হঠাৎ বিপদে পড়লে আপনার সন্তান কি ভয় পেয়ে যায়? তাহলে আগে থেকেই তাকে বিপদ এড়ানোর রাস্তাগুলো বুঝিয়ে দিন। পরামর্শে মনোবিদ ডাঃ দেবাঞ্জন পান।
হঠাৎ বিপদে পড়লে আপনার সন্তান কি ভয় পেয়ে যায়? তাহলে আগে থেকেই তাকে বিপদ এড়ানোর রাস্তাগুলো বুঝিয়ে দিন। পরামর্শে মনোবিদ ডাঃ দেবাঞ্জন পান।
রাস্তাঘাটে হঠাৎ সমস্যার সম্মুখীন আমরা হয়েই থাকি। আর তা মোকাবিলা করার ক্ষমতাও রাখি। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে যা নেহাতই ছোটখাট ঝামেলা, তাই হয়তো বড়সড় আকার ধারণ করে শিশুদের কাছে। তারা এই ধরনের সমস্যায় পড়লে ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায়, ভয় পেয়ে অনেক সময় কান্নাকাটিও শুরু করে। এই হঠাৎ সমস্যায় ভয় পেয়ে যাওয়া বা নার্ভাস হয়ে পড়া, বাচ্চার বড় হওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। তাহলে উপায়? শিশুকে ছোট থেকে এই ধরনের পথচলতি সমস্যার মোকাবিলা করতে শেখাতে হবে। আর সেই কাজ সবচেয়ে ভালো পারবেন বাবা মা। এখন প্রশ্ন হল কীভাবে বাবা মা তা করবেন? সে বিষয়ে পরামর্শ দিলেন মনোবিদ ডাঃ দেবাঞ্জন পান।
প্রাথমিক কিছু শিক্ষা
দেবাঞ্জন বললেন, ‘একেবারে ছোট থেকেই বাচ্চাকে ইমোশন বা আবেগ চিনতে শেখানো দরকার। তার জন্য বাবা মা কিছু ঘটনার সাহায্য নিতে পারেন। গল্পের মাধ্যমে বাচ্চাকে বিভিন্ন আবেগের সঙ্গে পরিচিত করতে পারেন। তাকে নানা ধরনের ভিডিও দেখিয়ে আবেগগুলো চেনাতে পারেন। বা কোনও পিক্টোরিয়াল বুক (ছবিওয়ালা বই) -এর সাহায্য নিতে পারেন। এই ভাবে সে দুঃখিত মুখ, চিন্তাগ্রস্ত মুখ, হাসিখুশি মুখ ইত্যাদি চিনবে এবং পরবর্তীতে সেই মুখগুলোর পাশে পরিস্থিতি বসিয়ে তার মোকাবিলা করতে পারবে।’ এই প্রক্রিয়াটা যে খুব সংক্ষিপ্ত বা অনায়াস তা নয়। কিন্তু অল্প বয়স বা ছোটবেলা থেকে যদি অভিব্যক্তিগুলো সম্পর্কে বাচ্চাকে সচেতন করা যায় তাহলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সে ঘটনা ও পরিস্থিতি দুই-ই সামলাতে শিখে যাবে।
ভয় মনকে সতর্ক করে
দ্বিতীয় শিক্ষা হল এই যে, ভয় পাওয়া আসলে কোনও খারাপ কিছু নয়। এটা মনের একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। হাসি কান্নার মতোই মনের ক্ষেত্রে ভয়ও সহজাত। কিন্তু ভয় পেয়ে পালিয়ে গেলে বা লুকিয়ে পড়লে চলবে না। বরং তার মোকাবিলা করতে হবে। ভয় আসলে আমাদের সতর্ক করার একটা মানসিক উপায় মাত্র। একটা বার্তা যা আমাদের মস্তিষ্কে রেজিস্টার করা হচ্ছে। এবার সেই অনুযায়ী আমাদের কাজ করতে হবে। কারণ লুকিয়ে পড়ে বা পালিয়ে গিয়ে কোনও লাভ হবে না। জীবনের আর পাঁচটা অনুভূতির মতো একেও গ্রহণ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে।
পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে জানা জরুরি
ছোট থেকেই শিশু তার বাবা মায়ের কাছে জীবনের নানারকম পাঠ পেয়ে বড় হয়। ফলে বাবা মাকে মনে রাখতে হবে সহবত-ভদ্রতা ইত্যাদি শেখানোর পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধেও শিশুকে জানাতে হবে। ছোট থেকেই তাকে বোঝাতে হবে যে জীবনে চলার পথে এমন অনেক ঘটনাই ঘটবে যা হয়তো কোনওভাবেই অভিপ্রেত নয়। কিন্তু তাও সেগুলোর মুখোমুখি আমাদের হতেই হয়। এবং সেই ধরনের কোনও ঘটনা ঘটলে তা সামলে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, ভয় পেয়ে পিছিয়ে বা এড়িয়ে গেলে চলবে না।
