সঙ্ঘ বলতে শ্রীরামকৃষ্ণ বিশেষ করে সাধুদের সঙ্ঘকেই লক্ষ্য করেছিলেন, কিংবা তার পরিধি আরও ব্যাপক ছিল তা আমরা সঠিকভাবে বলতে পারি না। তবে সাধুসঙ্ঘদের গঠনে তাঁর যে বিশেষ চেষ্টা ও সুপরিকল্পিত একটি প্রণালী ছিল এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর সাধনালব্ধ সম্পদ নিজের জন্য রাখেননি, তাঁর সে সম্পদ বিশ্বের সকলের জন্য। তিনি বলেছিলেন—‘শেষকালে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়ে যাব’ অর্থাৎ শেষকালে সকলের কাছে নিজের স্বরূপকে প্রকাশ করবেন। নিজের সম্পর্কে তিনি সবসময় রেণুর রেণু, তোমাদের একগাছি ছোট লোমের মতো, নাহং নাহং তুঁহু তুঁহু, আমি কিছু নয় তিনিই সব, এরকম করে বলতেন, ধীরে ধীরে লোকের ধারণা-শক্তি যেমন বেড়েছে তেমনি তিনি তাঁর স্বরূপকে ক্রমশঃ উদ্ঘাটিত করেছেন।
প্রাচীনকালে সন্ন্যাসীদের সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে বাস করার কোন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। ঋষিরা অধিকাংশই ছিলেন গৃহস্থ। তাঁদের কাছে যেসব শিক্ষার্থী আসতেন তাঁরাও যে সন্ন্যাসের আদর্শ নিয়ে আসতেন তা নয়। হয়তো তাঁদের ভেতর কেউ কেউ গার্হস্থ্য আশ্রম থেকে সন্ন্যাস গ্রহণ করতেন। অনেকের ধারণা এই যে, সন্ন্যাসী হওয়া মানে ভগবানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়া। ভগবানের ইচ্ছা হল এই জগতে তাঁর খেলা চলুক, জগৎ বিস্তৃত হোক এবং সেই লীলা বিস্তারের সহায়ক হওয়াই হল সাধারণ মানুষের কর্তব্য। মীমাংসকদের এই ধারণাই বদ্ধমূল ছিল। তাঁরা অনেক জায়গায় বলেছেন যে, সন্ন্যাস-আশ্রম শাস্ত্র বহির্ভূত। এরকম বর্ণিত আছে যে, ব্রহ্মা সনৎ, সনাতন, সনন্দ ও সনৎকুমার এই চার মানসপুত্রকে সৃষ্টি করে বললেন—তোমরা প্রজা সৃষ্টি কর। তাঁরা বললেন, ‘কিং প্রজয়া করিষ্যামো যেষাং নোঽয়মাত্মাঽয়ং লোকঃ’—আমরা প্রজা দিয়ে কি করব? আমাদের আত্মাই ইহলোক। ‘মনুষ্যলোকঃ পুত্রেণৈব জয়াঃ’—পুত্রের দ্বারা এই লোকের কর্তব্য পরিসমাপ্ত হয়। তাঁরা সন্তানসন্ততি উৎপাদনের জন্য কোন উৎসাহ নিলেন না। তখন ব্রহ্মা প্রজাপতিদের সৃষ্টি করলেন। প্রজা অর্থাৎ জগতের লোকসমূহ, তাদের পতি, স্রষ্টা, নিয়ন্তা। তাঁরা সন্তানসন্ততির বৃদ্ধি করলেন। অতএব যাঁরা বলতেন সন্ন্যাস আদর্শ নয় তাঁদের কাছে আদিতে সৃষ্ট ঐ চারজনের সন্ন্যাস নেবার দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়। তাঁরা স্বভাব-সন্ন্যাসী, বিধিপূর্বক সন্ন্যাস গ্রহণের প্রয়োজন তাঁদের হয়নি।
তারও পরে, ধর্ম কতকটা ব্যবস্থিত রূপে পালিত হতে লাগল। স্মৃতি হল, আমাদের কেমন আচরণ করা উচিত তার নিয়মকানুন লেখা হল। বৈদিক যুগে কোন কোন ঋষি সন্ন্যাসকে জীবনের আদর্শ বলে গ্রহণ করেছেন। সন্ন্যাসীদের জন্য নিয়ম, তাঁরা হবেন গণ্ডারবৎ, কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে নিজের আদর্শ নিয়ে চলবেন। তাঁদের বলা হল পরিব্রাজক, সর্বদা ভ্রমণ করবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পরিব্রাজক ঐ সাধুদের যে সমাজ পোষণ করত, ভিক্ষা দিত, তার প্রতিদানে তাঁরা কিছু দিতেন কি? অবশ্যই দিতেন। যে ভগবৎ-তত্ত্ব আধ্যাত্মিক সম্পদ তাঁদের হৃদয়ে সঞ্চিত থাকত তা তাঁরা সকলকে বিতরণ করতেন।
স্বামী ভূতেশানন্দের ‘শরণাগতি’ থেকে