ইতিহাস ও প্রাচীন কলকাতার স্মৃতিকে সঙ্গী করে শহরের অলিতে গলিতে আজও বেঁচে আছে বহু হোটেল। সেসব হোটেলে ‘শেফ’ নেই, তবে ‘রাঁধুনি’ আছেন। আর তাঁদের হাতে আছে জাদু! আদি কলকাতার গন্ধমাখা সেসব হোটেল নিয়েই শুরু হয়েছে এই নতুন বিভাগ। প্রতি মাসে খোঁজ দেব একটি করে পুরানো হোটেলের। আজ রইল স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল-এর কথা।
দেশ তখন উত্তাল। সাল ১৯১২। প্রেসিডেন্সি কলেজের পিছনে ৮/২ ভবানী দত্ত লেনে মনগোবিন্দ পন্ডা খুলে বসলেন ভাতের হোটেল। নাম ‘হিন্দু হোটেল’। কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের মতোই এখানে গরম ভাতের খোঁজে রোজ এসে জোটে বহু ভুখা ভারতবাসী। তলে তলে স্বদেশিদেরও জায়গা দিতেন মনগোবিন্দ। এদের মধ্যে একটি ছেলেকে বড়ো ভালোলাগে তাঁর। যেমন চেহারা, তেমন চোখ! সোনামুখ করে খায় মাছের মাথা দিয়ে রান্না করা পুঁইশাক, ডাল, মাছ, মাংস যেদিন যা হয়। তার নেতৃত্বেই এখানে জড়ো হয় ছোটোখাটো একটা বিপ্লবী দল। একদিন গোপনসূত্রে খবর পেয়ে মনগোবিন্দর হিন্দু হোটেলে এসে দাঁড়াল ইংরেজ পুলিশ। রাইফেল উঁচিয়ে ভিতরে ঢুকতে চাইল। দরজায় তাদের আটকে দিলেন মনগোবিন্দ। মাথায় রাইফেলের বাঁট খেয়েও অনড়। একসময় পিছু হটল ইংরেজ পুলিশ। পুলিশ ফিরে যেতেই মনগোবিন্দকে জড়িয়ে ধরল সেই উজ্জ্বল চোখের ছেলেটা। নাম তার সুভাষ বোস!
কাট টু ১৫ আগস্ট ১৯৪৭। স্বাধীন হল ভারত। মনগোবিন্দ জানালেন, এবার থেকে আর ‘হিন্দু হোটেল’ নয়, দোকানের নাম হবে ‘স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল’। এখনও ২৩ জানুয়ারি প্রথম ১০০ জন বিনামূল্যে খাবার পান এখানে। রোজ পাত পড়ে বহু লোকের। এখন সুচারুভাবে দায়িত্ব সামলান মনগোবিন্দর নাতি অরুণাংশু পন্ডা। স্বাধীনতার সকালে, সেই হোটেলের কুক ধনঞ্জয় মাইতি ভাগ করে নিলেন তাঁদের সেরা তিন পদ।
পারশে মাছের ঝাল
বাঙালির প্রিয় মাছের অন্যতম পারশে। বাজারে আজকাল দিশি পারশের দেখা মেলা ভার! তবে যেদিন মেলে, সেদিন আর গরম ভাতের সঙ্গে অন্য কিছু লাগে না।
উপকরণ: পারশে মাছ ৪-৫ টুকরো, সরষের তেল ৩–৪ টেবিল চামচ, কালোজিরে দেড় চা চামচ, কাঁচালংকা ৫-৬টি, ধনেপাতা এক মুঠো, নুন স্বাদমতো।
মশলা বাটার জন্য: হলুদ সরষে দেড় টেবিল চামচ, কালো সরষে দেড় টেবিল চামচ, কাঁচা হলুদ ১ ইঞ্চি, গোটা জিরে ১ চা চামচ, শুকনো লংকা বা কাঁচালংকা ২-৩টি, নুন দেড় চা চামচ।
প্রণালী: সরষে ও গোটা জিরে উষ্ণ জলে ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। এবার জল ঝরিয়ে ভেজানো সরষের সঙ্গে জিরে, কাঁচা হলুদ, লংকা, চা চামচ নুন ও ২-৩ টেবিল চামচ জল যোগ করে মিহি করে বেটে নিন। চাইলে বাটার পর ছাঁকনিতে ছেঁকে নিতে পারেন, এতে ঝোল আরও মসৃণ হবে। পারশে মাছ ভালো করে পরিষ্কার করে ধুয়ে জল ঝরিয়ে নিন। বাটা মশলা থেকে ১ টেবিল চামচ নিয়ে মাছের গায়ে সামান্য নুনের সঙ্গে মাখিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিন। কড়াইয়ে সরষের তেল দিয়ে গরম করুন। মাঝারি আঁচে পারশে মাছ দু’পিঠ দেড়-দু’মিনিট ধরে হালকা সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভেজে তুলে রাখুন। পারশে মাছ নরম হওয়ায় বেশি ভাজবেন না। এবার এই একই তেলে আঁচ কমিয়ে কালোজিরে ও ২টি চেরা কাঁচালংকা দিয়ে ফোড়ন দিন। এরপর বাকি সরষে-মশলার বাটা দিয়ে কাপ হালকা গরম জল ঢেলে দিন। স্বাদমতো নুন দিয়ে মাঝারি-কম আঁচে ফুটতে দিন। সরষের ঝোল বেশি কষাবেন না বা বেশি আঁচে রান্না করবেন না, এতে সরষে তেতো হয়ে যায়। ঝোল ফুটে উঠলে ভাজা পারশে মাছ আলতো করে দিয়ে ঢেকে কম আঁচে ৪-৫ মিনিট রান্না করুন। মাছ ঝোলের স্বাদ টেনে নিলে ঢাকনা খুলে প্রয়োজন বুঝে সামান্য গরম জল দিয়ে ঝোলের ঘনত্ব ঠিক করে নিন। চেরা কাঁচালংকা, কুচানো ধনেপাতা ও সামান্য কাঁচা সরষের তেল ছড়িয়ে আঁচ বন্ধ করে দিন। ঢেকে ৫ মিনিট রাখুন। তারপর গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন এই পদ। চাইলে এই রেসিপিতে আলু বা বেগুনের টুকরোও যোগ করতে পারেন।
সরষে পোস্ত পমফ্রেট
পমফ্রেট মাছসমাজে বড়োলোক। বেশ ওজন তার। মাঝারি এক একটা মাছেই ১০০-১২৫ গ্রাম হয়ে যেতে পারে। সামুদ্রিক মাছের তালিকায় এটি খুব জনপ্রিয়।
উপকরণ: পমফ্রেট মাছ ২টি মাঝারি, হলুদ বাটা ১ চা চামচ, কাশ্মীরি লংকা বাটা চা চামচ, নুন স্বাদ মতো, সরষের তেল ৪ টেবিল চামচ।
সরষে-পোস্ত বাটার জন্য: হলুদ সরষে দেড় টেবিল চামচ, কালো সরষে দেড় টেবিল চামচ, পোস্ত ২ টেবিল চামচ, কাঁচালংকা ৩-৪টি, নুন দেড় চা চামচ, উষ্ণ জল প্রয়োজনমতো। ঝোলের জন্য: কালোজিরে দেড় চা চামচ, চেরা কাঁচালংকা ৩-৪টি, হলুদ বাটা দেড় চা চামচ, উষ্ণ জল দেড় কাপ, নুন স্বাদমতো, কাঁচা সরষের তেল ১ চা চামচ।
প্রণালী: পমফ্রেট মাছ পরিষ্কার করে ধুয়ে ভালো করে জল ঝরিয়ে নিন। মাছের দু’পিঠে হালকা চিরে হলুদ, কাশ্মীরি লংকা বাটা, নুন ও সামান্য সরষের তেল মাখিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিন। সরষে ও পোস্ত উষ্ণ জলে ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। জল ঝরিয়ে নিয়ে সরষে-পোস্তর সঙ্গে ২টি কাঁচালংকা, চা চামচ নুন ও ২-৩ টেবিল চামচ জল মিশিয়ে মিহি করে বেটে নিন। সরষে বাটার সময় নুন দিলে তেতোভাব কমে। এবার কড়াইয়ে ৩ টেবিল চামচ সরষের তেল দিয়ে ভালো করে গরম করুন। তেল ধোঁয়া ওঠার মতো গরম হলে আঁচ কমিয়ে পমফ্রেট দিয়ে মাঝারি আঁচে দু’পিঠ দু’মিনিট ভেজে নিন। মাছ হালকা সোনালি হয়ে এলে তুলে রাখুন। একই কড়াইয়ে কালোজিরে ও চেরা কাঁচালংকা ফোড়ন দিন। আঁচ একেবারে কমিয়ে সরষে-পোস্ত বাটা ও হলুদ দিয়ে ১ মিনিট নাড়ুন। সরষের বাটা বেশি ভাজবেন না। এ বার উষ্ণ জল ও নুন দিয়ে মিশিয়ে নিন। গ্রেভি ফুটতে শুরু করলে ভাজা পমফ্রেট দিয়ে ঢাকা দিয়ে মাঝারি-কম আঁচে ৩–৪ মিনিট রান্না করুন। মাঝে এক বার মাছ উল্টে দিন। সবশেষে ১ চা চামচ কাঁচা সরষের তেল ছড়িয়ে বাকি চেরা কাঁচালংকা দিয়ে ঢেকে আঁচ বন্ধ করে রেখে দিন। গরম ভাতের সঙ্গে খেতে দিন সরষে পোস্ত পমফ্রেট।
