মার্কিন ভোটবার্তা: অনাচার করো যদি...
  • ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: কী বোঝালো আমেরিকার অন্তর্বর্তী ভোটের ফলাফল? কে হারল কে জিতল সেটা নয়। আসল কথা হল গণতন্ত্রে সর্বশক্তিমান কেউ নয়। আর গণতান্ত্রিক কাঠামো ও ঐতিহ্যে  স্বৈরাচার গ্রাস করলে পতন অবশ্যম্ভাবী। আমেরিকার শাসক কেন, যে কোনো শাসনক্ষমতার শীর্ষপদে আরোহণ করলে সর্বপ্রথম যে মনোভাব গ্রাস করে, সেটি হল আমি কি তাহলে যা ইচ্ছা করতে পারি? আমার কাজে বাধা দেওয়ার কেউ নেই যখন, তখন আর কেন সকলকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করব না? আমার সঙ্গে আছে জনাদেশ। অতএব যথেচ্ছাচারের অধিকার। কোনো কোনো ব্যক্তি পারে এই প্রবল বাসনা থেকে মুক্ত থাকতে। তাঁরা জানেন ক্ষমতা হল পদ্মপাতায় জল। প্রধানমন্ত্রিত্ব অথবা প্রেসিডেন্টশিপ পাঁচ অথবা চার বছরের মেয়াদ। বড়োজোর আবার তিনি নির্বাচিত হবেন। কিন্তু তারপর? তাই তাঁরা সতর্ক থাকেন। শাসকের বাড়াবাড়ি করেন না। 

Advertisement

আবার কোনো কোনো রাষ্ট্রপ্রধান পারেন না নিজেকে সামলাতে। সংযম, নিয়ন্ত্রণ, ইতিহাসবোধ, সৌজন্য এবং গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা, কিছুই থাকে না তাঁদের। তাঁরা মনে করেন, আমি বা আমার দল 
যা ভাবছি সেটাই ঠিক। যা করছি, সেটাই আদর্শ। এই দেশ ও বিশ্বের প্রধানশিক্ষক করে দেওয়া হয়েছে আমাকে। আমিই শেষ কথা। আমার থেকে বেশি কেউ বোঝে না। আমি নতুন দেশ অথবা নতুন পৃথিবী তৈরি করব। ভুল করেন। 
ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর ধাঁচেই আরও অনেকেই এই দ্বিতীয় মডেল অনুসরণ করেছেন। বিশ্বে এরকম একঝাঁক রাষ্ট্রপ্রধান এসেছেন এবং আসবেন হয়তো। কিন্তু এই পথ কোনোদিন জয়ী হয়নি। যে দেশগুলিতে গণতন্ত্র নেই, সেখানে অবশ্যই এখনও চলেছে এই প্রথা। কিন্তু গণতন্ত্রে একজনই সর্বশক্তিমান। গণতন্ত্র নিজে। আর সেই গণতন্ত্রের প্রধান অস্ত্র জনতা। জনতাই শেষ কথা বলে। আমেরিকাকে বিশ্বের সেরা দেশ হিসাবে আখ্যা দিয়েছিল আমেরিকা। আমেরিকা সেই বার্তায় ভেসে গিয়েছিল। আমেরিকাকে আবার গ্রেটেস্ট করে তোলা হবে বলে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেই স্বপ্ন দেখে ট্রাম্পের জয়ধ্বনি দিয়েছে জনতা। কিন্তু যখন আমেরিকা দেখল চাকরি চলে যাচ্ছে, কাজ নেই, মূল্যবৃদ্ধি মাত্রাছাড়া, জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া এবং এসবের পাশাপাশি আবার সরকার একটি অযথা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, অহেতুক সম্পদহানি, প্রাণহানি, রাজকোষের অর্থহানি ঘটাচ্ছে, তখনই সব মিলিয়ে সেই ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানের সমর্থক মার্কিন জনতাই প্রত্যাঘাত করল। হারিয়ে দিল অন্তর্বর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পকে। 
 ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি সিলেবাস তৈরি করে যাচ্ছেন। সেটি হল, সর্বোচ্চ ক্ষমতাসীন হয়ে কী কী করতে নেই। এর আগেও তিনি ঠিক এরকম মনোভাবই নিয়েছিলেন। কিন্তু এই চরম পর্যায়ে যাননি। সেবার পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু আবার জয়ী হয়েছেন। কারণ প্রতিপক্ষ ছিল সর্বশেষ নির্বাচনে দুর্বল। প্রতিপক্ষ তো এবারও যে বিরাট শক্তিশলী ছিল এমন তো নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাট দলে আর একজনও ওই স্তরের লার্জার দ্যান লাইফ ধাঁচের জনপ্রিয় নেতা নেই। তাহলে কী হল? অর্থাৎ অমেরিকার গণতন্ত্র বার্তা দিল যে, সর্বদা প্রতিপক্ষকেও প্রবল শক্তিশালী হতে হবে স্বৈরাচারীকে পরাজিত করতে এমন মোটেই নয়। বরং প্রতিপক্ষ কে সেটা বিচার্য নয়। স্বৈরাচারী কে সেটাই বিচার্য। আর তাঁকে হারাতে সামনে যে দলই থাকবে, তাদেরই ভোট দেবে জনতা। অন্তর্বর্তী নির্বাচনে ঠিক তাই হল।
