Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

দু’চাকায় চ্যালেঞ্জ

দুর্গাপুরে বড় হয়েছে মেয়েটি। বাবা, মা, দিদি, ভাইয়ের মধ্যবিত্ত সংসারে তার মানসিকতা খানিক আলাদা। কেন আলাদা? ছোট থেকেই স্বাধীনচেতা মেয়েটির খেলাধুলোর শখ।

দু’চাকায় চ্যালেঞ্জ
  • ২৩ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলকাতার রাস্তায় মহিলা বাইক চালক হিসেবে ভালো-মন্দ নানা অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন স্নিগ্ধা দাস।

Advertisement

দুর্গাপুরে বড় হয়েছে মেয়েটি। বাবা, মা, দিদি, ভাইয়ের মধ্যবিত্ত সংসারে তার মানসিকতা খানিক আলাদা। কেন আলাদা? ছোট থেকেই স্বাধীনচেতা মেয়েটির খেলাধুলোর শখ। ১৯৯০-এ হঠাৎই এক আত্মীয়ের কাছে বাইক চালানো শিখে নিল। কারণ সেই মেয়ে পুলিস হতে চায়। বাবা ইলেকট্রিসিটি বিভাগের কর্মী ছিলেন। পুলিসে চাকরির দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার পরও বাবা যেতে দেননি। না! সেই পুলিসে চাকরি করা হয়নি ঠিকই। কিন্তু সেই মেয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচতে শিখেছে দু’চাকায় ভর করে। হঠাৎ করেই শিখে নেওয়া বাইক, আজ তাঁর নিত্যসঙ্গী। তিনি স্নিগ্ধা দাস। কলকাতার পথে বাইক চালানো তাঁর পেশা।
‘যখন ওই দরজা বন্ধ, তখন এই দরজাও বন্ধ’— বিয়ের দশ বছর পর যখন বিচ্ছেদ চাইলেন স্নিগ্ধা, একথা বলেছিলেন তাঁর বাবা, মা। ছ’বছরের ছেলেকে নিয়ে সেই তাঁর জীবনসংগ্রাম শুরু। ‘আমি সিঙ্গল মাদার। ছেলের যখন ছ’বছর বয়স  তখন ডিভোর্স হয়ে যায়। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করতাম। ২০১৯-এ আমার সঙ্গে ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের মনোমালিন্য হয়। সেটা অনেকদূর গড়ায়। আমাকে চেন্নাই বদলি করে দেওয়া হয়। তখন ছেলের পড়াশোনা। চলে যাওয়া সম্ভব ছিল না। চাকরি ছেড়ে দিই। নতুন চাকরির চেষ্টা করতে শুরু করি। কিন্তু অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কাজ করানো হলেও টাকা পাচ্ছিলাম না। পাঁচ-ছ’মাস চেষ্টার পরও মনের মতো কাজ পাইনি। ছেলে তখন পলিটেকনিকে ডিপ্লোমা করছিল। দু’জনেই চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। কী করব ভাবছিলাম। সে বছর থেকেই বিভিন্ন সংস্থার অধীনে বাইক চালাতে শুরু করি’, বললেন স্নিগ্ধা। 
মুকুন্দপুরের বাসিন্দা স্নিগ্ধার ছেলে এখন চাকরি সূত্রে নয়ডায় থাকেন। কলকাতায় একার জীবন, স্বাধীন জীবনে ভারি আনন্দে আছেন তিনি। ‘বিয়ের পর আমি এতটাই পরাধীন ছিলাম, বলে বোঝাতে পারব না। বিচ্ছেদের পর নিজেকে সামলে নিতে তিন বছর সময় লেগেছিল। কারণ পাশে দাঁড়ানোর কেউ ছিল না। মা, বাবাও মেনে নেননি। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর ছেলেকে বলেছিলাম, ফুড ডেলিভারির অ্যাপে কাজ শুরু করি। ছেলে রাজি হয়নি। ও বরং যাত্রী পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেয়। ও ছোট থেকেই দেখেছে, মায়ের বাইকে কেউ না কেউ উঠছে। কারণ আমি বাইক চালিয়েই অফিসে যেতাম। সেই শুরু...’, বলছিলেন স্নিগ্ধা। 
