ইথিওপিয়ার হায়েলি গুব্বি নিয়ে এখন বিস্তর চর্চা চলছে। ১২ হাজার বছর পর জেগে উঠেছে এই আগ্নেয় পর্বত। কোনও আগ্নেয়গিরি এত বছর ঘুমিয়ে থাকতে পারে? জানালেন অনির্বাণ রক্ষিত
ইথিওপিয়ার হায়েলি গুব্বি নিয়ে এখন বিস্তর চর্চা চলছে। ১২ হাজার বছর পর জেগে উঠেছে এই আগ্নেয় পর্বত। কোনও আগ্নেয়গিরি এত বছর ঘুমিয়ে থাকতে পারে? জানালেন অনির্বাণ রক্ষিত
ছোট্টবন্ধুরা, তোমরা হয়তো কিছুদিন আগেই শুনেছ যে, ১২ হাজার বছর পর একটি আগ্নেয়গিরি হঠাৎ জেগে উঠেছে। এবার তোমাদের মনে প্রশ্ন থাকতেই পারে এত দীর্ঘবছর পর কি কোনও আগ্নেয়গিরি জেগে উঠতে পারে? সেই প্রশ্নেরই উত্তরই খোঁজার চেষ্টা করব। যারা জানো না, তারা প্রথমেই জেনে নাও, পূর্ব আফ্রিকার ইথিওপিয়ার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে হায়েলি গুব্বি আগ্নেয়গিরির ঘটনা এটি। এখানকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে শুধু পাথুরে জমি, রুক্ষ পাহাড়, শুষ্ক বাতাস এবং অনাবাদি তৃণভূমি। আধুনিকতার ছোঁয়া নেই বললেই চলে। নেই নগরজীবনের কোনও স্পন্দন। এতটাই প্রত্যন্ত যে, জনবসতিও স্বল্প। বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় এই আগ্নেয়গিরির কথা উল্লেখ করা হলেও, দীর্ঘদিন ধরে কোনও অগ্ন্যুৎপাত না হওয়ার কারণে আগ্নেয়গিরিটিকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কারণ একটা সাধারণ ধারণা ছিল, যেহেতু হাজার হাজার বছর ধরে ঘুমিয়ে রয়েছে এই আগ্নেয়গিরি। তাই তেমন বিপদের আশঙ্কা নেই। কিন্তু আগের সমস্ত ধারণাকেই ভুল প্রমাণ করে আচমকাই জেগে ওঠে এই আগ্নেয় দৈত্য। ১২ হাজার বছর পর হায়েলি গুব্বি এমন অগ্ন্যুৎপাত ঘটিয়েছে, যা শুধু ইথিওপিয়ার জনজীবনই নয়, গোটা পূর্ব আফ্রিকা, এমনকী ভারত মহাসাগর পার হয়ে আমাদের দেশেও তার প্রভাব পড়েছে। অগ্ন্যুৎপাত থেকে নির্গত ছাই বাতাসে ছড়িয়ে পড়ায় বিমান পর্যন্ত বাতিল করতে হয়েছে। আগ্নেয়গিরি জেগে ওঠার পাশাপাশি আর একটি প্রশ্ন উঠেছে কেন এভাবে তৈরি হল ছাইমেঘ (অ্যাশ ক্লাউড)?
