Bartaman Logo
২০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

মেয়ে-জামাইকে উপহার দিন উইকএন্ড ট্রিপ

জামাইষষ্ঠীতে কোলাঘাটে পরিবার নিয়ে উইকএন্ড ট্রিপের পরিকল্পনা করেছেন মধুরিমা সেন। রূপনারায়ণ নদীর ধারে ভ্রমণ ও ঐতিহ্যবাহী খাবার। বিস্তারিত পড়ুন।

মেয়ে-জামাইকে উপহার দিন উইকএন্ড ট্রিপ
  • ২০ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

জয়পুরের জঙ্গলে এক রাত

Advertisement

গাড়িটা পিচের রাস্তা ছেড়ে লাল মাটির পথ ধরতেই সোঁদা গন্ধ আর সবুজের সমারোহ যেন বসত বাঁধল মন-প্রাণ জুড়ে। এই জামাইষ্ঠীতে অনন্যা রায় তাঁর দুই কন্যা ও জামাতাদের নিয়ে চলেছেন ঘরের কাছেই বিষ্ণুপুর। প্রথম রাত কাটাবেন জয়পুরের জঙ্গলে। সকাল থেকে তোড়জোর করে জামাইষষ্ঠীর পঞ্চব্যঞ্জন রান্না ও খাওয়াদাওয়া পর্ব মিটিয়ে বেরিয়েছেন তাঁরা। ফলে জয়পুরের জঙ্গলে পৌঁছতে একটু বিকেলই হল। বনের ভিতর দিয়ে লালমাটির পথ চলে গিয়েছে সোজা। মাটির গন্ধ আর গাছের পাতার শিরশিরে শব্দ ছাড়া কোথাও কোনো আওয়াজ নেই। ভরপেট খাওয়ার পর চোখটা একটু লেগে এসেছিল দুই জামাইয়ের। ‘ও মা! হরিণ...!’ বলে প্রায় একই সঙ্গে চিৎকার করল অনন্যার দুই কন্যা। স্ত্রীদের গলা শুনে জামাতারাও তড়িঘড়ি তাকিয়ে দেখে বনের পথে গাছের আড়াল দিয়ে চলে যাচ্ছে দুটো হরিণ। মোবাইলের ক্যামেরা তাক করার আগেই গভীর অরণ্যে গা ঢাকা দিল তারা।
শাল, কুসুম, পলাশ নিম— কতই না গাছ জঙ্গল জুড়ে! একে অপরের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে তারা। আকাশের কাছে কে আগে পৌঁছতে পারে সেই প্রতিযোগিতায় যেন সকলেই পাল্লা দিচ্ছে একে অপরের সঙ্গে। ঘন জঙ্গলের ভিতর প্রবেশ করার জন্য রীতিমতো অনুমতি নিতে হয় সূর্যদেবের। গাছের পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে কখনো কিছুটা জায়গা মিললে দিনের আলো মাটি ছুঁতে পারে। বর্ষায় জঙ্গলের রূপ আরও মনোরম হয়ে ওঠে। বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধ আর সবুজ পাতায় মোড়া বনপথ তখন মনের আরাম আর প্রাণের শান্তি হয়ে ধরা দেয় পর্যটকদের কাছে। রাতে বন বাংলোর কেয়ারটেকার খাওয়ালেন দেশি মাংসের ঝোল সঙ্গে বিষ্ণুপুরের স্পেশাল পোস্ত বড়া।
পরের দিন সকালে তাঁরা রওনা দিলেন বিষ্ণুপুর। টাউনে ঢুকেই ব্রেকফাস্ট সেরে পোড়ামাটির মন্দির দেখতে গেলেন সদলবল। গরম হলেও বাংলার এমন মনোমুগ্ধকর ঐতিহ্য থেকে চোখ ফেরানো দায়। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে মল্লরাজা বীর হাম্বিরের তৈরি রাসমঞ্চ দিয়েই শুরু হল দর্শন। অপূর্ব কারুকাজ। টেরাকোটার সূক্ষ্ম কাজের জন্য বিখ্যাত আরও মন্দির রয়েছে এখানে। মৃন্ময়ী মন্দির, শ্যামরাই মন্দির, মদনমোহন মন্দির তারই কয়েকটি। দেখতে দেখতে দুপুর হল। মন্দির কমপ্লেক্সের পাশেই একটা রেস্তরাঁয় লাঞ্চ সেরে আবারও গাড়িতে উঠলেন সকলে। বাড়ি পৌঁছতে রাত হবে।

