


সমৃদ্ধ দত্ত: ভারতের সমাজ, অর্থনীতি, জীবনযাপন বদলে গিয়েছে, এরকম কোনো প্রকল্প, সিদ্ধান্ত, সরকারি স্কিম অথবা সাহসী পদক্ষেপ বিগত ১৫ বছরে দেখা যায়নি। তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, রাজনৈতিক মহল এবং প্রশাসনিক আমলাদের মধ্যে উদ্ভাবন শক্তি কি ক্রমেই কমে গিয়েছে? সরাসরি ভারতের মতো বিশাল এক রাষ্ট্রের সব স্তরের মানুষের মধ্যে ইতিবাচক বিপুল প্রভাব পড়েছে এরকম একটিও সরকারি স্কিম আর তৈরি করতে পারেনি কোনো সরকার অথবা আমলারা। বরং যাদের এই কাজটি সামাজিক গবেষণার মাধ্যমে করার কথা, সেই নীতি আয়োগ বস্তুত একটি অচল সংস্থায় পরিণত হয়েছে। আশপাশের যে কোনো মানুষকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, নীতি আয়োগ কী করে বলো তো! কজন বলতে পারবে? পারবে না। কারণ নীতি আয়োগের তেমন কোনো কাজই নেই মাঝেমধ্যেই মিটিং আর রিপোর্ট তৈরি করা ছাড়া।
২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছিল ১০০ দিনের কাজের গ্যারান্টি প্রকল্প। কাজ পাওয়ার অধিকারকে আইনে পরিণত করা হয়েছিল ওই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী রঘুবংশপ্রসাদ সিং তো চালিকাশক্তি ছিলেনই। কিন্তু ওরকম একটি ভাবনার উদয় হওয়ার প্রক্রিয়ায় একাধিক কেন্দ্রীয় সচিবের অবদান ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে এই প্রকল্পের কথা বলার কারণ হল, ২০ বছর আগে শেষবার এমন কোনো সরকারি স্কিম নেওয়া হয়, যা ভারতের গ্রামীণ জীবন ও অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। এই ধাঁচের প্রকল্প যে ছিল না, এমন নয়। কাজের বদলে খাদ্য ছিল। কিন্তু এরকম সুসংহত একটি ব্যবস্থা আগে চালু হয়নি। তারও আগের বছর ২০০৫ সালে ভারতে চালু হয়েছিল তথ্য জানার অধিকার আইন। আরটিআই অ্যাক্ট। একেবারে সাধারণ মানুষের হাতে এসেছে সরকারের কাজ সম্পর্কে জানতে চাওয়ার অধিকার। সরাসরি চিঠি লিখে। সেই জবাব দিতে বাধ্য সরকার। জনতা জানতে চাইবে, সরকার জবাবদিহি করবে। যা নীতি ও আদর্শগতভাবে বৈপ্লবিক। এবং গণতন্ত্রের সবথেকে বড়ো বিজ্ঞাপন।
ওই দুটি প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ইউপিএ সরকারের আমলে। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়সীমায় কেন্দ্রীয় সরকার একটিও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি যা যুগান্তকারী। একটি সরকার তো চাইবেই কিছু বৈপ্লবিক প্রকল্প নিতে, যা জনগণের জীবনযাপনকে বদলে দিতে পারে কিংবা ভারতের অর্থনীতি অথবা সমাজের বাঁকবদল হয়ে যায়। যেমন ধরা যাক ১৯৯১ সালে উদার অর্থনীতির ঘোষণা করেছিলেন মনমোহন সিং ও নরসিমা রাও। সেই একটি সিদ্ধান্তের জেরেই ভারত বদলে গেল। আজও ভারত যে পথে চলছে ওই একটি সিদ্ধান্তের জেরে। কেউ পারেনি নতুন কিছু করে দেখাতে তারপর থেকে।
