Bartaman Logo
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

‘ভরসা’র বাংলায় কতই রঙ্গ!

চিত্রনাট্য হুবহু এক। সেই রাতের আলো-আঁধারি, ‘লাল চুল কানে দুল’ বাইকবাহিনী লাঠি-হকি স্টিক, উইকেট, উৎকট চিৎকার, অশ্রাব্য ভাষার আস্ফালন, জয় করার বিকৃত উল্লাস, শুধু কুশীলবদের চেহারা ও চরিত্রগুলো বদলে গিয়েছে!

‘ভরসা’র বাংলায় কতই রঙ্গ!
  • ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

চিত্রনাট্য হুবহু এক। সেই রাতের আলো-আঁধারি, ‘লাল চুল কানে দুল’ বাইকবাহিনী লাঠি-হকি স্টিক, উইকেট, উৎকট চিৎকার, অশ্রাব্য ভাষার আস্ফালন, জয় করার বিকৃত উল্লাস, শুধু কুশীলবদের চেহারা ও চরিত্রগুলো বদলে গিয়েছে! দেড় দশক আগে ২০১১ সালে যেদিন চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে তৃণমূলের শাসন প্রতিষ্ঠিত হল, সেদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্লোগান ছিল, ‘বদলা নয়, বদল চাই’। তখন রাজ্যে বিজেপি কার্যত সাইনবোর্ড সর্বস্ব একটি দল। অতএব তখন স্লোগানের ভাষা রাতারাতি বদলে বদলার শিকার হল বামেরা। খুন, হামলা, পার্টি অফিস ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দেওয়া। মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, পাড়া ছাড়া করা, বাদ গেল না কিছুই। এই ‘নিধন’ পর্বের কাজ মোটামুটি সমাপ্ত করে তৎকালীন শাসকের চোখ পড়ল রাজ্যের নতুন বিরোধী শক্তি বিজেপির উপর। ইতিহাস বলছে, ২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনের টানটান উত্তেজনার ম্যাচে বিজেপিকে পর্যুদস্ত করার পর নতুন ‘শত্রু’ হিসাবে উঠে আসা সেই পদ্মশিবিরকে পাখির চোখ করল শাসক দল। অভিযোগ, তারপরের পাঁচ বছরে শুধু বিজেপিরই কয়েকশো কর্মী খুন হয়েছে তৎকালীন শাসকের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদতে। দেখা গেল, সেই ‘অত্যাচারী’ তৃণমূল সরকার ৪ মে অতীত হয়ে গেলেও পরিস্থিতি প্রায় একই আছে। শাসকের চরিত্র বদলায়নি। ক্ষমতায় আসতে রাজ্যের নতুন শাসক বিজেপির স্লোগান ছিল, ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’। কিন্তু গত সাড়ে চার মাসের নতুন সরকার ও শাসকদল প্রথম থেকেই বুঝিয়ে দিচ্ছে, তাদের জমানায় রাজ্যে বিরোধীদের কোনো অস্তিত্ব তারা পছন্দ করছে না। আগের ট্র্যাডিশন মেনে নতুন রণসাজে হাজির শাসকদলের মদতপুষ্টরা! ভরসার বদলে ভয় ক্রমশ জাঁকিয়ে বসছে!