এই মুহূর্তে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সক্রিয় আগ্নেয়গিরি হাওয়াই দ্বীপের মৌনা লোয়া। ২০২২ সালে শেষ বার এই আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইথিওপিয়ার হায়েলি গুব্বির চরিত্রও মৌনা লোয়ার মতোই। এগুলি ‘শিল্ড ভলক্যানো’। এই সমস্ত আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্নুৎপাতের সময় বিপুল পরিমাণ লাভা নির্গত হয়। কিন্তু ছাইয়ের এমন প্রকাণ্ড স্তম্ভ তৈরি হয় না। অন্য দেশের দিকে ধেয়ে যায় না কোনও ছাইমেঘ। ফলে ১২ হাজার বছর পর অগ্নুৎপাত হলেও হায়েলি গুব্বি থেকে এমন ছাইয়ের কুণ্ডলীর উৎপত্তি স্বাভাবিক নয়। সেই বিষয়টাই ভাবাচ্ছে বিজ্ঞানীদের।
আফ্রিকা ও আরবীয়
পাতের বিচ্ছেদ
পূর্ব আফ্রিকার ‘রিফট জোন’ ভূতত্ত্বে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত করা হয়। এই বিশাল ফাটল অঞ্চল মূলত আফ্রিকান ও আরবীয় টেকটনিক পাতের বিচ্ছেদের ফলে তৈরি হয়েছে। ভূত্বককে বিশাল ধাতব পাতের মতো কল্পনা করলে দেখা যাবে, এই দুই পাত বছরে ০.৪-০.৬ ইঞ্চি করে খুব ধীরে ধীরে একে অপরের থেকে সরে যাচ্ছে। হাজার হাজার বছর ধরে দু’টি পাত সরতে থাকার ফলে পুরো অঞ্চলের ভূত্বককে প্রসারিত ও দুর্বল করে দিচ্ছে।
যখন দু’টি টেকটনিক পাত আলাদা হতে থাকে, তখন মাঝের অংশটি টান পড়ে ক্রমশ পাতলা হয়ে আসে। পাতলা ভূত্বকের নীচে থাকে ম্যান্টল নামের উত্তপ্ত শিলার স্তর। সাধারণ অবস্থায় এই উত্তপ্ত শিলা উপরের দিকে উঠতে পারে না, কারণ ভূত্বকের চাপ তাকে আটকে রাখে। কিন্তু বিচ্ছেদের ফলে যখন ভূত্বক প্রসারিত হতে শুরু করে, তখন গভীরের উত্তপ্ত শিলা উপরে ওঠার সুযোগ পায়। উপর দিকে উঠতেই তা গলতে শুরু করে এবং তৈরি হয় ম্যাগমা। যা আগ্নেয়গিরির মূল জ্বালানি।
এই ম্যাগমা পর্যাপ্ত পরিমাণে জমে উঠলে আগ্নেয়গিরির ভেতরের চাপ বাড়তে থাকে। সেই চাপে ভূত্বকের দুর্বল অংশ ভেঙে যায় এবং হঠাৎ করেই শুরু হয় অগ্নুৎপাত। লাভা, গ্যাস ও ছাই ধেয়ে আসে উপরের দিকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রক্রিয়াটি এতটাই স্বাভাবিক যে, আগ্নেয়গিরি সক্রিয় হবে কি না তা নির্ভর করে মূলত ভূত্বক কতটা প্রসারিত হচ্ছে এবং ম্যাগমা তৈরির গতি কতটা বেশি।
অর্থাৎ, আগ্নেয়গিরির ঘুম ভাঙা কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। ভূগর্ভে হাজার হাজার বছর ধরে যে চাপ, উত্তাপ ও রাসায়নিক পরিবর্তন জমে জমে তৈরি হয়েছে, তারই ফল হিসেবে আগ্নেয়গিরি একসময় সক্রিয় হয়ে ওঠে। মাটির নীচের প্রক্রিয়ার সময় নির্দিষ্ট নয়— কখনও কয়েকশো বছর, কখনও কয়েক হাজার বছর, আবার কখনও আরও বেশি।
হায়েলি গুব্বির অগ্ন্যুৎপাতকে তাই হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যাবে না। বরং এটি সেই দীর্ঘমেয়াদি ভূগর্ভস্থ পরিবর্তনেরই বহিঃপ্রকাশ, যা পূর্ব আফ্রিকার রিফট জোনকে ধীরে ধীরে রূপ দিচ্ছে নতুন এক ভূখণ্ডে। বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই সতর্ক করে বলেছেন, এই অঞ্চলের এই প্লেট বিচ্ছেদ ভবিষ্যতে এক নতুন সমুদ্রের জন্ম দিতে পারে। তাই এমন অগ্ন্যুৎপাত কেবল বর্তমানের বিস্ময় নয়, পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ভূগোলের দিকে তাকালেও
এটি এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত
বহন করে।
হায়েলি গুব্বির এই অগ্ন্যুৎপাত প্রমাণ করে যে, পৃথিবীর ভূগর্ভস্থ পরিবর্তন কখনও থেমে থাকে না। মানুষের দৃষ্টির বাইরে থাকা অঞ্চলও কখনও কখনও এমন ঘটনার জন্ম দেয়, যা বিজ্ঞানকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।