বদলাবে মার্কিন বিদেশ নীতি?
  • ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিশ্বরাজনীতির গতিপ্রকৃতি সবসময় এক সরলরেখায় চলে না। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওঠানামা এবং হোয়াইট হাউসের নীতিগত সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে যে তরঙ্গ তোলে, তার প্রভাব ভারত সহ বিভিন্ন দেশের উপর পড়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। মার্কিন মুলুকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিপর্যয় ও অন্তর্বর্তী নির্বাচনে তাঁর দলের বড়ো ধাক্কা খাওয়ার পর নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকে শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মার্কিন নীতিতে সম্ভাব্য বদল এবং তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে জল মাপতে শুরু করেছেন। আমেরিকার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য চুক্তি এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে গত কয়েক মাস ধরেই জল্পনা তুঙ্গে। দুই দেশের বাণিজ্য প্রতিনিধিরা এনিয়ে দফায় দফায় বৈঠকও করেছেন। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই চুক্তিকে ঘিরে বিতর্ক ও অস্বস্তি কম নয়। বিরোধীদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ঠিক কোন শর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি করতে এত বেশি তৎপরতা কেন্দ্রের? অন্যদিকে, দেশের কৃষক সংগঠনগুলির পক্ষ থেকেও প্রবল আপত্তি রয়েছে। তাঁদের হুঁশিয়ারি, এই চুক্তির ফলে যদি দেশীয় কৃষকদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া হয়, তবে দেশজুড়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

Advertisement

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রসায়ন ও মিত্রতার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। আমেরিকায় ‘হাউডি, মোদি’ বা ভারতে ‘নমস্তে ট্রাম্প’ তার প্রমাণ। কিন্তু তার পরেও ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত খামখেয়ালিপনা বা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এজেন্ডা অতীতে ভারতকে বহুবার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্বস্তিতে ফেলেছে। রেহাই পাননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। তাঁকেও বারংবার অস্বস্তিতে ফেলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ‘অপারেশন সিন্দুর’ নিয়েও ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তাঁর নির্দেশেই যুদ্ধ বন্ধ করেছিল ভারত ও পাকিস্তান। এছাড়াও, ভারতের পণ্যের উপর চড়া শুল্ক আরোপ বা রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের রক্তচক্ষু— নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে বারবার। তবে মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ আসায় ট্রাম্পের একতরফা শুল্ক বৃদ্ধি ও বাণিজ্য যুদ্ধের নীতিতে কিছুটা রাশ টানা সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তা সত্ত্বেও, ডেমোক্র্যাটরা হোয়াইট হাউসে না থাকায় এবং মার্কিন আইনসভায় ঐতিহ্যগতভাবে তাদের রুশ-বিরোধী মনোভাবের কারণে রাতারাতি বড়ো কোনো নীতি পরিবর্তন ঘটবে—এমনটা খুব জোর দিয়ে বলা যায় না।
ভারতের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং শক্তির চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ভারতের মুদ্রাস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-আমেরিকার সংঘাত এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। মার্কিন জনমানসে এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলেও। ট্রাম্প প্রশাসন যদি এবার আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও ইরান নীতিতে রাশ টানতে বাধ্য হয় এবং সংঘাতের অবসান ঘটার কোনো সূত্রপাত হয়, তবে তা গোটা বিশ্বের জ্বালানি বাজারকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। পেট্রল, গ্যাস ও সারের মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা গেলে ভারতের সাধারণ  মানুষ ও দেশের কোষাগার—উভয় পক্ষই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। মিড টার্ম ইলেকশনে ট্রাম্প ধাক্কা খেলেও মার্কিন নীতিতে রাতারাতি বিরাট কোনো ইউ-টার্ন ঘটবে—এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। তা সত্ত্বেও, ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এবং মার্কিন আইনসভায় ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন নয়াদিল্লিকে ভবিষ্যতে আমেরিকার সঙ্গে দর কষাকষির ক্ষেত্রে কিছুটা বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। নয়াদিল্লির কূটনীতি এবং সুচিন্তিত পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে ভারত-মার্কিন সম্পর্কের সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেবে।