মৃণালকান্তি দাস: ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদ দেখে যতটা ‘শান্তি’ অনুভূতি হয়, বাস্তবে ততটা নয়। বিশ্বনেতারা যখন শেষবার এই প্রাসাদ ছেড়েছিলেন, তখন গোটা দুনিয়াকে আশ্বস্ত করেছিলেন, তাঁরা বিশ্ব সংঘাতের অবসান ঘটাতে পেরেছেন। কিন্তু তাঁদের সেই শান্তির বার্তা টিকেছিল মাত্র ২০ বছর, যা পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ নেয়। ঠিক একইভাবে, একই প্রাসাদে গত ১৭ জুন ইরানের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) টিকেছিল মাত্র তিন সপ্তাহ।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বের সব বাণিজ্যিক জাহাজকে তাদের ‘ইঞ্জিন চালু করার’ বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু এর ঠিক তিন সপ্তাহ পর, আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে মিত্র দেশগুলির নেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেন— যুদ্ধবিরতি শেষ। কারণ, ইরান তাদের নির্ধারিত রুট অনুসরণ করতে অস্বীকার করা জাহাজগুলির উপর পুনরায় হামলা শুরু করেছে। এই সমঝোতা স্মারকটি কোনো পক্ষের অসততার কারণে ব্যর্থ হয়নি। আসলে ইরান যুদ্ধের মূল কেন্দ্রে থাকা বিরোধটি এখনও অমীমাংসিত। ইরান বিশ্বাস করে, এই জলপথ বন্ধ করার মাধ্যমে তারা হরমুজ প্রণালী পরিচালনা এবং সেখান দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের উপর টোল বা শুল্ক আদায়ের বৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্যদিকে, আমেরিকা বলছে, হরমুজকে একটি মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে রাখতে হবে। আর দুই পক্ষের কারো কাছেই অন্য পক্ষকে নিজের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করার কোনো উপায় আপাতত নেই।
হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজগুলিকে সুরক্ষা দিতে মার্কিন নৌবাহিনীর ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ থেকে শুরু করে এই সমঝোতা স্মারক পর্যন্ত সব উদ্যোগের ব্যর্থতার পিছনের কারণ আমেরিকার দ্বিধা বা ইরানের অসততা নয়। বরং এর পিছনে রয়েছে এমন এক ভৌগোলিক বাস্তবতা, যা কূটনীতি বা সামরিক শক্তি— কোনো কিছু দিয়েই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। হরমুজ প্রণালীর উত্তরের সম্পূর্ণ উপকূলরেখা ইরানের নিয়ন্ত্রণে। এর অর্থ, ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজও বন্দর ছেড়ে না এসে কেবল উপকূলীয় মিসাইল ঘাঁটি, সশস্ত্র স্পিডবোট এবং হাজার হাজার মাইনের মাধ্যমে এই প্রণালী দিয়ে পার হওয়া যেকোনো জাহাজের উপর আঘাত হানতে পারে। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এই প্রণালী ফের খুলে দিতে চাইলে— যেকোনো শক্তিকে প্রথমে এই উপকূলরেখার নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে। যার অর্থ স্থলপথে ইরানকে পরাজিত করা। ফলে একটি নৌ-অভিযান মুহূর্তেই অত্যন্ত ব্যয়বহুল এক স্থলযুদ্ধে পরিণত হবে। বিশ্ব চাইলেই এই সমস্যাকে এড়িয়ে বিকল্প কোনো পথ বেছে নিতে পারবে না। এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং এই অঞ্চলের উৎপাদিত প্রায় সমস্ত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয়। প্রণালীটি এড়িয়ে জ্বালানিপণ্য রপ্তানির জন্য যে বাইপাস রয়েছে, তা বড়োজোর এই পরিমাণের এক-চতুর্থাংশ বহন করতে পারে।
পারস্য উপসাগর থেকে উন্মুক্ত মহাসাগরে বের হওয়ার একমাত্র সমুদ্র পথ এই হরমুজ প্রণালী। এখানে জাহাজ চলাচলের লেন দু’টি মাত্র ২ মাইল চওড়া, যা মাঝখানে আরও একটি ২ মাইলের বাফার জোন দ্বারা বিভক্ত। এই প্রণালীটিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার কারণ এর কোনো বিকল্প রুট নেই। কেবল সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (ইউএই) কিছু অপরিশোধিত তেলের পাইপলাইন রয়েছে, যা এই প্রণালীকে বাইপাস করে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর হিসাব অনুযায়ী, সমুদ্রপথে যাতায়াত করা ২ কোটি ব্যারেল তেলের বিপরীতে এই পাইপলাইনগুলির সম্মিলিত ধারণক্ষমতা মাত্র ৩৫ থেকে ৫৫ লাখ ব্যারেল। এই বিকল্প রুটকেও ধ্বংস করে দিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইতিমধ্যে সৌদি আরবের আবকাইক-ইয়ানবু পাইপলাইনে আঘাত হেনেছে এবং ইরানি ড্রোন আমিরশাহির ফুজাইরাহ বন্দরে হামলা চালিয়েছে— যে বন্দরটি মূলত হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে রপ্তানি বাণিজ্যের জন্যই তৈরি
করা হয়েছিল।
