স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী: ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। সাধারণত এরকম পরিবারের ছেলেরা কলেজ পাস করে চাকরি-বাকরির চেষ্টা করে। পয়সা রোজগারের তাগিদ থাকে তাদের। একটা চাকরি পেয়ে গেলেই লাইফ সেটলড। তারপর বিয়ে, সন্তান উৎপাদন, তাকে মানুষ করা, গিন্নির জন্য সোনার গয়না কেনা, মাথাগোঁজার একটা ঠাঁই তৈরি করা, চাকরি থেকে অবসর...সুগার, প্রেশার। একেবারে ছকে বাঁধা গড়পড়তা জীবন। তাঁরও শুরুটা এরকমই হয়েছিল। পোর্ট ট্রাস্টে কেরানির একটা চাকরি জুটিয়ে ফেলেছিলেন মামার সুপারিশে। প্রেমও করতেন। বিয়েও হয় যথাসময়ে। কিন্তু তারপরেই ছকটা ভাঙতে শুরু করল। একটু একটু করে। মাথায় অভিনয়ের পোকাটা ঢুকে গিয়েছিল সেই ছোটো বয়সেই। পড়া ফেলে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে বাবা-কাকাদের রিহার্সাল দেখতেন। ধরাও পড়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাতে ভালোই হয়েছিল। যে আগলটা ছিল তা ভেঙে গিয়েছিল। সেই যে অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসাটা জন্মাল, তা আর সারাজীবনে ছেড়ে গেল না তাঁকে। কিন্তু শুধু ভালোবাসা থাকলেই তো হয় না। তার সঙ্গে থাকতে হয় জেদ, লড়াই করার মতো মানসিক শক্তি, পরিশ্রম করার ক্ষমতা, আর প্রতিভা। তাঁর ছিল। মানসিক শক্তিটা জুগিয়েছিলেন মা আর স্ত্রী। তাই তো চাকরিটা বাজি রেখে পেশাদার অভিনেতা হওয়ার দৌড়ে শামিল হতে পেরেছিলেন। বাকিটা তাঁর একার লড়াই। বাধার পাহাড় ঠেলে ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ থেকে হয়ে উঠতে পেরেছিলেন মহানায়ক।
হ্যাঁ, বাংলার কিংবদন্তি অভিনেতা উত্তমকুমারের কথাই বলছি। আজ ২৪ জুলাই তাঁর মৃত্যুদিন। ১৯৮০ সালের এই দিনটিতেই অকালপ্রয়াণ হয়েছিল তাঁর। মাত্র ৫৩ বছর বয়স হয়েছিল। বেঁচে থাকলে আরও কত মণিমুক্তো উপহার দিতে পারতেন তিনি বাংলা ছবির দর্শকদের! সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় চেয়েছিলেন স্যর লরেন্স অলিভিয়র ও মাইকেল কেন অভিনীত ‘স্ল্যুথ’ ছবিটি বাংলায় করবেন উত্তমকে নিয়ে। সে ছবি হল না। শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় চেয়েছিলেন পরবর্তীকালে ‘শত্রু’ নামে বিখ্যাত ছবিটি উত্তমকুমারকে নিয়ে করতে। সেও তো হল না! এমনই আরও কত পরিকল্পনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছে তাঁর অকাল প্রয়াণে। বাংলার দর্শক বঞ্চিত হয়েছে সেই ছাপোষা বাড়ির ছেলেটির অভিনয় প্রতিভার বিচ্ছুরণ থেকে। তবে যা পাওয়া গিয়েছে তাঁর থেকে, তাই বা কম কী! ‘নায়ক’ ছবিতে উত্তমের অভিনয় নিয়ে তো উচ্ছ্বসিত ছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। কিন্তু অত অল্প বয়সে মৃত্যু তাঁর থেকে আরও প্রাপ্যগুলো বুঝে নিতে দিল না বাংলার দর্শককে। আবার এটাও ঠিক যে, কম বয়সে মৃত্যু এসে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়েছিল বলেই এত আলোচনা। তিনি আজও