আমেরিকার অন্তর্বর্তী নির্বাচন কাকে বলে? একটি সাধারণ নির্বাচনের পর জয়ী দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী চার বছরের জন্য সরকার বসার সুযোগ পান। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন চার বছরের জনাদেশ নয়। আমেরিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের ২ বছর পর আবার একটি নির্বাচন হবে। অন্তর্বর্তী। কিন্তু সেটির ফলাফল যাই হোক, সরকারের পতনের সম্ভাবনা ও ব্যবস্থা নেই। সরকার গঠনের প্রক্রিয়া মোট চার বছরের পরই হবে। কিন্তু এভাবে দু’বছরের মধ্যে আর একটি নির্বাচন করে সরকারের কর্মপ্রক্রিয়া নিয়ে জনতার মনোভাব কী তার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন পাওয়া যায়। সেই সরকার পরবর্তী দু’বছর শাসন চালাতেই পারে। কিন্তু অন্তর্বর্তী নির্বাচনের ফলাফল সেই সরকারকে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ পরাজিত হলে তাকে আবার নতুন করে ভাবা ও করার সময় দেওয়া হয় যে, তোমাকে আর জনতা চাইছে না। তোমার কাজে জনগণ বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ। অতএব এখনও সময় আছে সংশোধন করো নিজেকে। 
আমেরিকায় বহুবার অন্তর্বর্তী নির্বাচনে শাসক দল পরাজিত হয়েছে। আধুনিক কালে আমেরিকায় মাত্র তিনজন প্রেসিডেন্ট অন্তর্বর্তী নির্বাচনে জয়ী হতে পেরেছিলেন। ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট, বিল ক্লিন্টন এবং জর্জ বুশ। আবার অন্তর্বর্তী নির্বাচনে পরাজিত হয়ে পরবর্তী মূল নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়ে ফিরে এসেছেন ক্ষমতায়, এরকম ইতিহাসও আছে। হ্যারি ট্রুম্যান, রোনাল্ড রেগন, বিল ক্লিন্টন এবং বারাক ওবামা। সুতরাং অন্তর্বর্তী নির্বাচনে পরাজিত হলেই পরবর্তী মূল নির্বাচনে সেই দল বা শাসক পরাজিত হবেই এমন নয়। সুতরাং ২০২৮ সালের পরবর্তী প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে ট্রাম্প কী ফলাফল করবেন এখনই বলা যাবে না। যদিও একথা স্পষ্ট যে, মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চ ও নিম্ন উভয়কক্ষেই ট্রাম্পের দলের এবার ভরাডুবি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী নির্বাচনের সবথেকে বড়ো বার্তা তাহলে হল, নিজেকে সর্বশক্তিমান মনে করা যে কোনো শাসকের জন্য নির্বুদ্ধিতা। নিজের জনপ্রিয়তাকে অমর ভেবে নেওয়াও চরম অপরিণতমনস্কতা। আর সর্বোপরি পারিষদবর্গ ও তোষামোদ করা পারিপার্শ্বিক থেকে শাসক সাবধান। ট্রাম্পের আশপাশে যে কর্তাব্যক্তিরা থাকেন, তাঁরা প্রত্যেকটি সিদ্ধান্তে সায় দিয়েছেন। 
দুনিয়ার বন্ধু রাষ্ট্রগুলির উপর শুল্ক সন্ত্রাস চাপিয়েছেন। আমেরিকাকে একঘরে করেছেন। ইজরায়েল নীতিকে সমর্থন করেছেন। ভারত, ইওরোপ, কানাডা সকলকে অপমান অসম্মান করেছেন লাগাতার। ইউক্রেন নামক একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ করে এনে সামনে বসিয়ে অপমান করেছেন লাইভ টেলিকাস্টে। গ্রিনল্যান্ড নামক দেশ কিনে নিতে চেয়েছেন।  এরকম প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় নিজের সরকারের কর্তাদের দিকে তাকিয়ে হয়তো প্রশ্ন করেছেন, ঠিক কি না? তাঁরা সকলেই মাথা নাড়িয়ে বলেছেন, ঠিক...ঠিক...ঠিক! 
