‘অন্দরমহল’ নতুন করে সেজে উঠছে। এবার এখানে কলম ধরলেন ‘ওল্ডিস কিচেন’ খ্যাত ঊষা বিষয়ী। প্রতি মাসের একটি শনিবার তিনি পাঠকদের হদিশ দেবেন বাংলার একটি প্রাচীন রান্নার, যা মা-ঠাকুরমাদের হাতের গুণে হয়ে উঠত অনবদ্য। সঙ্গে থাকবে সেই রান্না নিয়ে তাঁর নিজস্ব কিছু স্মৃতি ও রান্নাটির রেসিপি।
• ‘চতুষ্পর্ণী’-তে প্রথমবারের জন্য কলম ধরার দিনে বেছে নিলাম এমন এক রেসিপি, যা আমার শাশুড়িমা আমাকে শিখিয়েছিলেন। তাঁর তৈরি ‘পেঁয়াজ পাতুরি’ এক অনবদ্য রান্না। বাড়িতে মাছ না হলে, এই পদ দিয়েই পাত সাফ করে দেওয়া যায়। এমনিতেই আমাদের পশ্চিম মেদিনীপুরের দিকে পেঁয়াজের ব্যবহার একটু বেশি। ভাত, মুড়ি, রুটি, লুচি— প্রায় সবকিছুর সঙ্গেই পেঁয়াজ খাওয়ার চল রয়েছে এখানে। আমার শাশুড়িমাও তার ব্যতিক্রম নন। তাঁর পেঁয়াজের প্রতি সেই ভালোবাসা থেকেই একদিন জন্ম নিয়েছিল এই অভিনব রান্নাটি। দেখেছিলাম, বাড়িতে মাছ হয়নি এমন এক দিনে, তিনি তাঁর মায়ের সঙ্গে পরামর্শ করে মিহি কাটা পেঁয়াজ, সরষে বাটা, কাঁচা লংকা ও কাঁচা সরষের তেল দিয়েই বানিয়ে ফেললেন এই দুর্দান্ত স্বাদের পদ। কলাপাতায় মুড়ে উনুনের নিভন্ত আঁচে সেঁকে তৈরি হয়েছিল এই পাতুরি। তারপর থেকে মাছ না থাকলেও এই রান্না হলে বাড়িতে যেন উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়ে যেত। বছরের পর বছর আমরা অনেককে এই রান্না খাইয়েছি। প্রায় সকলেই বলেছেন যে তাঁরা আগে এমন পদের নামও শোনেননি। একবার খাওয়ার পর এর স্বাদ সহজে ভুলতেও পারেননি। এটি আমাদের পরিবারের ভালোবাসা এবং উত্তরাধিকার। সেই উত্তরাধিকারই সবার সঙ্গে ভাগ করলাম।
পুরানো দিনের পেঁয়াজ পাতুরি
উপকরণ: পেঁয়াজ ৪টি মিহি করে কুচানো, কাঁচা লংকা কুচানো (ঝাল অনুযায়ী) সরষে বাটা ২ টেবিল চামচ, হলুদ গুঁড়ো চা চামচ, নুন স্বাদমতো, কাঁচা সরষের তেল পরিমাণ মতো, সেঁকে নেওয়ার জন্য বড়ো আকারের কলা পাতা ৭-৮ টুকরো, পাতুরি বাঁধার জন্য বড়ো সুতো ৮টি।
প্রণালী: একটি পাত্রে কুচানো পেঁয়াজ, কাঁচা লংকা কুচি, নুন, হলুদ গুঁড়ো, সরষে বাটা এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে কাঁচা সরষের তেল একসঙ্গে নিয়ে হাত দিয়ে খুব ভালো করে মেখে নিন। কিছুক্ষণ ওইভাবে রেখে দিন। এই অবসরে বরং কলা পাতাগুলোর দু’পিঠ হালকা আঁচে সামান্য সেঁকে নিন। এতে মোড়ানোর সময় পাতা ফেটে যাবে না। এক একটা পাতুরির জন্য দুটো করে কলাপাতা ব্যবহার করতে পারেন। এবার যে কলাপাতায় পাতুরি রাখবেন তার উপর হালকা সরষের তেল ব্রাশ করে নিন। এরপর বেশ কিছুটা করে ম্যারিনেট করা পেঁয়াজের মিশ্রণ দিন। উপর থেকে আরও একটু তেল ছড়িয়ে দিন। এবার কলাপাতাটি চারপাশ থেকে ভালো করে মুড়িয়ে সুতো দিয়ে শক্ত করে বেঁধে পাতুরিগুলো গড়ে নিন। এবার পালা পাতুরি সেঁকার। আগেকার দিনে এই রান্না কাঠকয়লার আঁচে হত, তাতে পাতুরির ভিতর একটা স্মোকি ফ্লেভার আসত। এখন সব বাড়িতে কাঠকয়লা না থাকায় চওড়া তাওয়া ব্যবহার করেও এই পদ রাঁধা যায়। তাওয়া আঁচে বসিয়ে অল্প তেল দিন। তার উপর মোড়ানো কলাপাতাগুলো রেখে চাপা দিয়ে এপিঠ-ওপিঠ উলটে ২০-২৫ মিনিট ধরে হতে দিন। কলাপাতার রং কালচে ও পোড়াটে হয়ে এলেই বুঝবেন ভিতরের পাতুরিও তৈরি হয়ে গিয়েছে। এবার আঁচ থেকে নামিয়ে কলাপাতা খুলে, গরম গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।