চিকেন কষা: রুটি-পরোটার সঙ্গে কষা মাংসের খুব ভাব। পোলাওয়ের সঙ্গেও ভালো জমে। স্বাধীনতার দিন নৈশভোজে এমন মেনু রাখতেই পারেন।
উপকরণ: হাড়সহ চিকেন ৭৫০ গ্রাম, টক দই ৩ টেবিল চামচ, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, হলুদ বাটা দেড় চা চামচ, লংকা বাটা ১ টেবিল চামচ, সরষের তেল ৫ টেবিল চামচ, নুন ১ চা চামচ। ফোড়নের জন্য: তেজপাতা ২টি, ছোট এলাচ ৪টি, লবঙ্গ ৪-৫টি, দারচিনি ১ ইঞ্চি, শুকনো লংকা ২টি, চিনি দেড় চা চামচ। মশলা ও গ্রেভির জন্য: আলু ২টি বড়, পেঁয়াজ ৩টি বড়ো আকারের, টম্যাটো ১টি, জিরে বাটা ১ চা চামচ, ধনে বাটা ১ চা চামচ, কাঁচালংকা ৩-৪টি, গরমমশলা দেড় চা চামচ, ঘি ১ চা চামচ।
প্রণালী: চিকেন ভালো করে ধুয়ে জল ঝরিয়ে নিন। এর সঙ্গে টক দই, আদা বাটা, রসুন বাটা, হলুদ, লংকা বাটা, ১ টেবিল চামচ সরষের তেল ও নুন মাখিয়ে ঢেকে অন্তত ৩০ মিনিট ম্যারিনেট করে রাখুন। কড়াইয়ে ৪ টেবিল চামচ সরষের তেল ভালো করে গরম করুন। আলু দু’টুকরো করে সামান্য হলুদ ও নুন মাখিয়ে মাঝারি আঁচে চারদিক সোনালি করে ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে চা চামচ চিনি দিয়ে গলতে দিন। চিনি সোনালি-বাদামি হয়ে এলে তেজপাতা, দারচিনি, লবঙ্গ, এলাচ ও শুকনো লংকা দিয়ে কয়েক সেকেন্ড ভেজে নিন। এবার পাতলা করে কাটা পেঁয়াজ দিয়ে মাঝারি আঁচে ৮-১০ মিনিট ভাজুন, যতক্ষণ না পেঁয়াজ গাঢ় সোনালি হয়ে আসে। টম্যাটো কুচি, জিরে বাটা ও ধনে বাটা দিয়ে, সামান্য উষ্ণ জল ছিটিয়ে ৩-৪ মিনিট রান্না করুন। টম্যাটো নরম হয়ে মশলা থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে বুঝবেন, মশলা পরবর্তী পর্যায়ে কষানোর জন্য প্রস্তুত। এবার ম্যারিনেট করা চিকেন কড়াইতে দিয়ে ভালো করে মশলার সঙ্গে মিশিয়ে নিন। মাঝারি আঁচে ঢাকনা ছাড়া ১০-১২ মিনিট ধরে ফের ভালো করে কষান। এবার চাপা দিয়ে দিন। তবে মাঝে মাঝেই ঢাকা খুলে নাড়তে থাকুন, যাতে মশলা কড়াইয়ের তলায় লেগে না যায়। চিকেন থেকে জল বেরিয়ে এলে ভাজা আলু ও চেরা কাঁচালংকা দিয়ে দিন। এবার ১ কাপ উষ্ণ জল দিয়ে ঢেকে কম আঁচে ১৫-২০ মিনিট রান্না করুন। চিকেন নরম এবং আলু সেদ্ধ হয়ে গেলে ঢাকনা খুলে আরও কিছুক্ষণ কষিয়ে নিন। গ্রেভি ঘন, গাঢ় এবং উপর থেকে সরষের তেল ছেড়ে এলে চা চামচ গরমমশলা ছড়িয়ে দিন। সবশেষে ১ চা চামচ ঘি দিয়ে আলতো করে মিশিয়ে আঁচ বন্ধ করে ঢেকে ৫ মিনিট রেখে দিন। লুচি কিংবা পরোটার সঙ্গে জমে যাবে এই চিকেন কষা।
মনীষা মুখোপাধ্যায়