লক্ষ্য একটাই—নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষা। তার জন্য পথে নেমেছেন ভারতের যুবসমাজ। জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সেই আন্দোলন আজ এক বিশাল রূপ নিয়েছে। সরকার ভেবেছিল, যন্তরমন্তরে শুরু হওয়া এই আন্দোলন আটকে থাকবে দিল্লির চৌহদ্দিতে। কিছুদিন পর, সময়ের নিয়ম মেনে সেখানেই তার ইতি ঘটবে। বাস্তবে দেখা গেল, অঙ্ক মেলেনি। উলটে সেই ক্ষোভের আগুন আজ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে দেশের একাধিক রাজ্যে। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র নেতৃত্বে যে প্রতিবাদের সূচনা হয়েছিল, তা
আজ আর নির্দিষ্ট কোনো দলের গণ্ডিতে আটকে নেই। দল-মত পেরিয়ে তা সমগ্র দেশের যুবসমাজের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহে পরিণত হয়েছে। আমেদাবাদ থেকে সুরাত, পাটনা থেকে হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু থেকে জয়পুর, দেরাদুন থেকে গুয়াহাটি—সর্বত্র আজ প্রতিবাদীদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ দেখা যাচ্ছে। পাটনার রাজপথে পুলিশি লাঠিচার্জ, জলকামান ও কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহারের মধ্যেও আন্দোলনকারীরা পিছু হটতে নারাজ। আন্দোলনে মানুষের ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’ দেখে কলকাতাতেও কর্মসূচির ডাক দিতে চলেছে সিজেপি।
গত ১২ বছরের একচ্ছত্র ও দাপুটে রাজত্বের পর নরেন্দ্র মোদি সরকার এই প্রথম প্রবল রাজনৈতিক চাপের মুখে। যন্তরমন্তরে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলন দমনে সরকারের তরফ থেকে কোনো রাখঢাক রাখা হয়নি। আন্দোলনকারীদের হটাতে দিল্লির রাজপথে পুলিশি দমনপীড়ন চরম আকার ধারণ করেছে, যা অমানবিক। সংসদ অভিযান চলাকালীন পুলিশের লাঠিচার্জের পাশাপাশি দেদার কাঁদানে গ্যাসের শেল ফেটেছে। এমনকি পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ২৫ বছরের তরুণ শেখ ইরশাদ মনসুরির মতো আন্দোলনকারীদের শরীর ও মুখের ক্ষত আজ এই দমনপীড়নের নির্মম সত্যকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, পাটনায় লোক ভবন অভিযানে ছাত্র-পড়ুয়াদের উপর পুলিশের দমনপীড়ন পরিস্থিতিকে আরও অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে। আইসা, এসএফআই থেকে শুরু করে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ক্ষোভ আজ এক সুতোয় বাঁধা পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মরিয়া কেন্দ্র। আর সেই সময়ে সরকার পক্ষের অস্বস্তি বাড়িয়েছে তাদের আদর্শগত অভিভাবক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)। সঙ্ঘের স্পষ্ট বার্তা, দিল্লির পুলিশ যেভাবে
রণংদেহি ভঙ্গিতে পড়ুয়াদের উপর চড়াও হয়েছে, তা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। সরকারের উচিত ছিল অনেক আগেই আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করা। অন্যদিকে, সংসদের অন্দরেও বিরোধী দলগুলির আক্রমণ সরকারের পথ কঠিন করে তুলেছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ও মহাজোট ইন্ডিয়ার অন্যান্য নেতারা সরাসরি শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণ এবং ছাত্রদের উপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে সরব হয়েছেন। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে থেকে শুরু করে সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব—সকলেই একসুরে জানিয়ে দিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা না হওয়া পর্যন্ত লড়াই থামবে না। এই তীব্র চাপের মুখে পড়ে অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে কেন্দ্র। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝেই সরকারের বোধোদয় হল অনেক দেরিতে! প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ‘ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট’ গঠনের ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি, সংসদীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানিয়েছেন, নিট প্রশ্নফাঁস নিয়ে সংসদে দীর্ঘ আলোচনায় প্রস্তুত সরকার। বিরোধীরা যেন কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই আলোচনার সময়সূচি নির্ধারণ করে। কিন্তু আন্দোলনরত সিজেপি এবং বিরোধী দলগুলির অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট—আগে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, তবেই অন্য কোনো কথা। সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দিপকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যতদিন না শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করছেন, ততদিন এই আন্দোলন চলবে।
আজকের এই যুব আন্দোলন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা আসলে গোটা দেশের কোটি কোটি বেকারের পুঞ্জীভূত হতাশার বহিঃপ্রকাশ। নেপাল বা বাংলাদেশের মতো কোনো নৈরাজ্য বা হিংসাত্মক পথ নয়, বরং গান্ধীজির অহিংসার পথ ধরে অনশন ও অবস্থানের মাধ্যমেই নিজেদের অধিকার আদায় করতে চাইছে দেশের নতুন প্রজন্ম। যন্তরমন্তরের ফুটপাত থেকে শুরু করে সুরাত কিংবা মুম্বইয়ের আজাদ ময়দান—সর্বত্রই আজ একই স্লোগান ধ্বনিত হচ্ছে। ১২ বছরের ক্ষমতার দম্ভকে গুঁড়িয়ে দিয়ে এই তরুণ প্রজন্ম প্রমাণ করে দিয়েছে যে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দিন এবার শেষ। সরকারের গদি আজ সত্যিই কাঁপছে, আর সেই কম্পন অনুভূত হচ্ছে দিল্লির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে দেশের প্রতিটি কোণায়।