কতটা পরিবর্তন এসেছে এই আইনে? জানালেন বিশিষ্ট আইনজীবী অনির্বাণ গুহ ঠাকুরতা।
কতটা পরিবর্তন এসেছে এই আইনে? জানালেন বিশিষ্ট আইনজীবী অনির্বাণ গুহ ঠাকুরতা।
১৯৯৩, জুন
বিজয়গড় কলোনিতে চাপা উত্তেজনা। বাড়ির পুরুষের হাতে স্ত্রীর মার খাওয়া তখন ওখানে নিত্য দিনের ঘটনা। কিন্তু সেদিনের ঘটনাটা ঠিক ওরকম নয়। কলোনি পেরিয়ে বড়ো রাস্তার মোড়ে যেখানে তুলনামূলক বিত্তবানদের বাস, খবরটা সেখানকার। সেটাই হাওয়া-বাতাসে ছড়িয়েছে কলোনি অবধি। সেখানকার সরকারি অফিসারের মেয়ে তনুজার (নাম পরিবর্তিত) বিয়ে হয়েছিল মাস তিনেক আগে। শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচারিত হয়ে সেই মেয়েই ফিরে এসেছে নিজের বাড়ি। অতিরিক্ত যৌতুকের জন্য চাপ যেমন ছিল, তেমনই মেয়ের চাকরি করা থেকে নানা শখপালন সবেতেই শ্বশুরবাড়ির আপত্তি ছিল। আপত্তি শুধু কথায় আটকে থাকেনি। নির্যাতন চলত অবাধে। গায়ে সিগারেটের ছ্যাঁকা থেকে যখনতখন মারধর ছিল জলভাত। ‘বড়োলোকের বাড়ি’-তেও এসব হয় শুনে বিজয়গড়ের কলোনির বাতাস আজ বেশ ভারী। মেয়েটি ফিরে এসে ৪৯৮ ধারায় মামলা করেছে শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে। আশার কথা পুলিশ মামলা পেয়েই গ্রেপ্তার করেছে শ্বশুরবাড়ির সকলকে।
২০২৪, সেপ্টেম্বর
বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়িতে ভালো লাগে না সুমেধার। সবাই মিলে একান্নবর্তী পরিবারে একসঙ্গে থাকা তার না পসন্দ। সৌগতদের যৌথ পরিবারের নানাবিধ খুঁটিনাটিতেই সে সমস্যা তৈরি করছে। বিয়ের আগের মতো নাইটলাইফ, পার্টি, বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এলেই নিজের মতো করে ঘুরতে বেরিয়ে যাওয়া এসবই তার পছন্দ। তার উপর সহকর্মী সুমনের সঙ্গে তার অবাধ মেলামেশা। ওরা একসঙ্গে বেড়াতেও যায়। থাকতে হলে বরকে সবটা মেনে নিয়েই থাকতে হবে। এই ছিল সুমেধার দাবি। তার উপর বরের রোজগারের মাত্রা না বুঝেই অবাধে খরচ ও কিছু জোগাতে দেরি হলেই বরের সঙ্গে নিত্য অশান্তি। মাসখানেকেই নতুন বিয়ে বিষিয়ে উঠেছিল। সৌগত অনেক চেষ্টা করেছিল আলাদা থেকেও যদি স্ত্রীর মন পাওয়া যায়। যায়নি। একদিন ৪৯৮এ ধারা (বর্তমানে ভারতীয় ন্যায়সংহিতার ৮৫ ও ৮৬ নম্বর ধারায়) মামলা ঠুকল সুমেধা শ্বশুরবাড়ির সকলের নামে ভুয়ো অভিযোগ তুলে। স্রেফ নাকাল করবে বলেই। এই ধারায় মামলা ঠুকে ডিভোর্স চাইবে সুমেধা। খোরপোষের টাকা হাতে এলেই ও আর সুমন ঘর বাঁধবে। কিন্তু কী আশ্চর্য! এবার আর সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেপ্তার হল না কেউই! কিন্তু কেন? শুধুই ভুয়ো অভিযোগ বলে? কিন্তু পুলিশ কী করে জানল এটা ভুয়ো? একটা সময়ে তো অভিযোগ পেলেই গ্রেপ্তার করাই ছিল রীতি। এই কেন-র উত্তর দিলেন আলিপুর কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী অনির্বাণ গুহ ঠাকুরতা।
৪৯৮ -এ বদল কবে থেকে?