ভারতের শিল্প ও অর্থনীতির চালিকাশক্তি কেমন হওয়া উচিত? ১৯৩৮ সালে স্বাধীনতার ১১ বছর আগেই কংগ্রেস সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসু দিশানির্দেশ তৈরি করে দিতে একটি কমিটি গঠন করেছিলেন। ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিটি। সেই কমিটি ভারতের শিল্প, অর্থনীতি কোন পথে যাবে সেই সম্পর্কে দিশানির্দেশ দেবে। সুভাষচন্দ্র বসু জওহরলাল নেহরুকেই যোগ্য মনে করেছিলেন কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার। এমনকি তিনি চিঠিতে বলেছিলেন, আপনি রাজি না হলে, এই কমিটি হবেই না। নেহরু হয়েছিলেন সভাপতি। কিন্তু স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নেহরু ঠিক সুভাষবাবুর নির্মিত ওই কমিটির ধাঁচেই গঠন করেছিলেন যোজনা কমিশন। অবিকল সুভাষবাবুর প্রদর্শিত পথেই চেয়েছিলেন প্ল্যানিং কমিশন গঠন করতে। সেই প্ল্যানিং কমিশন গঠনের অন্যতম কারিগর ছিলেন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস অফিসার তারলোক সিং। নেহরুর প্রধান সচিব। ভারতের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের রিপোর্ট ও সুপারিশ লিখেছিলেন আইসিএস তারলোক সিং। দ্বিতীয় ও তৃতীয় রিপোর্টও তাঁর রচিত। দ্বিতীয় কমিশনের নীতি স্থির করেছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ। যাকে মহলানবিশ প্ল্যান আখ্যা দেওয়া হয়। দীর্ঘকাল ধরে ভারতের নীতি নির্ধারণ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। যেখানে আমলাদের প্রত্যক্ষ কার্যকরী ভূমিকা প্রভূত তৎপর্যপূর্ণ ছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিখুঁত যুগলবন্দি।
১৯৬৯ সালে রাজ্যসভায় বাংলা থেকে নির্বাচিত এক এমপিকে ব্যাংক জাতীয়করণ নিয়ে সংসদে অসাধারণ ভাষণ দিতে শুনে ইন্দিরা গান্ধী ওম মেহতাকে প্রশ্ন করেছিলেন ছেলেটা কে? মেহতা উত্তর দিয়েছিলেন, প্রণব মুখার্জি। বাংলা কংগ্রেস থেকে। প্রসঙ্গত ওই বছরের জুলাই মাসে ব্যাংক জাতীয়করণ নিয়ে খসড়া আইন মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় তৈরি করেছিলেন অতি গোপনে এক প্রশাসনিক আধিকারিক। আই জি প্যাটেল। অর্থমন্ত্রকের বিশেষ সচিব। তিনি, রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর এল কে ঝা এবং অর্থমন্ত্রকের আর এক আমলা আর কে শেষাদ্রী ১৪টি ব্যাংকের জাতীয়করণ আইন তৈরি করেন। ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থা আমূল বদলে গিয়েছিল ওই একটি সিদ্ধান্তে।
১৯৭৯ সালে মোরারজি দেশাই বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিন্ধ্যেশ্বর প্রসাদ মণ্ডলকে চেয়ারম্যান করে একটি কমিশন গঠন করেছিলেন জাতপাতের ভিত্তিতে ভারতের সংরক্ষণ ব্যবস্থার রদবদলের লক্ষ্যে। ওই কমিশনের চেয়ারম্যানের নামেই কমিশনের নাম পরবর্তীকালে খ্যাত হয় মণ্ডল কমিশন নামে। মোরারজি দেশাই দেখে যেতে পারেননি কমিশনের রিপোর্ট। কারণ জনতা দল সরকারের পতন হয়েছিল। ১৯৮০ সালে ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীরা এই ২৭ শতাংশ ওবিসিকে সংরক্ষণ সুপারিশ মেনে নিয়ে কার্যকর করতে চাননি। অতএব ১০ বছর ধরে সেই রিপোর্ট পড়ে ছিল সরকারের কাছে। বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং যখন ক্ষমতাসীন হলেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি তাঁর সরকারের প্রথম কাজই ঘোষণা করেছিলেন মণ্ডল কমিশন সুপারিশ কার্যকর করা। ওই কমিশনের সুপারিশ ও রিপোর্ট তৈরি, বিশ্লেষণ এবং খুঁটিনাটি কাঠামো নির্মাণের পিছনে ছিলেন এক আইএএস অফিসার। অন্ধ্রপ্রদেশ ক্যাডারের পি এস কৃষ্ণাণ।