আপদকালীন ব্যবস্থা
এগুলো সবই মানসিক শিক্ষা, বললেন ডাঃ পান। এর পাশাপাশি কিছু সাধারণ জিনিসও শিশুকে জানিয়ে রাখতে হবে। যেমন কিছু আপদকালীন ফোন নম্বর তাকে দিয়ে রাখতে হবে। তার মধ্যে দমকল, পুলিস, হাসপাতাল (বাড়ির কাছাকাছি) ইত্যাদি থাকবে।
কোন ধরনের বিপদে পড়লে কোন নম্বরটা কাজে লাগবে তাও তাকে জানিয়ে রাখতে হবে। মনোবিদের মতে, বাবা মায়ের মধ্যে একটা সহজাত প্রবণতা থাকে বাচ্চাকে যে কোনও পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করার। তাকে জীবনের ভালোটুকুর সঙ্গে পরিচিত করিয়ে খারাপটা তার থেকে আড়াল করে রাখার। এতে কিন্তু লাভের চেয়ে শিশুর ক্ষতিই বেশি হয়। জীবনের ভালো এবং মন্দ দিকের সঙ্গে বাচ্চার পরিচয় যত তাড়াতাড়ি ঘটবে, সে ততই স্বাবলম্বী হতে শিখবে। নিজেকে এবং অন্য কাউকে সাহায্য করতে সক্ষম হবে। সমস্যায় পড়লে কেবল কান্নাকাটি না করে তা থেকে সহজভাবে বেরিয়ে আসতে পারবে। আর এই যুগে সেটা খুবই জরুরি। কারণ বিপদ তো আর বলেকয়ে আসে না, হঠাৎ আসে। ফলে তা সামলানোর ক্ষমতাটা মনে মনে তৈরি করতে হয়। আর সেটা শিশু মনে বাবা মা-ই গড়ে তুলতে পারেন, তাদের ভয় বা বিপদের সম্ভাবনার ঘটনাগুলো সম্পর্কে আগে থেকে জানিয়ে বা তাকে সতর্ক করে।
সাধারণ কিছু শিক্ষা
এছাড়া কিছু সাধারণ জ্ঞান তার মধ্যে ছোট থেকেই তৈরি করে দিতে হবে। যেমন রক্ত পড়লে সেটা কীভাবে বন্ধ করতে হবে। কেটে গেলে কী করবে, আঘাত পেলে কী করবে ইত্যাদি। একই সঙ্গে টুকটাক অসুখে কী ধরনের ওষুধ খাওয়া যায় সে বিষয়েও তাকে একটু জানিয়ে রাখা ভালো। মানে অল্প জ্বর, পেট ব্যথা, বদহজম ইত্যাদিতে কেমন ওষুধ খেয়ে সমস্যার সাময়িক মোকাবিলা করা যায় সে সম্পর্কে বাচ্চাকে অবগত করে রাখা ভালো। এটা অবশ্য টিনএজের আগে করা উচিত নয়। আর তাও বলে দেওয়া উচিত যে এই চিকিৎসা সম্পূর্ণই সাময়িক প্রতিরোধের জন্য, তারপর ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়া আবহাওয়া সংক্রান্ত কিছু জিনিসও তাঁকে জানিয়ে রাখতে হবে। যেমন বর্ষায় প্রচণ্ড বৃষ্টি হলে জল জমতে পারে এবং সেক্ষেত্রে জলের মধ্যে দিয়েই সতর্ক হয়ে হাঁটতে হবে। কোথাও ম্যানহোলের ঢাকা খোলা আছে কি না তা কীভাবে বুঝবে, ইলেকট্রিকের তার পড়ে থাকলে কী করবে, এই ধরনের টুকটাক পাঠ তাকে দিয়ে দিতে হবে। এক্ষেত্রে ছবি বা ভিডিও দেখিয়ে শিশুকে পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত করতে পারেন।
সমবেদনার পাঠ
এছাড়া শিশুর মধ্যে একটা সমবেদনার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে ছোট থেকেই। কিছু পরিস্থিতি এমনও আসবে যেখানে শুধু কারও পাশে থেকে তার মানসিক শক্তি হয়ে ওঠাই যথেষ্ট। তখন অহেতুক প্রশ্ন করে তাকে বিব্রত করা যাবে না, এই ধরনের শিক্ষাও বাচ্চাকে মোটামুটি বারো-তেরো বছর থেকেই
দিতে হবে।
এই ধরনের ছোটখাট শিক্ষার মাধ্যমে, কখনও গল্প বলে, কখনও ঘটনার বর্ণনা দিয়ে, কখনও বা বিভিন্ন ছবি দেখিয়ে শিশুকে বাস্তবের সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে হবে ছোট থেকেই। তাহলে দেখবেন সে সব ধরনের সমস্যার সমাধান অনায়াসে করতে পারবে। জীবনে চলার পথ তার কাছে অনেক মসৃণ
হয়ে উঠবে।
কমলিনী চক্রবর্তী