তখনও ভারতীয় ন্যায় সংহিতা আসেনি। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ ধারার অধীনেই বধূ নির্যাতনের অভিযোগ করতে হত। বাড়ির বউয়ের প্রতি নিষ্ঠুরতার ঘটনা ঘটলেই সেই অভিযোগ পাওয়া মাত্রই তড়িঘড়ি কোনো তদন্ত না করে এককথায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করাই ছিল রীতি। ‘নিষ্ঠুরতা’ অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে করা এমন কোনো আচরণ যা নারীকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করতে পারে অথবা গুরুতর কোনো আঘাত যা তাঁর জীবন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা স্বাস্থ্যের বিপদ ডেকে আনতে পারে। এর মধ্যে হয়রানিও পড়ে। স্ত্রী বা তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ব্যক্তিকে কোনো সম্পত্তি বা কোনো বেআইনি দাবি পূরণে বাধ্য করা হলে বা চাপ দেওয়া হলে অপরাধীরা এই ধারার অধীনে পড়বেন। অপরাধটি জামিন অযোগ্য।
বিয়ের পর মেয়েদের নিগ্রহের হাত থেকে রক্ষা করতেই এই আইন আনা হয়। তবে ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সি কে প্রসাদের বেঞ্চ একটি মামলায় রায় দেওয়ার সময় বদল আনেন এই আইনে। বেঞ্চ জানায়, মেয়েদের উপর শারীরিক অত্যাচার রুখতে ও পণপ্রথা প্রতিরোধে যে আইনকে ঢাল করা হয়েছিল, তাকেই হাতিয়ার করে ব্যবহার করছেন বহু মহিলা। এতে বিনা দোষে নাকাল হয় বহু পরিবার। এক শ্রেণির মহিলা এই আইনের অপব্যবহার করে নিজেদের রাগ, ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা থেকে। তাই জানানো হয়, মামলা দায়ের হলেই আর গ্রেপ্তার নয়। প্রথমেই গ্রেপ্তার, তার পরে বাকি কাজ— এই নিয়মে এতকাল এই আইন চললেও ২০১৪-য় এল বদল। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিল, অভিযোগ যা-ই থাক, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তদন্ত না করে এবার থেকে এই ধারায় প্রথমেই গ্রেপ্তার বা আটক করা যাবে না। বরং অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে অভিযুক্তকে তিনি কেন গ্রেপ্তার করছেন তার যুক্তি ও তথ্যপ্রমাণ পেশ করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেটরাও যেন যান্ত্রিকভাবে অভিযুক্তকে আটকে রাখার নির্দেশ না দেন। শুধু তা-ই নয়, বলে দেওয়া হল এই নতুন নিয়মের অন্যথা হলে আইনানুগ ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
বিচারপতির বেঞ্চ জানায়, অন্য কারও অভিযোগ শুনেই এক বা একাধিক লোককে গ্রেপ্তার, তার পরে বাকি কাজ— এটি ‘ঘৃণ্য’ নিয়ম। তাই তা বন্ধ হওয়া দরকার। সাত বছর বা তার কম কারাদণ্ড হতে পারে, এমন যে কোনো অপরাধের অভিযোগ পেলে পুলিশকে যথাযথ তদন্ত করে তবেই গ্রেপ্তার করতে হবে। প্রসঙ্গত, এমনই গোত্রের একটি অপরাধ বধূ নির্যাতন। ৪৯৮এ ধারায় এই অভিযোগ প্রমাণ হলে জামিন-অযোগ্য এবং পরোয়ানা ছাড়াই সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা যায়। এই শর্তে কোর্ট কোনো বদল আনেনি। বরং বেঞ্চের বক্তব্য, পরোয়ানা ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তারের প্রয়োজন আছে কি না, সেটি আগে পুলিশকে খতিয়ে দেখতে হবে। তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে হবে। প্রয়োজনে পাড়াপ্রতিবেশী চেনা মহল সর্বত্র খোঁজ করতে হবে।
বিচারপতিরা সেদিন সেই রায়ের পাতায় বলেছিলেন, ‘হেনস্তার সহজতম রাস্তাই হল স্বামী ও তাঁর আত্মীয়দের গ্রেপ্তার করিয়ে দেওয়া। অজস্র ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, স্বামীর শয্যাশায়ী দাদু-ঠাকুরমা, এমনকী দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা আত্মীয়দেরও এই অভিযোগে জুড়ে দেওয়া হয়েছে এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁরা গ্রেপ্তারও হয়েছেন।’
পরিসংখ্যান কী বলছে?