ঘরের কাছে কোলাঘাট

 ‘উফ মা, যুগ এগিয়ে গিয়েছে, মেয়েরা উন্নত হতে হতে আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছে আর তুমি এখনও জামাইষষ্ঠীতে কখন নেমন্তন্ন করবে সেই প্ল্যান নিয়ে পড়ে আছ! এযুগের স্বাধীন, স্বনির্ভর নারীর জীবনে জামাইষষ্ঠী কোনো ঘটনাই নয়।’ একমাত্র কন্যার এমন বাক্যবাণে খানিক থমকালেন মধুরিমা সেন। তাঁর জামাইষষ্ঠীর জম্পেশ আয়োজনে একটু যেন ভাটা পড়ল। বুঝে গেলেন, এবছর গতানুগতিক পথে জামাইষষ্ঠী পালন হবে না। গতিপথ বদল করতে হবে। ভাবতে ভাবতেই চোখ রাখলেন ক্যালেন্ডারে। সপ্তাহান্তে জামাইষষ্ঠী। শনির সঙ্গে রবিবারটাও জুড়ে নিয়ে বেড়িয়ে আসা যায় কাছেপিঠে। মেয়ে-জামাই দু’জনেই মহানন্দে সায় দিল প্রস্তাবে। ডেস্টিনেশন কোলাঘাট। রূপনারায়ণ নদীবক্ষে ভ্রমণ আর ইলিশ মাছ দিয়ে ভোজ। 
কলকাতা থেকে গাড়িতে মোটামুটি ঘণ্টা দুয়েক সময় লাগল কোলাঘাট পৌঁছতে। ব্রেকফাস্ট সেরে দশটা নাগাদ বেরলেন মধুরিমা সপরিবার। পথে একবার থামল গাড়ি। টি ব্রেক। তারপর সোজা গন্তব্যে। যেতে যেতেই হাইওয়ে ছাড়িয়ে বাঁক নিল রাস্তা। খানিক দূর সেই পথে এগতেই ডান হাতে চওড়া রূপনারায়ণের দেখা মিলল। চোখ জুড়িয়ে গেল সকলের। শান্ত স্নিগ্ধ স্রোতে বয়ে যাচ্ছে রূপনারায়ণ। গ্রীষ্মের দুপুরেও নদের জলে বয়ে আসছে হালকা শীতল বাতাস। খুব বেশিক্ষণ সেখানে অপেক্ষা না করে বরং খাওয়া সেরে নেওয়ার জন্য ভালো রেস্তরাঁর খোঁজ লাগালেন মধুরিমা। আর খোঁজামাত্রই সোনার বাংলা, শের-এ-পঞ্জাব সহ নানা রেস্তরাঁর নাম উঠে এল সার্চ ইঞ্জিনে। সর্বত্রই কম বেশি জামাইষষ্ঠীর মহাভোজের আয়োজন রয়েছে। ফলে চর্বচোষ্যর অভাব হল না। লাঞ্চ সেরে এবার তাঁরা বেরলেন কোলাঘাটের আশপাশ ঘুরে দেখতে। যে রূপনারায়ণের শোভায় মুগ্ধ হয়েছিলেন তাকেই আর একটু কাছ থেকে দেখার সাধ হল। তার জন্য রয়েছে ভিউ পয়েন্ট। নৌপালা ও রূপনারায়ণ এই দুই ভিউ পয়েন্ট থেকেই নদীর দারুণ শোভা উপভোগ করা যায়। সঙ্গে রয়েছে সাজানো পার্ক। নদীর ধারে বসে সূর্যাস্ত উপভোগ করতে চাইলে এই দুই ভিউ পয়েন্টের জুড়ি মেলা ভার। তবে মধুরিমারা একটু তাড়াতাড়ি পৌঁছে গিয়েছিলেন বলে প্রথমে নৌকো বিহারে বেরিয়ে পড়লেন। ছই-নৌকার গলুইয়ের সামনে বাবু হয়ে বসল জামাতা বাবাজীবন আর বাকিরাও এদিক ওদিক করে উঠে পড়লেন নৌকায়। মাঝির গান, নদীর জলের ছলাতছল শব্দ শুনতে শুনতেই কেটে গেল পঁয়তাল্লিশ মিনিটের জল সফর। নৌকা যখন পাড়ে এসে ভিড়ছে ঠিক তখনই আকাশ লাল করে অস্ত গেলেন সূর্যদেব। সূর্যাস্তের শেষটুকু উপভোগ করলেন তাঁরা পার্কে বসে। সন্ধে গাঢ় হলে হোটেলে ফিরলেন। পরের দিনের জন্যও ব্যস্ত শিডিউল ছকেই রেখেছিলেন মধুরিমা। ব্রেকফাস্টের পর আবারও ছুটল গাড়ি। মাত্রই ১৫ কিলোমিটার দূরে তমলুকের বিখ্যাত বর্গভীমা মন্দির। ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম তা। সেখানে পুজো দিয়ে আশপাশ ঘুরে দেখে বাড়ির পথ ধরলেন তাঁরা।

