Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

সুইস আল্পসের মাথায়

ইউরোপ ভ্রমণের আট দিনের মাথায় আমরা যাব সুইৎজারল্যান্ড। স্বভাবতই সবাই খুব উত্তেজিত। ব্রেকফাস্টের পর কোচে উঠে বসলাম।

সুইস আল্পসের মাথায়
  • ২৮ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ইউরোপ ভ্রমণের আট দিনের মাথায় আমরা যাব সুইৎজারল্যান্ড। স্বভাবতই সবাই খুব উত্তেজিত। ব্রেকফাস্টের পর কোচে উঠে বসলাম। জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্টের ভিতর দিয়ে চলেছি। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে এখান থেকেই সুইস আল্পস দৃশ্যমান হয়। জার্মানির প্রাকৃতিক দৃশ্য এখানে অতুলনীয়। 
জঙ্গল পেরিয়ে আমরা সুইৎজারল্যান্ড–জার্মানি সীমান্তের শ্যাফহাউসেন এলাম। এটি মনোরম মধ্যযুগীয় শহর ও ইউরোপের বৃহত্তম জলপ্রপাত রাইন ফলসের জন্য বিখ্যাত। এরপর জুরিখের পথে রওনা দিলাম। জুরিখ যে সুন্দর সেটা জানতাম, কিন্তু চোখের সামনে দেখে মনে হল যেন স্বর্গের ছবি দেখছি। জুরিখ লেকের ধারে পৌঁছে মনে হল এখানে যদি কয়েকটা দিন কাটিয়ে যেতে পারতাম। এবার বাস এঙ্গেলবার্গের পথে। সেখানে তিন দিন থাকব। বাঁদিকে ছবির মতো সুইস কটেজ, বাড়ির বাইরে ফুলের মেলা, আর ডানদিক সবুজ ঘাসে ভরা ঢেউখেলানো প্রান্তর মিশে গিয়েছে অ্যালপাইন তৃণভূমিতে। এঙ্গেলবার্গের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ে মনে হল যেন এক ঘুমন্ত শহর। আমাদের তিন রাতের ঠিকানা হোটেল টেরেস ছোটো শহরটার একটু উঁচুতে। গোধূলির আলোয় মাউন্ট টিটলিস প্রথম দেখলাম। অপূর্ব দেখাচ্ছে। ইউরোপের সব জায়গায় প্রায় সাড়ে ন’টা পর্যন্ত বেশ আলো থাকে। তাই পড়ন্ত সূর্যের আলোয় টিটলিসের মাথার বরফের হালকা লাল রঙে রাঙানো দৃশ্য দেখে মোহিত হয়ে গেলাম। টিটলিস মধ্য সুইৎজারল্যান্ডের উচ্চতম শৃঙ্গ। 
পরদিন মাউন্ট টিটলিস যাব। হোটেল থেকে সামান্য দূরে টিটলিস রোটেয়ার স্টেশন থেকে রিভলভিং কেবল কারে টিটলিস যাওয়ার পথে সুইস ল্যান্ডস্কেপ দেখতে দেখতে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। উঁচুতে ওঠার সঙ্গেই প্রকৃতি বদলে যেতে লাগল। মখমলের মতো বিস্তীর্ণ আলপাইন তৃণভূমি, ছোটো ছোটো কটেজ, লেক, তুষারাবৃত শৃঙ্গ, হিমবাহের ফাটল, সব মিলেমিশে যেন এক অপূর্ব কোলাজ তৈরি করেছে। এক বিচিত্র কেবল রাইড-এর শেষে টিটলিস পৌঁছলাম। আমাদের ভাগ্য ভালো দিনটা রোদ ঝলমলে। শুনেছিলাম, মেঘ নাকি প্রায়ই জমে থাকে টিটলিসের চূড়ায়। তখন সৌন্দর্যের খানিকটা মাটি হয়ে যায়। ওখানে নেমে দেখি শাহরুখ খান ও কাজলের এক লাইফসাইজ কাটআউট! দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে সিনেমার পোস্টার। 
আমরা অনেকেই এগলাম আইস ফ্লায়ার স্টেশনের দিকে। এই আইস ফ্লায়ার বা চেয়ার লিফটে বসে স্কি করার মতো এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হল। অনেকটা দূর যাওয়ার পর প্রায় লাফিয়ে নামতে হল, কারণ আইস ফ্ল়ায়ার এক চলমান মেশিন। অনেকটা এসকেলেটরের মতো। আর নেমেই অসামান্য এক প্রাকৃতিক রূপ দেখতে পেলাম। চারদিকে শুধুই বরফ। দলের অনেকেই বরফের বল বানিয়ে একে অপরের দিকে ছুড়তে লাগলেন। বেশ কিছুটা সময় টিটলিসে কাটানোর পর ট্রুবসি নামে এক জায়গায় লাঞ্চ করে সুইৎজারল্যান্ডের লুসার্ন শহর ভ্রমণ সেরে এঙ্গেলবার্গ ফিরে এলাম।    
পরের দিন সুইস আল্পসে এক অসাধারণ ট্রেন রাইডে যাব। ১১,৩০০ ফুট উঁচুতে ইউংফ্রাউ ইউরোপের সবচাইতে উঁচু রেলস্টেশন। এই ট্রেন রাইডের জন্য আমাদের যেতে হবে লওটারব্রুনেন নামে ছোটো এক শহরে। এঙ্গেলবার্গ ছেড়ে কোচ পাহাড়ে ওঠার কিছুক্ষণ বাদে পাইন বনের ফাঁকে ডানদিকে দেখতে পেলাম লেক ব্রিয়েঞ্জ যার অন্যপ্রান্তে সুইৎজারল্যান্ডের এক অন্যতম সুন্দর শহর ইন্টারলেকেন। ইউংফ্রাউ ভ্রমণ শেষে আজ বিকেলেই ইন্টারলেকেন যাব। প্রায় এক ঘণ্টা বাদে পৌঁছে গেলাম লওটারব্রুনেন। পার্কিং লট থেকে একটু উঁচুতে রেল স্টেশন। পাহাড়ের গায়ে অপূর্ব সব কটেজ ঘেরা রেল স্টেশন দেখে মনে হল কোনো গেস্ট হাউসে এলাম বোধহয়। ইউরোপে ট্রেন জার্নি খুবই রোমাঞ্চকর ব্যাপার। আর সেই ট্রেন যদি আল্পস-এর মাথায় নিয়ে যায় তবে তো কথাই নেই। দূরে বরফ ঢাকা পাহাড় চূড়ার কী অপূর্ব দৃশ্য! ট্রেন ছাড়ার পর পাহাড়ি ঝরনা, বরফাবৃত শৃঙ্গ, পশুপালকদের কুটির, ছবির মতো ছোটো ছোটো হ্যামলেট, সব ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দি করতে থাকলাম। ওয়েনগেন নামে একটা শহর দেখে চোখ ফেরাতে পারি না, এক পিকচার পোস্টকার্ড যেন। ওয়েনগেন পার হয়ে ক্লাইন শেডেগ স্টেশন। এখানে লাইন বদল করতে হবে। স্টেশনে একটু অপেক্ষা করতে হল। দু’কিলোমিটার দূরের স্টেশন ইগারগ্লেশিয়ারে ট্রেন দাঁড়ালে একটা বড়ো গ্রুপ দেখলাম। মনে হল চাইনিজ বা জাপানিজ। কিছুক্ষণ পরেই ট্রেন সাত কিলোমিটার লম্বা আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল সেকশনের মাঝামাঝি আইগারওয়্যান্ড স্টেশনে দাঁড়াল। কাচের জানালা দিয়ে বরফাবৃত শৃঙ্গ ও হিমবাহ দেখার জন্য ট্রেন এখানে পাঁচ মিনিট দাঁড়ায়। সময় নষ্ট না করে ক্যামেরা নিয়ে ট্রেন থেকে দৌড়ে নামি। পাহাড়ের খাঁজ কেটে তৈরি জানলা দিয়ে আইগার পর্বতের নর্থ ফেসের ত্রিভূজাকৃতি খাড়াই শৃঙ্গ দেখে মোহাবিষ্ট হয়ে পরি। বিখ্যাত আমেরিকান ছবি ‘দ্য ইগার স্টেশন’-এর শেষ দৃশের শ্যুটিং এখানেই হয়েছিল।
প্রায় সাড়ে এগারো হাজার ফুট উচ্চতায় যে এমন একটা রেল স্টেশন থাকতে পারে কল্পনাই করিনি। স্টেশনে প্রবেশ করে মনে হল যেন এক শপিং কমপ্লেক্সে ঢুকে পড়েছি। ইউংফ্রাউয়ের প্রধান আকর্ষণ ইউরোপের দীর্ঘতম ও বৃহত্তম আলেচ হিমবাহ, স্ফিংক্স টাওয়ার ও অবজারভেটরি। স্ফিংক্স টাওয়ার ভিউ পয়েন্টে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। ১১,৭১৬ ফুট উঁচু স্ফিংস এক পর্বতশৃঙ্গ, যার নামে এই স্ফিংস টাওয়ার। কঠিন গ্র্যানাইট পাথর কেটে তৈরি ভিউপয়েন্ট। শনশন করে হাওয়া বইছে। এখানে দাঁড়িয়ে ইউংফ্রাউ পর্বতের চূড়া ও ইউরোপের সবচাইতে বড়ো হিমবাহ ২৩ কিলোমিটার লম্বা অ্যালেস দেখে মুগ্ধ হলাম। একটা নেশায় যেন বুঁদ হয়ে আছি। নীচে তাকিয়ে দেখি অনেকেই হিমবাহের ধারে চলে যাচ্ছে। কারো হাতে স্কি পোল রয়েছে। স্ফিংক্স অবজারভেটারি সুইৎজারল্যান্ডের দ্বিতীয় উচ্চতম অবজারভেশন ডেক। বেশ কিছু সময় কাটিয়ে আমরা অনেকেই আইস প্যালেসে প্রবেশ করলাম। বরফের গুহার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে মনে হচ্ছিল যেন মেরুপ্রদেশে আছি। গুহার মধ্যে নানা বরফের মূর্তি যার মধ্যে পেংগুইনই বেশি। এরপর আমরা বলিউড নামে এক রেস্তরাঁয় লাঞ্চ করতে এলাম। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা কাটিয়ে বিকেলে ট্রেনে ফিরে চললাম। আবার ক্লাইন শেডেগ স্টেশনে ট্রেন বদল করে গ্রিনডেলওয়ার্ল্ড হয়ে ইন্টারলেকেন যাব। এক আনন্দময় দিনে ইতি পড়ল। 

Advertisement

কীভাবে যাবেন: 
দিল্লি ও মুম্বই শহর থেকে সরাসরি জুরিখ যাওয়ার বিমান রয়েছে। জুরিখ পৌঁছতে সাড়ে আট থেকে ন’ঘণ্টার মতো সময় লাগে। তারপর সেখান থেকে বাসে এঙ্গেলবার্গ হয়ে আল্প পর্বত যেতে পারেন। আর কলকাতা থেকে যেতে হলে দুবাই বা দোহায় বিমান বদল করে জুরিখ পৌঁছতে পারেন। 
পরাগ রঞ্জন দত্ত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