Advertisement

কৌশল পরিষ্কার। ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে মমতার দলের ভরাডুবি হলেও তাদের ঝুলিতে ছিল ৮০টি আসন। অতএব মাছ শিকারে বেরিয়ে বিড়াল শুরুতেই সিংহভাগ তৃণমূল সাংসদ-বিধায়ককে প্রায় পকেটে পুরে নিয়েছে। শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের লোকদেখানো হুংকার সত্ত্বেও গ্রাম-শহরের বিভিন্ন মহল্লায় বিজেপির ‘তৃণমূলীকরণ’ প্রায় সমাপ্ত হয়েছে। বাকি যাঁরা বাইরে থেকে গিয়েছেন গোড়ার দিকে তাঁদের লক্ষ্য করে ডিম ছুড়ে শাসকের ক্ষমতা বোঝানো হয়। মুখে বলা হয়, এসব বিজেপি সমর্থন করে না। বলা বাহুল্য, এরপর শুরু হয় সরাসরি আক্রমণ। বাড়িঘর ভাঙচুর, পার্টি অফিসের উপর হামলা, এমনকি শারীরিক নির্যাতনও। এই পর্বের শুরুর দিকে ‘শূন্য থেকে এক হওয়া’ সিপিএমের বন্ধ পার্টি অফিস খুলতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেও দেখা গিয়েছিল বিজেপিকে। সৌজন্যের এই রাজনীতি দেখে অনেকেই তৃণমূল আমলের সঙ্গে বিজেপি আমলের পার্থক্য বোঝাতে ব্যস্ত হলেও তাদের ভুল ভাঙতে অবশ্য বেশি সময় লাগেনি। আসলে এ হল শাসকের দ্বিতীয় কৌশল। তৃণমূল যেমন প্রথম দফায় সিপিএম, দ্বিতীয় দফায় বিজেপিকে ‘টার্গেট’ করেছিল তাদের ওজন বুঝে। রাজ্যের নতুন শাসকদলও একই পথে এগচ্ছে। দলের বিপর্যয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মোটামুটি ‘ঘরবন্দি’। ঘরে-বাইরের চাপে বিধ্বস্ত। মমতার সঙ্গে যাঁরা আছেন, তাঁরাও নানা অজানা আশঙ্কায় আছেন। অথবা হেনস্তার শিকার হয়ে কার্যত নিভৃতবাসে। সেই সুযোগে এখন তাই বিরোধী পরিসরে উঠে আসার যে চেষ্টা করছে সিপিএম তাকে ‘সবক’ শেখাতে ময়দানে অবতীর্ণ শাসক! মেদিনীপুর, হুগলি, যাদবপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় গত এক মাসে সিপিএম-এর কয়েকশো পার্টি অফিস ভাঙা হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। লাঠিসোঁটার আক্রমণে আহত হয়েছেন অনেকে। দুর্বৃত্তদের রোষে লেনিন থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তো বটেই, এমনকি নেতাজি, রবীন্দ্রনাথের ছবিও রেহাই পায়নি। 
‘ভরসা’ তৈরির রাজ্যে বিরোধী দলের কোনো কোনো মহিলাও রেহাই পাচ্ছেন না! নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে মমতাপন্থী তৃণমূল প্রার্থী ভোটের ময়দান থেকে সরে দাঁড়ালেন! বহু পুরানো মামলায় অভিযুক্ত কংগ্রেস প্রার্থী হলেন গ্রেপ্তার। কী এমন পরিস্থিতি হল যে, রেজিনগর কেন্দ্রের এক বিরোধী প্রার্থী প্রচার করবেন না বলে জানিয়েদিলেন! শারদোৎসবের বদলে দুর্গোৎসব না লিখলে পুজোয় বামেদের বুকস্টল করতে দেওয়া হবে না বলে সরকার ও শাসকদলের শীর্ষস্তর থেকে হুঁশিয়ারিও দেওয়া হচ্ছে। গত আগস্ট মাসে মধ্যরাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে অবাধে দুষ্কৃতীদের হামলা ও আগুন লাগাতে দেখা গিয়েছে। মাত্র সাড়ে চার মাসে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে এত ঘটনার ঘনঘটা। অথচ এসবের সঙ্গে নাকি বিজেপির দূরদূরান্তেরও কোনো সম্পর্ক নেই। দাবি তেমনই। প্রায় প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রেই এ রাজ্যের শাসক দলের প্রধান চমৎকার শব্দবন্ধ শুনিয়ে চলেছেন, এসব বিজেপির সংস্কৃতি নয়। বিজেপি এরসঙ্গে যুক্ত নয়। সরকার দেখুক কারা এসব করছে। কারা করছে, কাদের মদতে করছে, ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’ থেকে ‘তছনছ’ করে দেওয়ার হুমকি কে বা কারা দিচ্ছেন—জনগণের তা নিয়ে সম্যক ধারণা থাকলেও শাসক কি অন্ধকারে! দেখে শুনে মনে হতে পারে, মদতদাতা ও হামলাকারীদের শাসক চিনতে পারছে না বলে ধরতেও পারছে না। পুলিশের কাজ কি এভাবেই ‘রাজধর্ম’ পালন করা? সন্দেহ নেই, অক্ষরে অক্ষরে সেই পবিত্র দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছে তারা! পালাবদলের বাংলায় এই হল ‘ভরসা’র দৃষ্টান্ত!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