এই তাবৎ উদাহরণের তালিকায় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু করা কিংবা মিড ডে মিল প্রকল্প ইত্যাদি বহু সরকারি স্কিমের পিছনে আমলাদের ভূমিকা হয়ে রয়েছে ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ১০০ দিনের কাজের পর কিন্তু আর এমন কোনো প্রকল্প ভারতের জনজীবন, অর্থনীতি, সমাজ, পেশা, আয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না কিংবা বদলে দিয়েছে, এমন হয়নি। বিগত ১১ বছরে যত স্লোগান, প্রকল্প, সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেগুলি নিছক ক্ষণিক ও মুহূর্তকালের হাততালিবান্ধব. সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি কাজে এসেছে এরকম কোনো সিদ্ধান্ত সরকার গ্রহণ করতে পারছে না। প্রতিটি রাজ্যে সরকারের পক্ষ থেকে নানাবিধ ক্যাশ ট্র্যান্সফার প্রকল্প সবথেকে বেশি দেখা যায়। কিন্তু সরকারি আমলা ও শাসক জুটি বেঁধে দীর্ঘকালীন কোনো অভিনব প্রকল্প রচনা করে চালু করেছেন সেরকম দেখা যায়নি। কেন্দ্রীয় সরকার নোটবাতিল, সিএএ, ৩৭০ নং ধারা অবলুপ্তি ইত্যাদি বহুবিধ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুপস্থিত। এই প্রতিটি সিদ্ধান্তই আদলে রাজনৈতিক এজেন্ডা। এর সঙ্গে রাজনীতিহীন কোনো প্রকল্প চালু করার নমুনা একটিও নেই, যা ভারতকে বদলে দেবে জাতি-ধর্ম-ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে। ভারতের প্রশাসনিক মহলের এই ব্যর্থতা যথেষ্ট দুর্ভাগ্যজনক।
দীর্ঘদিন ধরেই ভারতে কর্মসংস্থানের প্রবল এক সংকট চলছে, মানুষের আয় কমছে, সঞ্চয় কমছে, এমনকি শহরগুলি অবাসযোগ্য হয়ে যাচ্ছে সুসংহত সিটি প্ল্যানিং ব্যবস্থা না থাকার কারণে। সর্বত্র যানজটের একই চিত্র। বর্ষা হলেই জলমগ্ন হবে শহর। সেটাও ভারতের সব মেট্রো শহরের চেনা দৃশ্য। বনগাঁ লোকাল আগেও অফিস টাইমে আতঙ্ক ছিল যাত্রীদের কাছে, এখনও তাই। প্রশ্ন হল এসবের থেকে জনসমাজকে সুরাহা দেওয়ার মতো কোনো প্ল্যান, পদক্ষেপ, সমস্যা থেকে মুক্তির পথে কোনো স্কিম গ্রহণ, এসব কিছুই দেখা যায় না। ভারতের রাজনৈতিক মহল এবং প্রশাসনিক আমলাদের মধ্যে শাসনপ্রক্রিয়ার তীক্ষ্ণ যোগ্যতার অভাব ঘটছে? নাকি আসলে আমলাদের ক্ষমতা ও মেধার প্রয়োগের সুযোগই কমিয়ে দেওয়া হয়েছে? শাসক ইনোভেশন চাইছে না? শুধুই ইয়েস ম্যান চায়?
দেশকে বদলে দেওয়ার মতো জনগণের সুবিধা হবে এরকম প্রকল্প, পদক্ষেপ অথবা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না আজকাল। বরং বেছে বেছে সেইসব সিদ্ধান্তই নেওয়া হচ্ছে, যেগুলি মানুষের সাধারণ জীবনযাপনকে ব্যতিব্যস্ত করে দেয়। অস্থিরতা তৈরি হয়। মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। নিত্যদিনের জীবনে নিত্যনতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করার এক গবেষণাগার তৈরি করেছে সরকার। তাই আমলা এবং শাসকের জুটি প্রকৃত ভারত নির্মাণে একটির পর একটি উন্নতির সিঁড়ি স্থাপন করতে আর পারছে না। চমৎকার সব যা হওয়ার সব অতীতে হয়ে গিয়েছে!