ইতিহাস বইতে ভাষা শহিদ হিসেবে শুধুই পুরুষদের নাম। মেয়েরা কি বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেননি? নাকি আলোচনায় মেয়েদের ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে?
লিখছেন অধ্যাপক সুখেন বিশ্বাস।
ইতিহাস বইতে ভাষা শহিদ হিসেবে শুধুই পুরুষদের নাম। মেয়েরা কি বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেননি? নাকি আলোচনায় মেয়েদের ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে?
লিখছেন অধ্যাপক সুখেন বিশ্বাস।
একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই মনে পড়ে সেই গান—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি...।’ আব্দুল গফফর চৌধুরীর কথায়, আলতাফ মাহমুদের সুরেও রয়েছে ভাইদের জয়গান। গানের কোথাও বোনের উল্লেখ নেই। ভাষা আন্দোলনে ছেলেরাই যেন রক্ত দিয়েছিলেন, তাঁদের রক্তেই রাঙা হয়ে উঠেছিল বাংলা ভাষা-জয়ের গান। তাই আগুনঝরা বক্তৃতায় বারবার উঠে আসে বরকত, রফিক, সালাম বা আব্দুল গফফর। অথচ তাঁদের সঙ্গেই ছিলেন রাহেনা, মাহবুবা খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু, মমতাজ বেগম, মোতিয়া চৌধুরী, সুফিয়া কামাল, সুফিয়া আহম্মেদ প্রমুখ।
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন আর স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপকার ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। ‘আত্মজীবনী’-র একটি অংশে তিনি লিখেছেন, ‘১১ মার্চ ভোরবেলা থেকে শত শত ছাত্রকর্মী ইডেন বিল্ডিং ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করলো। সকাল ৮-টায় পোস্ট অফিসের সামনে ছাত্রদের ওপর ভীষণভাবে লাঠিচার্জ করলে কয়েকজন ছাত্রী বাধা দিতে গিয়ে পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হন।’ এই জায়গায় ভাষা আন্দোলনে মেয়েদের (কয়েকজন ছাত্রী) উল্লেখ করলেও তাঁদের সক্রিয় ভূমিকার কথা আত্মজীবনীর অন্যান্য জায়গায় স্পষ্ট করেছেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের ‘দৈনিক ভোর’ কাগজে প্রকাশিত শরিফা বুলবুল-এর নিবন্ধগুলি পড়ে জানা যাচ্ছে, শুধু আন্দোলনকারীর ভূমিকায় ছিলেন না মেয়েরা, তাঁরা ছিলেন সংগঠকও।
শুধু বাংলাদেশই বা কেন, আমরা ভুলে যাই শিলচরের ভাষা আন্দোলনে দশ জন পুরুষের সঙ্গে যে নারী নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর কথাও। কিন্তু পৃথিবীর প্রথম মহিলা ভাষা শহিদ হিসেবে আজও বিখ্যাত হয়ে আছেন শিলচরের কমলা ভট্টাচার্য। মাতৃভাষার স্বীকৃতির দাবিতে বাংলাদেশের মতো প্রাণ দিয়েছিলেন শিলচরের ভাষা আন্দোলনকারীরাও। পাশাপাশি মানভূম বাংলা ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী ছিলেন লাবণ্যপ্রভা ঘোষ। এই আন্দোলনে তিনি মোট তিনবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
ইতিহাস বলছে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের করাচিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সুপারিশ করা হয়। পাকিস্তানি শাসক পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) সাধারণ মানুষের উপর উর্দু ভাষা চাপানোর চেষ্টা করলে বাংলা জুড়ে শুরু হয় আন্দোলন। ফলে ১৯৪৭-এর ১৭ নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে মর্যাদা দেওয়ার জন্যে দাবিপত্র পাঠানো হয়। তাতে বহু বাঙালির সঙ্গে সই করেছিলেন ‘জয়শ্রী’ পত্রিকার সম্পাদক লীলা রায় ও আনোয়ারা চৌধুরী। এর পরে পরেই সিলেটের মহিলা মুসলিম লিগের কর্মীরা এইরকমই দাবিপত্র পাঠিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। উল্লেখ্য ১৯৪৮-এর ১১ মার্চের সাধারণ ধর্মঘটের মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছনাদেরা বেগম। বাংলা ভাষার দাবিকে প্রতিষ্ঠা করতে ১৯৪৭ সালে অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘তমুদ্দিন মজলিস’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। ওই সময় কাসেমের স্ত্রী রাহেনা, বোন রহিমা এবং রাহেনার ভ্রাতৃবধূ রোকেয়া ভাষা আন্দোলনের জন্য কাজ করে গেছেন। ’৫২-এর ২৩ জানুয়ারি মাঝরাতে পাকিস্তান-পুলিশ দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকলে রাহেনা দীর্ঘক্ষণ ধরে পুলিশের সঙ্গে তর্কবিতর্ক চালিয়ে যান। এই সুযোগে কাসেমসহ অন্যরা দেওয়াল টপকে পালিয়ে যান।