কিংবদন্তি হয়ে বেঁচে রয়েছেন। তাঁকে ঘিরে জন্ম নিয়েছে অজস্র গল্পকথার। যার কিছুটা বাস্তব, অনেকগুলিই স্রেফ মনগড়া। যখন কেউ কিংবদন্তি হয়ে যান, তখন এরকমই হয়। যে মানুষটাকে ঘিরে থাকে রহস্য, সেই মানুষটাই হয়ে ওঠে চর্চার বিষয়। উত্তমকুমারের সান্নিধ্য, সাক্ষাৎ চট করে পেতেন না সাধারণ মানুষ। তাই তাঁদের মধ্যে জন্ম নিত কৌতূহল— সত্যিই কি উত্তম ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাতেন? তাঁর ঠোঁটটা কি মোটা? নাকটা কি থ্যাবড়া? বাস্তবেও কি সুচিত্রার সঙ্গে উত্তমের প্রেম ছিল? গৌরী দেবীর সঙ্গে উত্তমের কী নিয়ে অশান্তি হয়েছিল? কেন তিনি ঘর ছেড়ে সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে থাকতেন? এমন অজস্র প্রশ্ন ঘোরাফেরা করত মানুষের মনে। আলোচনা হত মহিলাদের ঘরোয়া আড্ডায়। পুরুষদের চায়ের দোকানের গুলতানিতে। এসবই উত্তমকুমারকে আরও রহস্যময়, আরও কৌতূহলের বিষয় করে তুলেছিল। তবে হ্যাঁ, তাঁর অনিন্দ্যকান্তি আর ভুবন ভোলানো হাসি যে মহিলা পুরুষ নির্বিশেষ সবাইকে মোহিত করত তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মহিলাদের কথা বাদ দিন, খোদ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, তিনি পুরুষ হয়েও ওই হাসির প্রেমে পড়েছিলেন। সৌন্দর্য, হাসি, অভিনয় ক্ষমতা, ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা, সবমিলিয়ে উত্তকুমারকে রহস্যের একটা স্বচ্ছ চাদর সবসময় জড়িয়ে থাকত। সবকিছু দেখা গেলেও একটা আবডাল যেন থেকে যেত। যা তার আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিত। কেমন ছিল তাঁর আকর্ষণ? সেটা ১৯৫৬ সালের কথা। উত্তম ‘হারানো সুর’ ছবির শ্যুটিংয়ে বেরচ্ছেন। এমন সময় গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে এক ভদ্রলোক তাঁর দোরে এসে হাজির। উত্তম বেরতেই ভদ্রলোক বললেন, আপনিই তো উত্তমকুমার? মহানায়ক বললেন, হ্যাঁ। ভদ্রলোক এবার কান্নায় ভেঙে পড়ে যা বললেন তার মর্মার্থ হল, চারদিন আগে তাঁর স্ত্রী উত্তমকুমারের সঙ্গে দেখা করবেন বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন, আজও ফেরেননি। সেদিন উত্তম বেশ লজ্জায় পড়েছিলেন। তাঁর এ কথাও মনে হয়েছিল যে, এই কি জনপ্রিয়তা! শোনা যায় একবার তাঁর পছন্দের রান্না সুপ্রিয়া দেবী করে দেননি বলে উত্তমকুমার রাগ করে বাড়ির পোশাকেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিলেন। ফুটপাত দিয়ে তিনি হাঁটছিলেন আর তাঁর পিছনে ধীরে ধীরে লোক জমছিল। যেন একটা বাঘ ছাড়া পেয়ে কলকাতার রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে আর মানুষ ভয়ে তাঁর সামনেও যেতে পারছে না আবার দেখার লোভও ছাড়তে পারছে না। এদিকে সুপ্রিয়া দেবী খালি পায়ে উত্তমের পিছন পিছন প্রায় ছুটছেন তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে। শেষে ঘটনাটা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, পুলিশকে এসে মহানায়ককে উদ্ধার করে বাড়ি