান্তনু দত্ত