১৯৫২ সালে সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদের প্রথম সম্মেলনে মওলানা ভাসানির সঙ্গে বক্তব্য রেখেছিলেন ইডেন কলেজের ছাত্রী মাহবুবা খাতুন। তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি স্বীকার করিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন হলে মেয়েরা তাঁদের রক্ত বিসর্জন দেবে।’ অবশেষে এল ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি। চারদিকে একই স্লোগান ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। সরকারের চাপানো ১৪৪ ধারা ভেঙে এগিয়ে যাওয়া মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন মেয়েরা। সুফিয়া ইব্রাহিম, রওশন আরা বাচ্চু, হালিমা খাতুন, নাদেরা বেগম, বেগম শামসুন্নাহ, ফিরোজা বেগম, সোফিয়া করিম, সারা তৈফুর প্রমুখ। ফলে ওইসব মেয়ের কপালে জুটেছিল পুলিশের লাঠি ও যৌন নির্যাতন।
একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাংলা জুড়ে প্রায় এক মাস আন্দোলন হয়েছিল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, নারায়ণগঞ্জের মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ও ছাত্রীদের জোরালো প্রতিবাদ। প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম সহ শিক্ষিকা ইলা বখশি ও এক ছাত্রী রাণুকে গ্রেফতার করা হয় জ্বালাময়ী ভাষণ দেওয়ার জন্য। অত্যাচার সহ্য করেও সেদিন কিন্তু পুলিশের দেওয়া মুচলেকায় সই করেননি মমতাজ। শেষপর্যন্ত স্বামী তাঁকে তালাক দিলেও আন্দোলন আঁকড়ে ছিলেন তিনি। স্কুলের আরেক ছাত্রী মোতিয়া চৌধুরী সেই সময় নিজের আঙুল কেটে সেই রক্ত দিয়ে ব্যানারে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ লিখেছিলেন। আর কবি সুফিয়া কামাল ঢাকাকেন্দ্রিক যত আন্দোলন হয়েছে, প্রত্যেকটিতে অংশগ্রহণ করেছেন। ভাষা আন্দোলনে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন অধ্যাপক সুফিয়া আহম্মদ, ড. সাফিয়া খাতুন, হামিদা রহমান প্রমুখ।
বঙ্গবন্ধু ‘আত্মজীবনী’-তে আরও লিখেছেন, ‘যে পাঁচদিন আমরা জেলে ছিলাম, সকাল ১০-টায় স্কুলের মেয়েরা (মুসলিম গার্লস স্কুল) ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করত, আর ৪-টায় শেষ করত। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা একটু ক্লান্তও হতো না। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘বন্দী ভাইদের মুক্তি চাই’, ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’—এমন নানা ধরনের স্লোগান দিতে থাকতো।’
রাজপথের মিছিলে স্কুল-কলেজের মেয়েরাই থাকতেন সামনের সারিতে। আন্দোলনকে চাঙ্গা করতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অর্থ সংগ্রহ ও পোস্টার লেখার কাজও তাঁরা করতেন।
পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে যেসব ছাত্র আহত হতেন, তাঁদের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সেই সময়ের ছাত্রীরা। পুলিশের তাড়া খাওয়া ছাত্রদের নিজেদের কাছে লুকিয়ে রাখতেও তাঁরা ছিলেন সিদ্ধহস্ত।
বাড়ি বাড়ি চাঁদা তোলার পাশাপাশি আন্দোলনের খরচ চালানোর জন্য অনেক গৃহিণী নিজেদের সর্বশেষ অলংকারও তুলে দিয়েছিলেন।
আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণে অনেক ছাত্রীই নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, অনেকে হারিয়েছিলেন সংসার, অনেকের শেষ পর্যন্ত ঠাঁই হয়েছিল কারাগারের নির্জন কুঠুরিতে।
মিছিল, প্রতিবাদ সভা, সাংগঠনিক কাজ ছাড়াও মেয়েরা আন্দোলনের খরচ তুলতে তহবিল গঠন করেছিলেন। চাঁদা সংগ্রহের পাশাপাশি পোস্টার তৈরি করে বিক্রি করেছেন। বক্তব্য রেখেছেন জনসভায়। মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে সহ্য করেছেন পুলিশি নির্যাতন। কারাবরণ, হুলিয়া সবই সহ্য করতে হয়েছে তাঁদের।
সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের প্রোক্টরেরই অনুমতি নিয়ে প্রোক্টরের সামনে পুরুষদের সঙ্গে কথা বলার নিয়ম ছিল।
গ্রামের মেয়েদের অবস্থা ছিল আরও সঙ্গিন। তাঁরা ছিলেন পর্দার আড়ালে থাকা বন্দি নারী।
অর্থাৎ মেয়েদের ধর্মীয় বাধার পাশাপাশি ছিল সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় বাধা। এই চতুর্বাধাকে অতিক্রম করে বাংলা ভাষার দাবিতে রাজপথে নেমে আন্দোলন করাটা মেয়েদের পক্ষে সহজ ছিল না।
কিন্তু ভাষা আন্দোলনের উপরে লেখা কোনও গান, কবিতা বা নাটকের কোথাও মেয়েদের জয়গান নেই।
কেন নেই? তার কারণ মেয়েদের মন বা শরীর সবসময়ই ‘অপর’ বা ‘পুরুষ’ দ্বারা চালিত। তাঁদের সমস্ত কর্মকাণ্ডেরই মূল্যায়ন হয় পুরুষের চোখ দিয়ে, পুরুষের ক্ষমতা দিয়ে, পুরুষের নির্দেশে।
বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর নিজের জায়গা পোক্ত করেছিলেন আশাপূর্ণা দেবী। মহাশ্বেতা দেবীও আশাপূর্ণার মতোই কঠিন সংগ্রাম শেষে নিজের জায়গা পোক্ত করেছেন।
বাংলায় লেখা প্রথম নারী-আত্মজীবনী সাহিত্যকর্মের মর্যাদা পেতে প্রায় একশো বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। তবেই না রাসসুন্দরী দেবীর নাম বাঙালি জেনেছে।
বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পুরুষ লিখেছে। পুরুষই নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ ফেব্রুয়ারি।