মৃণালকান্তি দাস: আমেরিকার রাজনীতিতে একটা পুরানো গল্প আছে। এক দরিদ্র মহিলার গল্প। যিনি নাকি সরকারি ভাতা পাওয়ার জন্য একের পর এক মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করতেন। কখনো ৮০টি নাম, কখনো ৩০টি ঠিকানা, কখনো পাঁচটি আলাদা ফোন নম্বর। মৃত সেনাদের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে তুলতেন সরকারি অনুদান। তাঁর বার্ষিক করমুক্ত আয় নাকি ১ লক্ষ ৫০ হাজার ডলার! এই মহিলার নাম লিন্ডা টেলর। তাঁকে আমেরিকার নাগরিকদের সামনে তুলে ধরেছিলেন তৎকালীন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী রোনাল্ড রেগ্যান। সালটা ১৯৭৬। সেই থেকে মার্কিন রাজনীতিতে জন্ম নেয় এক বহুল প্রচারিত চরিত্র—‘ওয়েলফেয়ার কুইন’। অর্থাৎ সরকারি সাহায্যের সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রের টাকা লুটে খাওয়া এক হতদরিদ্র মহিলা।
গল্পটি শুধু একজন মহিলার অপরাধের কাহিনি ছিল না। এর মধ্যে দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল একটি রাজনৈতিক ধারণা—আমেরিকার সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ দরিদ্র মানুষের অসততা। বিশেষ করে অশ্বেতাঙ্গ দরিদ্ররা সরকারি সুযোগ-সুবিধার নামে রাষ্ট্রের সম্পদ লুটছে। অতএব তাদের জন্য বরাদ্দ সরকারি সাহায্য কমাতে হবে। প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকায় সেই পুরানো গল্পই যেন নতুন করে ফিরে এসেছে। আবার দরিদ্রদের বিরুদ্ধে সরকারি সাহায্য জালিয়াতির অভিযোগ। আবার খাদ্য ভাতা ও স্বাস্থ্যবিমার মতো সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে কাটছাঁটের যুক্তি। আবার রাষ্ট্রের টাকা লুটে নেওয়া কিছু ‘অসাধু’ নাগরিককে খুঁজে বের করার অভিযান। কিন্তু এবারের গল্পে একটা বড়ো পার্থক্য রয়েছে। যাঁরা গরিব মানুষের কয়েক হাজার ডলারের সরকারি সাহায্য নিয়ে এত উদ্বিগ্ন, তাঁদেরই বিরুদ্ধে উঠছে সরকারি ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়ানোর অভিযোগ। অভিযোগের কেন্দ্রে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট, তাঁর পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা।
প্রশ্ন উঠছে, আমেরিকার আসল দুর্নীতি কোথায়? সরকারি খাদ্য ভাতার সামান্য টাকা জালিয়াতি করে নেওয়া কোনো দরিদ্র পরিবারের মধ্যে, নাকি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অলিন্দে বসে কোটি কোটি ডলারের আর্থিক সুবিধা নেওয়ার ব্যবস্থার মধ্যে?
১৯৭৬ সালে রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসাবে প্রচার চালানোর সময় শিকাগোর সাউথ সাইডের বাসিন্দা লিন্ডা টেলরের কাহিনি শোনান রেগ্যান। তাঁর দাবি ছিল, টেলর ভুয়ো তথ্য দিয়ে বিভিন্ন সরকারি সুবিধা তুলতেন। তাঁর বার্ষিক করমুক্ত আয় ছিল ১ লক্ষ ৫০ হাজার ডলার। টেলরের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ ছিল। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত অপরাধের বাইরেও গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে রেগ্যানের প্রচারিত অঙ্কের বিস্তর ফারাক ছিল। The Queen: The Forgotten Life Behind an American Myth বইয়ের লেখক জশ লেভিন জানিয়েছেন, টেলরের বিরুদ্ধে যে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়েছিল, তার পরিমাণ ছিল মাত্র ৯ হাজার ডলার। অর্থাৎ রেগ্যানের প্রচারে যে বিপুল আয়ের তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল, তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে সেই গল্প যথেষ্ট ভূমিকা নিয়েছিল। টেলরের ব্যক্তিগত অপরাধকে সামনে রেখে রেগ্যান এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন, যেখানে দরিদ্রদের সরকারি সাহায্য পাওয়াটাই সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়। এর পরের পর্বে সরকারি সামাজিক সুরক্ষা খাতে কাটছাঁটের যুক্তি হিসাবে উঠে আসে সেই একই বক্তব্য। কমানো হয় ওয়েলফেয়ার, খাদ্য ভাতা, মেডিকেড, সরকারি আবাসন এবং কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণের মতো প্রকল্পে বরাদ্দ। লিন্ডা টেলর হয়ে ওঠেন একটি রাজনৈতিক প্রতীকে। দরিদ্র মানুষের জন্য রাষ্ট্রের খরচ মানেই যেন করদাতাদের অর্থের অপচয়। আর সেই অপচয় বন্ধ করতে হলে দরিদ্রদের উপর নজরদারি ও সরকারি সাহায্যে কাটছাঁট জরুরি।