২০১৪ সালে এই আইনের নিয়ম বদলাতে গিয়ে ২০১২ সালের একটি তথ্য তুলে ধরা হয়। সেই তথ্য অনুসারে, ২০১২ সালে ৪৯৮এ ধারায় গ্রেপ্তার হয়েছেন মোট ১ লক্ষ ৯৭ হাজার ৭৬২ জন। সারা দেশে মোট গ্রেপ্তার হওয়া মানুষের মধ্যে ৬ শতাংশই এই ধারায় অভিযুক্ত। ভারতে চুরি ও হামলার পরেই রয়েছে পণের জন্য বধূ নির্যাতনে গ্রেপ্তারের সংখ্যা। অথচ বিচারের সময় দেখা গিয়েছে, ৯৩.৬ শতাংশ অভিযোগের ক্ষেত্রে চার্জশিট জমা পড়লেও, প্রকৃত দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন মাত্র ১৫ শতাংশ। শুধু হেনস্তা করতেই এই ধারা ব্যবহার করেছেন বহু বধূ। কিন্তু যাঁরা এই ধারার অধীনে গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁরা পরে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও সামাজিক সম্মান ও স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে। সেই ঘটনার ট্রমা থেকে বেরতে অনেকে আর বিয়েমুখো হননি। এমনকি, নিকটাত্মীয় বা পরিচিত কাউকে এই অপরাধে অযথা গ্রেপ্তার হতে দেখে বহু তরুণ প্রজন্ম ভয়ে বিয়ে
করতে চাইছে না। তাদের কাছে বিয়ে হয়ে উঠেছে ‘বাড়তি জটিলতা’। মানব-মানবীর চিরন্তন বিশ্বাসেও চিড় ধরেছে।
কী বলছে বর্তমানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা
এখন অবলুপ্ত হয়েছে ভারতীয় দণ্ডবিধি। তার পরিবর্তে এসেছে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা। তবে অপরাধীদের শাস্তিপ্রদান তাতে কমেনি একচুলও। বরং আইন আরও কড়া হয়েছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর মতে, গার্হস্থ্য হিংসাই ভারতীয় মহিলাদের সঙ্গে ঘটা অপরাধতালিকায় সবচেয়ে প্রথমে থাকবে। এই পরিস্থিতিতে ৪৯৮এ-র পরিবর্তে এসেছে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বিলের ৮৫ নম্বর ধারা। এই ধারায় কোনো মহিলার উপর তাঁর স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির সদস্য অত্যাচার করলে তা প্রমাণিত হলে তিন বছরের জেলের শাস্তি সুপারিশ করা হয়। সঙ্গে জরিমানাও আছে। তবে সংশোধনী বিল এনে এর সঙ্গে এখন ৮৬ নম্বর ধারাও যোগ করা হয়েছে। সেখানে শারীরিক নিগ্রহের পাশাপাশি মানসিক আঘাত ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিও দেখা হয়েছে। কোনো মহিলা যদি শ্বশুরবাড়ির কারও কাছ থেকে মানসিক আঘাত বা যন্ত্রণা পাওয়ার ফলে শারীরিক ভাবে নিজের উপর কোনও গুরুতর চোট আনেন বা আত্মহত্যা করেন তাকেও গার্হস্থ্য হিংসা বলেই গণ্য করা হবে। তাই মেয়েদের মন ও শরীর দু’টিই রক্ষা করার দায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার রয়েছে। তাই নারী ও পুরুষ উভয়কেই আইনি চোখে সাম্য দিতে এই আইনের রদবদল করা হয়েছে। সমীক্ষা অনুসারে তাতে আইনের অপপ্রয়োগের মাত্রাও অনেকটা কমেছে। কেসের সংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তিও পাচ্ছেন দ্রুত। আইনের চোখে একে ইতিবাচক বলেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
মনীষা মুখোপাধ্যায়