Bartaman Logo
২৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভাঙা গড়ার খেলা!

দেশের অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মূল্যবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক চাপের কারণে সরকারের জনপ্রিয়তা কমছে। বিস্তারিত পড়ুন।

ভাঙা গড়ার খেলা!
  • ৭ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেশের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়েছে বিভিন্ন মহলে। একদিকে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, যার জেরে অশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি, পেট্রপণ্যের জোগানে ঘাটতি। অন্যদিকে টাকার দামে পতন, পেট্রল-ডিজেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, পাইকারি ও খুচরো বাজারে মুদ্রাস্ফীতি এবং বর্ষার অপ্রতুলতার কারণে চাষবাসে ধাক্কা লাগার আশঙ্কায় চলতি অর্থবর্ষে (২০২৬-২৭) আর্থিক বৃদ্ধির হার কমবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর ভাষায়, দেশের অর্থনীতি সুনামির মুখে পড়তে চলেছে। এই ত্রাহি মধুসূদন অবস্থাতেও অবশ্য বিশেষ হেলদোল দেখা যাচ্ছে না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের কথাবার্তায়! দেশের মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা, রিজার্ভ ব্যাংক কিংবা অর্থ বিষয়ক সংসদীয় কমিটি এই পরিস্থিতি যথেষ্ট চিন্তার কারণ বলে মনে করলেও মোদি মনে করেন, বিশ্বের মধ্যে ভারতের অর্থনীতি তীব্র গতিতে এগিয়ে চলেছে। এ জন্য গর্ব করা উচিত! আর কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর আশ্বাস, আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েও ভারতের অর্থনীতির গতি বজায় থাকবে। 

Advertisement

প্রধানমন্ত্রী-অর্থমন্ত্রীর দাবি যাই হোক, একবার বাস্তব পরিস্থিতির দিকে চোখ ফেরানো যাক। ‘দেশের আর্থিক অবস্থা’ পর্যালোচনা করতে গত বৃহস্পতিবার অর্থ বিষয়ক সংসদীয় কমিটি বৈঠকে বসেছিল। সেখানে সরকার পক্ষ জানায়, খুচরো বাজারে এপ্রিল মাসে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে তিন শতাংশ। পাইকারিতে ৮.৩ শতাংশ। ভবিষ্যতে মূল্যবৃদ্ধি আরও হতে পারে। ডলারের তুলনায় টাকার দাম গত কয়েকমাসে পড়েছে ৪.৯ শতাংশ। ভারতের বাজার থেকে ২৩.৬ বিলিয়ন ডলার পুঁজি তুলে নিয়েছে বিদেশি সংস্থাগুলি। রিজার্ভ ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবর্ষে সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির হার বেড়ে হবে ৫.১ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে (৪ শতাংশ) অনেকটা বেশি। আবার স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মতে, আমেরিকা-ইরানের যুদ্ধের কারণে মে মাস থেকে আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ টের পাওয়া যাচ্ছে। এপ্রিলে এই হার ছিল ৬.৩৪ শতাংশ। মে মাসে তা বেড়ে হয়েছে ৭.৩ শতাংশ। ভারতে শুধুমাত্র জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে মূল্যবৃদ্ধির হার বেড়ে যেতে পারে ০.৪ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের হল, শুধু মার্কিন ডলার নয়, ভারতীয় মুদ্রার দামেও এখন বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের নিজস্ব মুদ্রার নিরিখে পতন ঘটেছে। শোনা যাচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির লোকসান কমাতে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। এই বাস্তব পরিস্থিতির কথা প্রধানমন্ত্রী বা অর্থমন্ত্রী স্বীকার না করলেও প্রায় সব মহল থেকেই দাবি করা হয়েছে, চলতি অর্থবর্ষে দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হার নাকি কমবে। ২০২৪-২৫ সালে আর্থিক বৃদ্ধির হার ছিল ৭.১ শতাংশ। প্রত্যাশা ছাপিয়ে ২০২৫-২৬-এ বৃদ্ধির মাত্রা ছোঁয় ৭.৭ শতাংশ। কিন্তু সরকারের অর্থ উপদেষ্টার মতে, বাস্তব পরিস্থিতির কারণে চলতি অর্থবর্ষের শেষে বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের নীচে নেমে যেতে পারে। একইভাবে রিজার্ভ ব্যাংক আগে জানিয়েছিল, চলতি বছরে আর্থিক বৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে ৬.৯ শতাংশ। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারাই এখন মনে করছে, বৃদ্ধির হার ৬.৬ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। এই পরিস্থিতিতে দেশের সর্বোচ্চ ব্যাংক রেপো রেট এখন এক রাখলেও আগস্টের পর্যালোচনায় তা বাড়তে পারে। 
কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষকর্তাদের অবশ্য এসব দেখায় মন নেই! তাঁরা বরং লোকসভার আসন বাড়িয়ে কী করে আগামী দিনে বিজেপির গদি নিশ্চিত রাখা যায়, সেই খেলায় মগ্ন। এমনিতে বেহাল অর্থনীতি, মুদ্রাস্ফীতি, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষিতে সংকট, বেকারত্বের মতো বহুবিধ সাঁড়াশি চাপে নাজেহাল মোদি সরকারের জনপ্রিয়তার গ্রাফ পড়তির দিকে। এই অবস্থায় সংখ্যায় হিসাব নিকাশ করে একমাত্র লোকসভার আসন বাড়িয়ে জেতার চেষ্টা করছে বিজেপি। এই আসন বৃদ্ধির সম্ভাবনা মূলত উত্তর ভারত বা গোবলয়ে, যেখানে বিজেপির শক্তি বেশি। কিন্তু আসন বাড়াতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এ জন্য সংসদের উভয়কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন। কিন্তু বিজেপি তথা এনডিএ-র তা নেই। অগত্যা ভরসা সেই ‘অপারেশন লোটাস’। অর্থাৎ দল ভাঙানোর পুরানো খেলা। অভিযোগ, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের দুই প্রভাবশালী দল ডিএমকে এবং তৃণমূল সদ্য ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় ওই দুই দলের সাংসদদের ‘টার্গেট’ করতে শুরু করেছে বিজেপি। ‘অস্ত্র’ সেই এজেন্সির ভয় দেখানো অথবা কোনো লোভনীয় প্রস্তাব। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এই খেলায় যথেষ্ট হাত পাকিয়েছে বিজেপি। অতএব এবার যে তারা সফল হবে না— তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কুর্সি টিকিয়ে রাখতে এই ভাঙা-গড়ার খেলাই এখন গেরুয়া শিবিরের ‘পাখির চোখ’। কারণ ২০২৯-এ নির্বাচন। জনপ্রিয়তা কমতে থাকায় নিজেদের বাঁচার ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে তবেই না দেশ, দেশের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে ভাবনার প্রশ্ন আসবে। আর্থিক বৃদ্ধির প্রচার তাই বক্তৃতায় থাক, বাস্তবে নাই বা থাকল! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