ভূরাজনৈতিকভাবে ইরানের অবস্থানকে যা সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে, তা তাদের নৌবাহিনী নয়, বরং তাদের ভৌগোলিক উপকূলরেখা। প্রণালীর ঠিক মুখোমুখি ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত বন্দর আব্বাস মূলত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর প্রধান কার্যালয় এবং লজিস্টিক হাব, যেখান থেকে ইরান হরমুজে শক্তি প্রদর্শন করে। এর পাশাপাশি রয়েছে কেশম, হরমুজ এবং লারাক দ্বীপপুঞ্জ, যার প্রতিটিই ইরানের ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে। তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলি যখন এই করিডর দিয়ে যাওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত থাকে, ঠিক তখনই এই দ্বীপগুলি থেকে ইরান খুব সহজে নজরদারি করতে পারে ও তাদের উপর আঘাত হানতে পারে। এই ঘাঁটিগুলি থেকে উপকূল-ভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে গোটা প্রণালী কভার করা সম্ভব। এসব ঘাঁটি থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সশস্ত্র স্পিডবোট হরমুজে মোতায়েন করা যায় এবং প্রয়োজনমতো মাইন বিছানো যায়। সম্মুখ সমরে জয়ী হতে ইরানের কোনো প্রথাগত নৌযুদ্ধে জেতার প্রয়োজন নেই। তারা শুধু জাহাজ চলাচলের ট্রানজিট খরচ এতটাই বাড়িয়ে দিতে পারে, যাতে আন্তর্জাতিক বিমা বাজার এই রুটে কোনো জাহাজকে বিমা সুবিধা দেওয়ার ঝুঁকি না নিতে পারে। ইতিমধ্যে প্রধান সামুদ্রিক বিমা সংস্থাগুলি গোটা পারস্য উপসাগরে তাদের যুদ্ধ-ঝুঁকি বিমা সুবিধা স্থগিত করেছে বা প্রিমিয়ামের হার আকাশচুম্বী করেছে। ফলে প্রণালীটি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরেও তা স্বাভাবিকের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশে ফিরে এসেছিল।
মার্চ মাসের শুরুতে ইরান যখন প্রণালীটি বন্ধ করে দেয়, তখন তারা ‘নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার ব্যবস্থা’ চালু করে। এর ফলে ইরানের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের ভূরাজনৈতিক বন্ধুত্বের উপর ভিত্তি করে তাদের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছিল। যেসব জাহাজ এই প্রণালী পার হতে চেয়েছিল, তাদের কার্গোর বিবরণ, ক্রু বা নাবিকদের তালিকা এবং গন্তব্যের তথ্য আইআরজিসি-অনুমোদিত মধ্যস্থতাকারীদের কাছে জমাও দিতে হয়। এরপর একটি বিশেষ ক্লিয়ারেন্স কোড পাওয়ার পর জাহাজগুলিকে ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে এসকর্ট বা পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হত। যেসব দেশ তেহরানের সঙ্গে সরাসরি বা কূটনৈতিক আলোচনা করেছে, তারা যাতায়াতের সুবিধা পেয়েছে। যেমন চীন, রাশিয়া, ভারত, ইরাক, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, তুরস্ক এবং ফিলিপাইনের জাহাজগুলি এই অবরোধের পরও বিভিন্ন সময়ে এই প্রণালী পার হতে পেরেছে। অন্যদিকে, পশ্চিমের দেশগুলির জাহাজগুলি অবরুদ্ধ রয়ে গিয়েছে। তাদের মধ্যে দু’টি জাহাজকে প্রতিটি ক্রসিং বা পারাপারের জন্য চীনের মুদ্রা বা ইউয়ানে ২০ লাখ ডলার সমপরিমাণ অর্থ টোল হিসেবে পরিশোধ করতে হয়েছে। এমনকি ইরানের পার্লামেন্ট এখন এই ব্যবস্থাকে একটি আনুষ্ঠানিক রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে আইনি রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। এই ভবিষ্যতের কৌশলগত প্রভাব অত্যন্ত গভীর এবং বিশ্বজুড়ে এর প্রকৃত মূল্যায়ন
করা হয়নি।
‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর উদ্দেশ্য ছিল এই সামরিক অচলাবস্থা ভেঙে দেওয়া। এক রবিবারে এই অভিযান শুরু হয়েছিল, কিন্তু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে দু’দিনের মধ্যেই তা স্থগিত করতে হয়। কারণ, সৌদি আরব তাদের দেশে মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি সাময়িকভাবে স্থগিত করে এবং কুয়েত তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। এই অভিযানের জন্য যে আঞ্চলিক জোটের প্রয়োজন ছিল, তা শেষ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। এমনকি আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র– জার্মানি, স্পেন, ইতালি, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান— সবাই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ট্রাম্পের যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
কোনো মিত্র জোট পাশে না থাকায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যখন স্পষ্টভাবেই স্থল সেনা মোতায়েনের বিষয়টি খারিজ করে দেন, তখন ইরানের উপকূলরেখা দখল করার একমাত্র সামরিক বিকল্প স্থল অভিযান বাদ পড়ে যায়। ফলে আকাশপথে সামরিক শক্তি প্রয়োগ কেবল সংঘাতের তীব্রতাই বাড়াচ্ছে, কোনো সমাধান আনছে না। সংবাদসংস্থা দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট-এর কলামিস্ট ওয়াসায় মীরের মতো বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুই পক্ষকেই আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে যেতে হবে এবং সেই চুক্তির শর্তগুলিতে এই বাস্তবতার প্রতিফলন থাকবে যে, উপকূলরেখাটি এখনও ইরানের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
ওয়াশিংটনকে দ্রুত বুঝতে হবে, ওই যুদ্ধের পরিণতি দীর্ঘকাল ধরে বিশ্ব অর্থনীতিকে ধাক্কা দেবে— এমনকি হরমুজ থেকে শেষ মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি দেশে ফিরে যাওয়ার বহু বছর পরও।