ক্ষেপা । রাম রাম সীতারাম, জয় জয় রাম সীতারাম তুমি মাত্র তাঁর রাসলীলাই দেখ্লে; তাঁর পূতনা, তৃণাবর্ত্ত, বৎসাসুর, বকাসুর, অঘাসুর প্রভৃতি বধ, ব্রহ্মমোহন, কালিয়াদমন, দাবানলপান, বরুনলোকে গমন, একহাতে সাত দিন গোবর্দ্ধনপর্ব্বত ধারণ রাম রাম এসব কিছু দেখ্লে না? এসব সাধারণ মানুষে পারে রাম রাম সীতারাম?
হরি । ও সব মিথ্যা।
ক্ষেপা । রাম রাম সীতারাম সত্য শুধু রাসলীলা—তাতেও তো ভগবত্তা কম ছিল না। সহস্র সহস্র মূর্ত্তি ধারণ ক’রে তিনি গোপীদের সঙ্গে নৃত্য ক’রেছিলেন রাম রাম সীতারাম। হরিবংশে বিষ্ণুপুরাণেও রাসলীলা আছে।
হরি । আচ্ছা, তুমিই বল—ভাগবতে এমন কি আছে যার দ্বারা মানুষ লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারে?
ক্ষেপা । রাম রাম সীতারাম তুমি লক্ষ্য কাকে বল?
হরি । সমস্ত সন্তগণ যা আশ্রয় ক’রে গেছেন সেই শব্দমার্গ। বল ভাগবতে তোমাদের ভগবান্কে কি ক’রে পাওয়া যায়? তোমাদের লক্ষ্য কি?
ক্ষেপা । রাম রাম সীতারাম, জয় জয় রাম সীতারাম ভক্তিপথে ভগবান্ ভাবময়, তাঁকে ভাবের দ্বারা ধর্তে হয়। ঋষিগণ সেই ভাব শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য, মধুর এই পাঁচপ্রকার ব’লেছেন। ভাগবতে শান্তভাবের ভক্ত সনক, সনন্দন, নারদাদি; দাস্যভক্ত মহাবীর, অম্বরীষ প্রভৃতি রাজগণ ও অন্যান্য অগণ্য ভক্ত; সখ্যভক্ত শ্রীদাম, সুদাম, দাম, বসুদাম, উদ্ধব, অর্জ্জুন প্রভৃতি এবং বাৎসল্যভক্ত নন্দ, যশোদা, দেবকী, বসুদেব, রোহিণী প্রভৃতি। মধুরভাবের ভক্ত ব্রজগোপীগণ রাম রাম সীতারাম, জয় জয় রাম সীতারাম। এঁরা স্ব স্ব ভাবের দ্বারা মহাভাব লাভ ক’রেছেন। গোপীরা অনুক্ষণ শ্যামের বাঁশী শুন্তেন। তুমি শ্যামের বাঁশীর ধ্বনিকেই শব্দমার্গ বল্ছো।
হরি । ভাব কি?
ক্ষেপা । রাম রাম সীতারাম, ভাব হ’ল সত্ত্বের বিকাশ রাম রাম। রজস্তমোগ্রস্ত দেহাত্মবাদী দেহ-সর্ব্বস্ব মানবগণ যখন কাম-ক্রোধাদির জ্বালায় ব্যাকুল হ’য়ে জগতের কোন বস্তুর দ্বারা সে জ্বালা নিবৃত্ত না কর্তে পেরে শ্রীভগবানের দিকে ছুটে গিয়ে মনের চঞ্চলতায়, মনের অবসাদে তাঁকে চিন্তা ক’র্তে পারে না, তখন সদ্গুরুগণ নাম-নামী অভিন্ন শ্রীনাম দান করেন। সেই নাম প্রথমে উচ্চ-কীর্ত্তন ক’র্তে ক’র্তে রজস্তম ক্ষয় হ’তে থাকে, তখন জপ ক’র্তে থাকেন, নাম কীর্ত্তন ও জপে সত্ত্বভাবের উদয় হয় রাম রাম সীতারাম, জয় জয় রাম সীতারাম।
হরি । সত্ত্বভাবের উদয়ের লক্ষণ কি?
ক্ষেপা । রাম রাম সীতারাম, জয় জয় রাম সীতারাম নামকীর্ত্তনে স্তম্ভ, স্বেদ, রোমাঞ্চ, স্বরভেদ, কম্প, অশ্রু, পুলক, বৈবর্ণ্য, প্রলয় প্রভৃতি সত্ত্বভাব উপস্থিত হ’য়ে যখন রজঃ-তমকে দূরীভূত ক’র্তে থাকেন, তখন ভক্ত শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য, মধুর আদি যে ভাব তাঁর প্রিয় সেই ভাব অবলম্বনে লীলাচিন্তা আরম্ভ করেন রাম রাম সীতারাম জয় জয় রাম সীতারাম। লীলাচিন্তার দ্বারা দেহাত্মবোধ একেবারে গলে যায়, ভগবানের দর্শনলাভ করেন, মন্ত্র ইষ্ট অঙ্গে লয় হ’য়ে যায়, মহাভাবের আবির্ভাব হয় রাম রাম সীতারাম, জয় জয় রাম সীতারাম।
হরি । ভাল, গোপীগণের রাসলীলার চিন্তায় কি হয়?
ক্ষেপা । রাম রাম সীতারাম, রাসলীলার ফলশ্রুতি কামব্যাধি দূর হয় রাম রাম।
বিক্রীড়িতং ব্রজবধূভিরিদঞ্চ বিষ্ণোঃ
শ্রদ্ধান্বিতোঽনুশৃণুয়াদথ বর্ণয়েদ্ যঃ।
ভক্তিং পরাং ভগবতি প্রতিলভ্য কামং
হৃদ্রোগমাশ্বপহিনোত্যচিরেণ ধীরঃ।
শ্রীভগবান্ বিষ্ণুর ব্রজবধূগণের সহিত এই রাসক্রীড়া শ্রদ্ধাসম্পন্ন হ’য়ে যিনি নিত্য শ্রবণ বা বর্ণন করেন, তিনি শ্রীভগবানে পরাভক্তি লাভ করত ধীর হয়ে সত্বর কাম পরিত্যাগ করেন, কামজয়ী হন।
শ্রীগুরুপ্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘শ্রীওঙ্কারনাথ-রচনাবলী’ (৭ম) থেকে