তাঁদের এখন আর কোনো মন্তব্যই চোখে 
পড়ছে না। সবার আগে দু’বছর পর হয়তো তাঁরাই ছুটবেন ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান’ বলতে বলতে। 
গণতন্ত্রের সবথেকে বড়ো শক্তি হল, ভোট। সেই ভোট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জয়ী করেছে। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে গদিতে বসিয়েছে। আবার সেই ভোটই তাঁদের প্রায় একই সময়ে চরম বিপদসংকেত দিয়েছে সাম্প্রতিক দুই দেশের নির্বাচনে। জনতা মনে মনে অপেক্ষা করে যে কবে আসবে ভোটের দিন। সেদিন আমার একটি ভোটের শক্তি দেখাব। গণতন্ত্র এবং জনতার প্রত্যাঘাত  ভয়ঙ্কর হয়ে ফিরে আসে। তাই সাধু সাবধান! মার্কিন ভোটের ফলাফল শুধুই আমেরিকার জন্য একটি অ্যালার্ম বেল, এমন নয়। গোটা বিশ্বের সেইসব দেশের শাসকদের জন্যও ওয়ার্নিং, যাঁরা গণতন্ত্র, সংবিধান এবং অধিকার নিয়ে যথেচ্ছাচার করছেন। 
ভোটব্যাংকের রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে একটি প্রবণতা রয়েছে। তারা ভোটারদের অনেক সময় ক্রীতদাস ভাবে। অর্থাৎ ভোটারদের আবেগকে মূলধন করে লাগাতার নির্দিষ্ট কোনো ভোটব্যাংকের থেকে সমর্থন পেয়ে পেয়ে ভাবতে শুরু করে, আমি যাই করি না কেন, এই শ্রেণির ভোটাররা তো আমাকে ভোট দিয়েই যাবে। আমি যা বলব এরা তাই বলবে। চরম ভুল একটি ধারণা। আমেরিকার অন্তর্বর্তী ভোট দেখিয়ে দিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি বিগত দিনগুলিতে যে প্রদেশ অথবা অঞ্চলে বিপুল জয় পেয়েছিল লাগাতার, সেখানেও হেরে গিয়েছে। যেমন, টেক্সাস, কানসাস, আয়ওয়া, সাউথ ক্যারোলিনা। মনে করা হচ্ছিল হোয়াইট আমেরিকানদের ভোট রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের দৌলতে অনেকটাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে নিয়েছে। ভুল। হোয়াইট, কালারড, ইন্ডিয়ান আমেরিকান, হিস্পানিক এবং নারী। সব শ্রেণি প্রত্যাখ্যান করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। 
‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ আমেরিকার অন্তর্বর্তী ভোটের ফলাফলকে ট্রাম্পের জন্য আখ্যা দিয়েছে মিডটার্ম কার্স। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী অভিশাপ। অনাচার করা হলে কখন যে গণতন্ত্রের অভিশাপ নেমে আসবে সেটি সম্পূর্ণ অজানা, অপ্রত্যাশিত, অনিশ্চিত। ইতিহাসে বারংবার বিশ্বজুড়ে জনগণ নীরবে স্লোগান দিয়েছে, ‘অনাচার করো যদি..রাজা তবে ছাড়ো গদি! ’ 
বাংলাদেশ নয়। নেপাল নয়। শ্রীলঙ্কা নয়। সরকার বদলের শ্রেষ্ঠ পন্থা ভোট। মার্কিন গণতন্ত্র সেই প্রমাণ আবার দিয়েছে। সেই ভোটকে স্বচ্ছ হতে হবে। ভোটাধিকার নিয়ে কোনো শাসক যদি জনগণের সঙ্গে কারচুপি করে, তাহলে কিন্তু  গণতন্ত্রের আঘাত আরও মারাত্মক হয়। 
রাজার সবথেকে ক্ষতি করে পারিষদ, বিদূষক, তোষামোদ করা চাটুকারবৃত্ত। রাজার জন্য সবথেকে উপকারী বন্ধু হল, সমালোচক। কিন্তু বিশ্ব ইতিহাসে এই উপদেশ অনেক পুরাতন হলেও গদিতে বসার পর সব শাসকই তা ভুলে যায়। সে প্রত্যহ চায় ‘হীরকের রাজা ভগবান’ শুনতে।