ট্রাম্প প্রশাসন এখন অনেকটা সেই রেগ্যান-যুগের রাজনৈতিক কৌশলেই হাঁটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একদিকে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে কাটছাঁট, অন্যদিকে সরকারি সাহায্য নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগকে সামনে রেখে দরিদ্রদের বিরুদ্ধে প্রচার। সাম্প্রতিকতম উদাহরণ, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতি-বিরোধী টাস্কফোর্সের ঘোষণা। তাদের দাবি, সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি ‘সাপ্লিমেন্টাল নিউট্রিশন অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম’ থেকে প্রায় ৪ কোটি ডলার জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। ওহাইওতে দাঁড়িয়ে ভ্যান্স বলেন, ‘কিছু মানুষ এই প্রকল্পগুলির সঙ্গে জালিয়াতি করছে। এই ক্ষেত্রে তারা নিজেদের সম্পদ বাড়াতে আক্ষরিক অর্থেই ক্ষুধার্ত শিশুদের মুখের খাবার কেড়ে নিচ্ছে।’ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ অবশ্যই অপরাধ। কিন্তু সেই অপরাধের তদন্ত আর গোটা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে সন্দেহের চোখে দেখা এক বিষয় নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিচ্ছিন্ন জালিয়াতির ঘটনাকে সামনে রেখে দরিদ্রদের জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্বই সংকুচিত করার চেষ্টা চলছে। এর কিছুদিন আগেই ভ্যান্স আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসন ওবামাকেয়ার-এর আওতায় স্বাস্থ্যবিমা পাওয়া ৭ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষের বিমা বাতিল করেছে। কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছিল, তাঁদের বিমা পাওয়ার ক্ষেত্রে জালিয়াতি হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। সরকারি সাহায্যের সুযোগ নিয়ে যাঁরা প্রতারণা করছেন, তাঁদের ধরিয়ে দিলে পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর ঘোষণা, কেউ যদি এমন কোনো ব্যক্তির সন্ধান দেন, যার মাধ্যমে সরকার ১০০ কোটি ডলার উদ্ধার করতে পারে, তাহলে তথ্যদাতাকে দেওয়া হবে উদ্ধার হওয়া অর্থের ১ শতাংশ কমিশন।
ট্রাম্প হয়তো মনে করছেন, সরকারি সাহায্য নিয়ে জালিয়াতির বিরুদ্ধে এই অভিযান তাঁকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা দেবে। কিন্তু তাঁর হিসাবের বাইরে একটি বিষয় থেকে যাচ্ছে। সংবাদসংস্থা দ্য গার্ডিয়ান-এর এক সমীক্ষা জানিয়েছিল, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে সরকারি দুর্নীতি। সমীক্ষায় ৯০ শতাংশ আমেরিকান বলেছিলেন, সরকারি দুর্নীতি একটি সমস্যা। আর দুর্নীতি বলতে ভোটাররা কী বোঝাচ্ছেন, সেটাও স্পষ্ট। তাঁদের কাছে সমস্যা হল, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যখন জনস্বার্থের চেয়ে নিজেদের এবং তাঁদের অর্থদাতাদের আর্থিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন। ট্রাম্পের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা থেকে বিপুল আয়ের অভিযোগ ভোটারদের উদ্বেগেরই একটি উদাহরণ। ভ্যান্স অবশ্য প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর দাবি, ট্রাম্পের দুর্নীতিতে যুক্ত থাকার কোনো প্রমাণ তিনি খুঁজে পাননি। যুক্তি দিয়েছেন, ট্রাম্প রাজনীতিতে আসার আগেই ধনকুবের ছিলেন। ফলে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়ানোর জন্য সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রশ্ন হল, আগে থেকেই ধনী হওয়া কি সরকারি ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তিগত ব্যবসার স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগকে অগ্রাহ্য করার
যথেষ্ট যুক্তি?