দার্জিলিংয়ের শীতল পরশ

 ভীষণ গরমে ওষ্ঠাগত প্রাণ। তাই ঋদ্ধি দত্ত মেয়ে জামাই নিয়ে জামাইষষ্ঠী উইকএন্ড কাটাতে পৌঁছে গিয়েছেন বাঙালির অতি প্রিয় দার্জিলিং। শুক্রবার রাতের ট্রেনে চড়ে শনিবার সকালেই পৌঁছে গিয়েছেন নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে দার্জিলিং। দুপুর দুপুর পৌঁছে হোটেলে চেক ইন করে প্রথমেই রেস্তরাঁর খোঁজ। জামাইষষ্ঠী লাঞ্চটা আগে সেরে ফেলতে হবে। তারপর বাকি সাইট সিয়িং, ম্যালে বসে দৃশ্য উপভোগ, কেনাকাটা ইত্যাদি। ঋদ্ধির জামাতাটি একটু ভিন্ন স্বাদের খাবার পছন্দ করেন। তাই ম্যাল রোড থেকে একটু দূরে রিভোলভার নামে একটি রেস্তরাঁ বেছেছেন ঋদ্ধি জামাইষষ্ঠীর মহাভোজের জন্য। এখানকার হোমস্টাইল নাগা খাবার বিখ্যাত। মোমো দিয়ে শুরু হয়েছে মহাভোজ, এরপর চিকেন, পর্ক সবই আসবে একে একে। শেষ পাতে মিষ্টির জন্য অবশ্য ম্যাল রোডই ভরসা। দুপুরের খাওয়া দাওয়ার সেরে তাঁরা হেঁটেই পৌঁছে গেলেন দার্জিলিংয়ের চিড়িয়াখানায়। নিরিবিলি পথ ধরে নেমে যেতে যেতে পাইনবনের মর্মর শব্দ উপভোগ করছিলেন সকলেই। চিড়িয়াখানায় গিয়ে সেই নৈঃশব্দ্যে চিড় ধরল। বাচ্চাদের উত্তেজিত চিৎকারে কান পাতা দায়। তারই মধ্যে হিমালিয়ান উলফ আর স্নো লেপার্ড দেখে তাঁরা গেলেন রেড পান্ডার খোঁজে। গাছের ডালে রেড পান্ডাগুলোকে প্রথম দেখায় ফুলের মতো লাগছিল। নিজেদের মধ্যে খেলাধুলোয়, খুনসুটিতে মগ্ন তারা। ঋদ্ধির জামাতার আবার ট্রেকিংয়ের শখ। তাই হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট ও মিউজিয়ামটাও একবার ঘুরে নিলেন তাঁরা। এদিকে কন্যাটি আবার শপিংয়ের জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল। আর হাঁটাহাঁটিও অনেক হয়েছে। তাই ম্যালের ধারে একটা রেস্তরাঁয় চা, কফি সহযোগে খানিক বিশ্রাম নিয়ে নিলেন সকলেই। ম্যালে বিকেলের পড়ন্ত রোদ এসে পড়েছে। রোদের তেজ ম্রিয়মান। তারই মধ্যে ম্যালের উপর মঞ্চে গান বাজনার আয়োজনে মত্ত একদল পাহাড়ি তরুণ। গিটার, সিন্থেসাইজার, ড্রাম ইত্যাদিতে সেজে উঠেছে মঞ্চ। ম্যালের উপর গয়না, চা, থাংকা, ব্যাগ, টুপি ইত্যাদির দোকানগুলোতেও আলো জ্বলে উঠছে। সব মিলিয়ে বেশ ঝলমল করে উঠল চারধার। পরের দিন সকালে আবার টাইগার হিল যাবেন ঋদ্ধিরা। ফলে প্রথম সন্ধ্যায় একটু তাড়াতা঩ড়িই ইতি টানলেন তাঁরা। 
ভোর চারটে নাগদ ড্রাইভার এসে হাজির। পাহাড়ি পথ বেয়ে টাইগার হিল পৌঁছতে মিনিট চল্লিশ সময় লাগল। সূর্যদেবের তখনও ভালো করে ঘুম ভাঙেনি। নরম আলোয় চারদিক ছেয়ে গিয়েছে। হালকা আলোয় মজে রয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। আকাশে একটু মেঘের আধিক্য ছিল বলে সানরাইজ তেমন জমিয়ে হল না। তবু যা দেখা গেল তাই বা কম কি। টাইগার হিল দেখে হোটেলে একটু ফ্রেশ হয়ে আবারও বেরিয়ে পড়েছেন তাঁরা। কেভেন্টারে ব্রেকফাস্ট সেরে টয় ট্রেন চড়তে যাবেন। তারপর লাস্ট মিনিট শপিং সেরে আবারও নেমে আসবেন এনজেপি, রাতের ট্রেন ধরে সোমবার ভোরে কলকাতা।    
কমলিনী চক্রবর্তী                               

 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