Bartaman Logo
১৫ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

ইতিহাস ছুঁয়ে দেখা রেসিডেন্সি

নবাবের শহর লখনউ। তার মেজাজে নবাবিয়ানা ভরপুর। অটোচালক থেকে বিরিয়ানি বিক্রেতা, সুগন্ধি আতরের দোকানি অথবা মিউজিয়ামের গাইড— সকলেই একবাক্যে বলছেন, ‘হাসুন, আপনি লখনউয়ে রয়েছেন...।’

ইতিহাস ছুঁয়ে দেখা রেসিডেন্সি
  • ১৫ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

লখনউয়ের বিখ্যাত ট্যুরিস্ট স্পট ‘দ্য রেসিডেন্সি’। কেমন তার অতীত?

Advertisement

কীভাবে যাবেন: ট্রেনে বা বিমানে লখনউ পৌঁছতে হবে। এরপর শহর ভ্রমণের জন্য অটো বা গাড়ি ভাড়া করতে পারেন। শহরের অন্যতম দ্রষ্টব্য ‘দ্য রেসিডেন্সি’। টিকিট কেটে ঢুকে পড়ুন এই ঐতিহাসিক স্থানে।

'মুসকুরাইয়ে, আপ লখনউ মে হ্যায়’...।
নবাবের শহর লখনউ। তার মেজাজে নবাবিয়ানা ভরপুর। অটোচালক থেকে বিরিয়ানি বিক্রেতা, সুগন্ধি আতরের দোকানি অথবা মিউজিয়ামের গাইড— সকলেই একবাক্যে বলছেন, ‘হাসুন, আপনি লখনউয়ে রয়েছেন...।’ গম্ভীর হয়ে নয়, আপনি নবাবের অতিথি, তাই হাসিমুখে ঘুরে দেখুন ইতিহাস সমৃদ্ধ এই শহর। হাসির মাধ্যমে যেন এ বার্তাই দেন প্রতিটি নাগরিক।
ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার সাধ বহুদিনের। সঙ্গে মিলবে কাবাবের স্বাদ। আর আইসক্রিমের উপর টপিংয়ের মতো আতরের খুশবুর হাতছানি। এতসব একসঙ্গে পাওয়ার ঠিকানা লখনউ। হোটেলে পৌঁছালাম বিকেল নাগাদ। সেদিনটা বিশ্রাম। পরের দিন সকাল থেকেই শহুরের নানা দ্রষ্টব্য ঘুরে দেখার পরিকল্পনা। লখনউয়ের পথে পথে ইতিহাস মণিমুক্তোর মতো ছড়িয়ে রয়েছে। বড়া ইমামবাড়া, ছোটা ইমামবাড়া, ভুলভুলাইয়া, মিউজিয়ম— আরও কত কী। এক এক জায়গার এক এক রকম সৌন্দর্য। আজ আলাদা করে লিখব দ্য রেসিডেন্সির ইতিহাস। সে চত্বরে ঢুকে মিনিট পাঁচেক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলাম। এবার হারিয়ে যেতে হবে অতীতের সরণিতে। 
১৮০০ সাল। নবাব সাদাত আলি খান দ্বিতীয়ের রাজত্বকালে নির্মিত হয়েছিল দ্য রেসিডেন্সি। এটি নবাবের দরবারে প্রতিনিধি হিসেবে থাকা ব্রিটিশ জেনারেলের বাসস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হত। ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধে এই রেসিডেন্সিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। 
১৮৫৭ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ হয়েছিল, যা প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ নামে পরিচিত। আদতে যা সিপাহি বিদ্রোহ। মিরাটে শুরু হলেও পরে তা দিল্লি, কানপুর, লখনউ ও ঝাঁসিতে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় লখনউ উত্তাল হয়ে ওঠে। উত্তেজনা বাড়তে থাকলে, প্রায় ১৫০০ জন ব্রিটিশ বাসিন্দা নিজেদের সুরক্ষার জন্য সমসংখ্যক ভারতীয় সাধারণ সৈন্যসহ লখনউ রেসিডেন্সিতে আশ্রয় নেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন হাই কমিশনার হেনরি লরেন্স। ১৮৫৭ সালের ১ জুলাই লখনউ রেসিডেন্সি অবরোধের মুখে পড়ে। সংখ্যায় অনেক কম এবং শোচনীয় পরিস্থিতি সত্ত্বেও, অবরোধকারীরা ৮৭ দিন ধরে প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে সক্ষম হন। একসময় জাঁকজমকপূর্ণ ভবনটিকে হাসপাতাল, অস্ত্রাগার ও আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা হয়। এই অবরোধে ব্রিটিশরা পরাজিত হয় এবং হেনরি লরেন্স সহ ২,০০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন। ব্রিটিশদের পক্ষ নেওয়া অনেক ভারতীয় সৈন্যও এই হতাহতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ব্রিটিশরা পরবর্তীতে লখনউ পুনরুদ্ধার করে। এই সব ইতিহাস যেন এখনও ধরা রয়েছে রেসিডেন্সির দেওয়ালের অভ্যন্তরে।
১৮৫৭ সালে বিদ্রোহ শুরু হলে প্রায় ৩০০০ ব্রিটিশ বাসিন্দার জন্য ব্রিটিশ রেসিডেন্সিটি একটি আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ এখন এর দেখভাল করে। মূল চত্বরে প্রবেশ করে এমন বেশ কয়েকটি ভবন দেখতে পেলাম, যেগুলো ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের আগে মূল রেসিডেন্সির অংশ ছিল। দেওয়ালে এখনও কামানের গোলার দাগ রয়েছে। রেসিডেন্সির ভিতরে রয়েছে একটি মিউজিয়াম। সে সময়কার বন্দুক, কামান, তলোয়ার, নানা ধরনের পদক, ঢাল এবং বাসস্থানের মডেল দিয়ে সাজানো সে মিউজিয়াম।
রেসিডেন্সির অন্দরে এখনও রয়েছে সেকালের পাকশালা। বড়ো বড়ো উনুনে রান্না হত। তার গভীর গর্ত চোখে পড়ল। রয়েছে সে কালের নাচমহল। উপরে পরদার আড়াল থেকে নাচ দেখতেন মহিলারা। বেগমদের মহলও সেদিনের সাক্ষ্য বহন করছে। তাঁদের স্নানঘরে বয়ে যাওয়া বাতাসে কান পাতলে শোনা যায় সেদিনের অভিমান, অনুরাগ, হতাশার চালচিত্র।  
অটো, বাস, গাড়ির কোলাহল। ভ্রমণার্থীদের আনাগোনা। পসরা সাজিয়ে বসে থাকা ফল বিক্রেতা। এসবই রেসিডেন্সির বাইরের টুকরো ছবি। ভিতরে ঢুকলে সবুজ মাঠ, ছড়ানো প্রান্তর, পুরনো ইটের কাঠামো। সে আপনাকে পৌঁছে দেবে অতীতের পথে। শুধু অনুভবের অপেক্ষা।
স্বরলিপি ভট্টাচার্য 

 

 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