কলকাতায় অ্যাপ ক্যাব চালক হিসেবে মহিলারা এখন সংখ্যায় বেড়েছেন। কিন্তু স্নিগ্ধা অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, মহিলা বাইক চালকের সংখ্যা খুব কম। তাঁর দাবি, ‘অনেকের নাম লেখানো আছে হয়তো। কিন্তু আমি ছ’বছরে এটা শুনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি, যাত্রীরা বলছেন, ম্যাডাম আপনাকে প্রথম পেলাম। খুব কম মানুষ বলেছেন, দ্বিতীয়বার কোনও মহিলা চালককে পেলাম। খুব বেশি হলে কলকাতায় এখন ১০ জন মহিলা বাইক চালান।’ সকাল সাড়ে দশটা থেকে রাত দশটা— সাধারণত প্রায় ১২ ঘণ্টা বাইক চালান স্নিগ্ধা। সকালে বাড়ি থেকে খাবার খেয়ে বেরন। সঙ্গে টিফিন থাকে। আর শৌচালয় ব্যবহারের প্রয়োজন হলে? স্নিগ্ধার উত্তর, ‘রাস্তার ধারে সাধারণের ব্যবহারের জন্য যে শৌচালয় রয়েছে, সেটাই ব্যবহার করতাম। এখন অনেক উন্নত হয়েছে। প্রত্যেকটা পেট্রোল পাম্পে শৌচালয় থাকে। তখন শুধু রাস্তার ধারের শৌচালয়ের উপর ভরসা করতে হতো।’
যে কোনও পেশার পেশাদার নিরাপত্তা খোঁজেন। যে মহিলা বাইক চালিয়ে মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছেন, তাঁর নিরাপত্তার চিন্তা তো থাকবেই। নিজের অভিজ্ঞতায় স্নিগ্ধা দেখেছেন, ‘পাঁচ শতাংশ লোক অসভ্যতা করে। আসলে যে চুরি করে, সে সাহসী নয়। তার ভয় থাকে। যে অসভ্যতা করে, তার এটা মাথায় থাকবে, আমি খোলা রাস্তায় যাচ্ছি। যদি গাড়ি দাঁড় করিয়ে চিৎকার করি, পাঁচটা লোক আসবে। এমন ঘটনা ঘটেছে। একটু বুদ্ধি করে ম্যানেজ করতে হয়।’ কী সেই ঘটনা? স্নিগ্ধা জানালেন, গাড়ি কেমন চালাচ্ছি, কতটা জোরে যাচ্ছে, কীভাবে ব্রেক দেওয়া হচ্ছে, সেটা চালক জানেন। যাত্রীর পক্ষে সেটা তো বোঝা সম্ভব নয়। তাঁর দাবি, ‘আমি অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একটু বয়স্ক মানুষই অসভ্যতা করে। অল্পবয়সিরা এনজয় করে। কত গল্প করে! এক ভদ্রলোকের কথা বলি। বয়স ৬০-এর কাছাকাছি। আমার একটু মায়া হয়েছিল। একটু নড়বড়ে। বসার সময় বললেন, তোমার কাঁধে একটু হাত দিই? আমি বললাম, আপনার কি খুব ভয় লাগছে? উনি বললেন, খুব বেশি বাইকে উঠি না তো। আমি বললাম, ঠিক আছে। ধরে বসুন। ধীরে ধীরে ওঁর হাত নামতে থাকে। তখন বলেছিলাম, আপনার হাত নামলে কিন্তু আমার হাত বন্ধ হয়ে যাবে। তার কিছুক্ষণ পর, উঁচুনিচু রাস্তায় উনি কোমরে হাত দিয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম, দেখুন চাইলে আপনার অ্যাকাউন্ট ব্লক করতে পারি। আপনি কি সেটাই চাইছেন? মহিলা হিসেবে ওঁর অভিসন্ধি বুঝতে পেরেছিলাম।’ স্বনির্ভর হতে চাওয়া যে মহিলারা বাইক চালক হতে চান, তাঁদের প্রতি স্নিগ্ধার বার্তা, ‘এই পেশায় আসলে এগুলো বুদ্ধি দিয়ে সামলাতে হবে। কারণ এই পেশা কঠিন।’
অ্যাপ ক্যাব চালকরা ভাড়া বেশি চাওয়ায় বহু যাত্রী বিরক্ত। তা কখনও বাগবিতণ্ডাতেও গড়ায়। স্নিগ্ধার অভিজ্ঞতা কী বলে? একটু হেসে বললেন, ‘আমি বাইক চালকের কাজ শুরু করার চার মাস পর ছেলে চাকরি পেয়ে যায়। ফলে আমার এই প্রয়োজন হয় না। তবুও বলছি, রাত ন’টা বেজে গেলেই অনেকেই বেশি ভাড়া চান, এটা সত্যি। যদি বৃষ্টি হয়, বহু দূরের রাস্তায় যাই— সেসব ক্ষেত্রে আমি গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে তারপর হয়তো অনুরোধ করি, যদি একটু বাড়িয়ে দেন। যাত্রী না দিলে কিছু করার নেই। কারণ তিনি গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছেন।’
৫১ বছরের স্নিগ্ধা আসলে নিজের শর্তে বাঁচতে চেয়েছিলেন। জীবন তাঁর সেই ইচ্ছে পূরণ করেছে। সে কারণেই তিনি হাসিমুখে বলেন, ‘এই কাজটা এনজয় করি, তার একটাই কারণ। আমি স্বাধীনচেতা। এই কাজটা স্বাধীনভাবে করা যায়। ইচ্ছে হলে বেরই। না হলে বেরই না। কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয় না। আমিই আমার বস।’ 

স্বরলিপি ভট্টাচার্য

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