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য রোসা ডিলরো ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পদ, তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের আর্থিক সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে একটি বিস্তারিত তালিকা তৈরি করেছেন। সেখানে রয়েছে একাধিক ঘটনা। যেমন— ১. সংযুক্ত আরব আমিরশাহির শাসক পরিবারের সঙ্গে যুক্ত একটি বিনিয়োগ সংস্থা গোপনে ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো সংস্থা ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিনান্সিয়ালে ৫০ কোটি ডলারের অংশীদারিত্ব কেনে বলে অভিযোগ। এর কিছুদিন পর সংযুক্ত আরব আমিরশাহি আমেরিকার অত্যন্ত সুরক্ষিত ও উন্নতমানের এআই চিপ ব্যবহারের সুযোগ পায়। এই দুই ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২. ফৌজদারি মামলার মুখে থাকা ধনীরা ট্রাম্পের রাজনৈতিক সংগঠনগুলিকে অনুদান দিয়ে ক্ষমা বা দণ্ড মকুবের সুযোগ চাইছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক উদাহরণ পুয়ের্তো রিকোর প্রাক্তন গভর্নর ওয়ান্ডা ভাসকেজ গার্সেড এবং তাঁকে ঘুষ দেওয়া ব্যাঙ্কার হুলিও হেরেরার ভেলুতিনি। ভেলুতিনির পরিবারের তরফে ট্রাম্পের প্রাক্তন ব্যক্তিগত আইনজীবী আলিনা হাব্বার সঙ্গে ৫ কোটি ডলারের একটি চুক্তি এবং ট্রাম্পের মাগা ইনকর্পোরেটেড সুপার প্যাককে ৩৫ লক্ষ ডলার অনুদান দেওয়ার পর তাঁদের ক্ষমা করা হয় বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। ৩. বিরল খনিজ নিয়ে কাজ করা ভলকান এলিমেন্টস নামে একটি নতুন সংস্থাকে ৬০ কোটি ডলারেরও বেশি ঋণ দিয়েছে পেন্টাগন। তার মাত্র তিন মাস আগে ট্রাম্পের বড়ো ছেলে ডোনাল্ড জুনিয়রের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংস্থা ১৭৮৯ ক্যাপিটাল ওই কোম্পানির অংশীদারিত্ব কিনেছিল। ৪. ড্রোন প্রস্তুতকারক সংস্থা পাওয়ারাসের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এরিক ও ডোনাল্ড জুনিয়র। সংস্থাটি ইরানের হামলার মুখে থাকা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন মিত্র দেশগুলির কাছে ড্রোন প্রতিরোধী প্রযুক্তি বিক্রি করছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, যে যুদ্ধে আমেরিকাকে জড়িয়েছেন ট্রাম্প, সেই যুদ্ধের আড়ালে তাঁর পরিবারের ব্যবসায়িক প্রতিরক্ষা সংস্থা লাভবান হয় কীভাবে?
রোনাল্ড রেগ্যান দরিদ্র আমেরিকানদের সরকারি সাহায্য থেকে বঞ্চিত করার পক্ষে রাজনৈতিক যুক্তি তৈরি করেছিলেন লিন্ডা টেলরের কাহিনি দিয়ে। কিন্তু রেগ্যানের বিরুদ্ধে সেই অভিযান থেকে ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়ানোর অভিযোগ ওঠেনি। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে ছবিটা আলাদা। তাঁর প্রশাসন সরকারি সাহায্য নেওয়া দরিদ্রদের মধ্যে জালিয়াতি খুঁজতে ব্যস্ত। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্টের নিজের ক্রিপ্টো ব্যবসা, পরিবারের বিদেশি বাণিজ্য, ধনকুবেরদের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক এবং সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে ব্যক্তিগত ব্যবসার সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠছে। আমেরিকার ভোটারদের প্রশ্ন, সরকারি ক্ষমতা কি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতির জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি ক্ষমতাসীনদের ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়ানোর হাতিয়ার হয়ে উঠছে? দরিদ্র মানুষের কয়েক হাজার ডলারের সরকারি সাহায্য নিয়ে তদন্ত হতেই পারে। অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তিও হওয়া উচিত। কিন্তু একই মাপকাঠি কি ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে?
উত্তর মিলেছে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে। ভরাডুবি হয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির। তবুও প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প কি এবার নিজেকে বদলাবেন?