ফেরাতে হয়। আরও আগের একটা ঘটনা। স্টার থিয়েটারে ‘শ্যামলী’ নাটকের শোয়ের পর গ্রিন রুমে বসে মেকআপ তুলছেন, এমন সময় কেউ এসে খবর দিল যে, এক ভদ্রমহিলা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। উত্তম উঠে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। দেখলেন ভদ্র পরিবারের এক গৃহবধূ। কিন্তু তিনি যা বললেন, তাতে উত্তমের আক্কেল গুডুম হওয়ার উপক্রম। ওই মহিলা জানালেন, কৃষ্ণনগরে উত্তমরা ‘সবার উপরে’ ছবির শ্যুটিং সেরে যখন ফিরছিলেন তখন তিনি গাড়িতে তাঁদের পিছু নিয়েছিলেন। স্টারে টিকিট কেটে ‘শ্যামলী’ দেখেছেন। এখন তাঁর বক্তব্য, তিনি আর বাড়ি ফিরবেন না। উত্তমের সঙ্গেই থাকতে চান। সেদিন অনেক কষ্টে ভদ্রমহিলাকে বুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়েছিলেন তিনি। এসবই সত্যি ঘটনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর সঙ্গে মিশেছে অতিকথন, তৈরি হয়েছে গল্প। সেসব গল্প অনেক সময়েই শালীনতার মাত্রা অতিক্রম করেছে।
উত্তমের জীবন ছিল অনকটাই যেন শেক্সপিয়রের ট্র্যাজেডির নায়কের মতো। বিরাট উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েও সামান্য কিছু ভুল সিদ্ধান্তের জেরে চরম মানসিক হতাশা আর টানাপোড়েনের শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। তাঁর মৃত্যু পরবর্তীকালে অনেকেই বলেছেন, একটা সময়ে উত্তম কানে দেখতেন। অর্থাৎ লোকে তাঁকে যা বলত তাই বিশ্বাস করে নিতেন। ক্ষমতার একটা পর্যায়ে পৌঁছলে অনেকেরই এরকম হয়। উত্তম তার ব্যতিক্রম হতে পারেননি। হিন্দি ছবির জগতে ভুল ভাবে, ভুল সময়ে পদার্পণ, একাধিকবার রাজ কাপুরের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, সংসার জীবনের একাধিক ভুল সিদ্ধান্ত নিতে তাঁকে প্ররোচিত করেছিলেন তাঁরই স্তাবকরা। নিজের সেসব ভুল তিনি বুঝতে পেরেছিলেন অনেক পরে। তখনই তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু মন্টু বন্দ্যোপাধ্যায়কে সখেদে বলেছিলেন, কাউকে অভিশাপ দিতে হলে বলো, পরের জন্মে উত্তমকুমার হয়ে জন্মাতে। উত্তমের মৃত্যুর পর তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী কানন দেবী বলেছিলেন, উত্তম সবই পেয়েছিল, শুধু ভালো বন্ধু পায়নি। এসবই শেক্সপিয়ারিয়ান ট্র্যাজেডির বৈশিষ্ট্য। যা মানুষকে এক অদ্ভুত রসাস্বাদন করায়।
সেই কারণেই আম জনতার মধ্যে উত্তমকুমার নিয়ে কৌতূহল ছিল মাত্রাছাড়া। উত্তমকুমার এবং আমাদের দুর্ভাগ্য, যে মানুষটি শুধুমাত্র তাঁর অভিনয় দক্ষতার জন্যই মানুষের মনে চিরস্থায়ী হয়ে থাকতে পারতেন। ভাবতে খারাপ লাগে যে, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি নিয়েও আলোচনা হয়। হয়তো জনপ্রিয় মানুষদের জীবনের অভিশাপ এটাই। সেই জন্যেই তাঁকে নিয়ে এত গল্পগাছার ছড়াছড়ি। সেই কারণেই তিনি কিংবদন্তি। মৃত্যুর ৪৬ বছর পরও সজীব মানুষের মনে। হয়তো আরও একশো বছর তিনি বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে।