শান্তনু দত্তগুপ্ত: ‘অপূর্বর সঙ্গে তাহার বন্ধুদের নিম্নলিখিত প্রথায় প্রায়ই তর্ক-বিতর্ক হইত। বন্ধুরা কহিতেন, অপূ, তোমার দাদারা প্রায় কিছুই মানেন না, আর তুমি মানো না শোনো না সংসারে এমন ব্যাপারই নেই।
অপূর্ব কহিত, আছে বৈ কি। এই যেমন দাদাদের দৃষ্টান্ত মানিনে এবং তোমাদের পরামর্শ শুনিনে।
বন্ধুরা পুরানো রসিকতার পুনরাবৃত্তি করিয়া বলিতেন, তুমি কলেজে পড়িয়া এম. এস্সি. পাস করিলে, কিন্তু তবু এখনও টিকি রাখিতেছ। তোমার টিকির মিডিয়ম দিয়া মগজে বিদ্যুৎ চলাচল হয় নাকি?’
বলতে পারেন, কোন কালজয়ী উপন্যাসের এ শুরুর ক’খানি লাইন? না পারলেও অসুবিধা নেই। আপনি যে পড়েছেন এবং পড়ছেন, সেটাই অনেক। এ যুগে বই পড়ার তুলনায় বই পোড়ানোটাই যেন বেশি ফ্যাশনেবল হয়ে গিয়েছে। তাই এই লাইন ক’খানি পড়ে থাকলে, কলেজ স্কোয়ারের ওই মিছিলে হেঁটে থাকলে, এমনকি মিছিলে হাঁটাকে মন থেকে সমর্থন করলেও আপনাকে কুর্নিশ। কথায় বলে, শিক্ষিত-অশিক্ষিত গায়ে লেখা থাকে না। শিক্ষা বোঝা যায় মানুষের ভাবনায়, আচরণে। দুর্গাপুজোর ঢাকে কাঠি পড়া মাত্র রাজ্যজুড়ে যেভাবে বইতে কাঠি করা শুরু হয়ে গিয়েছিল, তাতে এই প্রবাদটাই সবচেয়ে লাগসই বলে মনে হয়। কীভাবে যেন একঝাঁক বঙ্গবাসী বইয়ের শত্রুপক্ষ হয়ে তেড়েফুঁড়ে নেমে পড়ল। পুজো মণ্ডপে অত পুলিশ ছিল না, যত ছিল বামেদের বইয়ের স্টল ভাঙতে। বুলডোজার, আধাসেনা... এই ক’দিনে কী না দেখেছে বাংলা! দেখেছে, আর তাজ্জব হয়েছে। তাহলে কি এবার পড়াশোনা হোয়াটসঅ্যাপেই হবে? আর কিছু পিডিএফ? ‘পথের দাবি’ পায়ে মাড়ানো হচ্ছে পথেই। স্বামীজির রচনা ছিঁড়ে কুটিকুটি করা হচ্ছে। রবি ঠাকুর ছিটকে পড়ে আছেন রাস্তার এক কোণে। সংস্কৃতিবান বাংলার এটাই কি আধুনিক রূপ? নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দল কেন পুজোর সময় বইয়ের স্টল দেবে? কারণ একমাত্র সেটাই। হঠাৎ করে বাংলার সংস্কৃতিরও যেন ‘রাজনৈতিক বিকাশ’ হয়েছে। এক শ্রেণির লোকজন মনে করছে, হিন্দুধর্ম রক্ষায় তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই ধর্ম রক্ষা পাবে। ভাববেন না এরা সবাই অশিক্ষিত। অনেকেই এদের মধ্যে বিলক্ষণ শিক্ষিত। ডিগ্রিধারী। ‘এমএসসি পাশ করার পরও’ হঠাৎ তাদের টিকি ঝুলিয়ে গেরুয়াতন্ত্রের ধারক-বাহক হওয়ার ইচ্ছে চাগাড় দিয়েছে। দেবেই তো! কারণ নম্বর এখানেই। যোগ্যতার দামও ওই নম্বরে। ধর্ম, জাতপাতের রাজনীতির ঠেলায় শিক্ষা-অভিজ্ঞতা এখন পিছনের সারিতে চলে গিয়েছে। ওটা যোগ্যতার মাপকাঠি নয়। যত বড়ো ভক্ত, তত বেশি যোগ্য। তত বড়ো ভক্ত। কাজেই, পড়ে হবেটা কী? এদের আজকাল তাই ঠিক ওই অপূর্বর মতো মনে হচ্ছে। যাবতীয় অন্ধভক্তি ওই টিকির মিডিয়ম দিয়ে মগজে চালিত হয়। তাই তারা বই ছেঁড়ে, বই পোড়ায়, বইয়ের স্টল ভাঙে। আর কিছু মানুষ নামে প্রতিবাদে। কখনো বুঝিয়ে... ‘বাবা, বইটা ছিঁড়ে ফেলো না। বরং একবার পড়ে দেখো।’ কখনো বই হাতে মিছিলে হেঁটে। কারও হাতে শরৎচন্দ্র, কারও স্বামীজি, কারও কার্ল মার্ক্স, কারও হাতে রামায়ণ। চাকরিহারা শিক্ষক সুমন বিশ্বাসের হাতে দেখা গেল গীতা। ফ্রক পরা মেয়েটির হাতে টুনটুনির বই। কিশোরী এল মেসির বই হাতে। তরুণ-তরুণীরা তুলে ধরলেন প্যালেস্তাইনের কভার। কারও হাতে সংবিধান, কারও নেতাজি, কেউ আবার ভগৎ সিং হাতে। বৃদ্ধের হাতে রামকৃষ্ণ কথামৃত। যাদবপুরের অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরী এলেন মিছিলে। বক্তব্য রাখলেন।
এরপরও একে শুধু বামপন্থীদের মিছিল বলবেন? বলতেই পারেন। কারণ, আয়োজনের দায়িত্বে তারাই ছিল। কিন্তু যে মানুষগুলো শুধু বইয়ের টানে ওই মিছিলের বহর-পরিসর বাড়িয়েছিল, তারা কোন দলের? কোন রঙের? ওই মানুষগুলো এসেছিল আগামী প্রজন্মের জন্য। গ্যাজেট নির্ভরতার জমানাতেও বইয়ের বিকল্প যে কিছু নেই, তারা জানে। তাই প্রাচীন প্রজন্ম আসে সংস্কার আঁকড়ে। আর নবীন প্রজন্ম? পুজোয় কোন দিন কোন জামা পরবে ঠিক করেছিল তারা... আর এই মিছিলে আসার আগে ঠিক করেছে ‘বই’। কোন বই নিয়ে মিছিলে হাঁটলে স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে ছুড়ে দেওয়া যাবে বার্তা। স্লোগান নয়। গল্প-আলোচনা লেখা নিয়ে। কবিতা নিয়ে। গান গেয়ে। এটাই তাদের প্রতিবাদ। এ এক অন্য অহিংস আন্দোলন। প্রতিবাদের উৎসব। প্রোটেস্টিভ্যাল। ফরাসি দেশের মতো? ধারা না হলেও শব্দ ধার করেছে তারা। উড়েছে টিফো।
অপূর্বদের মনও কি আনচান করেনি এই মিছিল দেখে? যতই হোক, তারাও যে শিক্ষিত। বইয়ের মর্যাদা, গুরুত্ব জানে। তারা বোঝে, দাবি উঠবেই। সংস্কৃতির দাবি। পথের দাবি। আর তা উঠবে পথে নেমেই। অপূর্বও যে তা বুঝেছিল। কারণ সে চোখের সামনে দেখেছিল সব্যসাচীকে। ওই ডাক্তারই যে তাঁকে বলেছিলেন, ‘মানুষকে মানুষ করার, স্বাধীনতাকে সত্য করার দায়িত্ব যার, স্বাধীনতা কেবল তারই। এ আর কারও নয়।’ কী মারাত্মক উক্তি ছিল সে... ‘মানুষকে মানুষ’ করে তোলাই যে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। শরৎচন্দ্রের জমানায় ছিল। এই জমানাতেও আছে। বই ছাড়া যা সম্ভব নয়। তার পাতায় পাতায় যে উঠে আসে সমাজ, মনুষ্যত্ব, সম্পর্ক। হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করলে সে সবের বালাই থাকে না। দেশবাসী তখন এক নির্দিষ্ট শাসক, নির্দিষ্ট দল, নির্দিষ্ট ভাবধারার ঘূর্ণিতে ঘুরপাক খায়। বিবেচনা করার ক্ষমতা হারিয়ে যায় অন্ধভক্তির হল্লায়। মিছিলে বই হাতে এগিয়ে চলা আট থেকে আশি তা জানে। তাই প্রতিবাদ উঠছে, বইয়ের জন্য। হয়তো আজ সংখ্যাটা কম। হয়তো প্রতিবাদের এই উৎসব আসমুদ্রহিমাচল ঢেউ তোলেনি। কিন্তু তুলবে। আজ না হলে কাল। আশাবাদী ওই মুখগুলো। মনে পড়ে মাকে বলা অপূর্বর দাদার সেই কথাগুলো... ‘সকল দেশেই জন-কতক লোক থাকে মা, যাদের জাতই আলাদা—তোমার ছোট ছেলেটি সেই জাতের। দেশের মাটি এদের গায়ের মাংস, দেশের জল এদের শিরার রক্ত; শুধু কি কেবল দেশের হাওয়া-আলো— এর পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, চন্দ্র-সূর্য, নদী-নালা যেখানে যা কিছু আছে সব যেন সর্বাঙ্গ দিয়ে এরা শুষে নিতে চায়! বোধ হয় এদেরই কেউ কোন্ সত্যকালে জননী-জন্মভূমি কথাটা প্রথম আবিষ্কার করেছিল। দেশের সম্পর্কে এদের কখনো বিশ্বাস করো না মা, ঠকবে। এদের বেঁচে থাকা আর প্রাণ দেওয়ার মধ্যে এই এতটুকু মাত্র প্রভেদ!’
লড়াই চলছে। হয়তো অসম। কিন্তু লড়াই। বিরাট এক মেশিনারির বিরুদ্ধে পাতার পর পাতা বয়ে চলা শব্দের। বাক্যের। অনুভূতির। নিয়মের আড়ালে অন্যায়কে সমর্থনের ধাপ্পা দেশবাসী আর মেনে নেবে না। হয়তো আজ সংখ্যাটা কয়েক হাজার। কিন্তু সেটাই কখনো বদলে যাবে লাখে, কোটিতে। মনে পড়বে সব্যসাচীর সেই অব্যর্থ সংলাপ, ‘নিয়ম তৈরি করেছে মানুষ নিজের স্বার্থে, কিন্তু মানুষ তো নিয়মের দাস নয়। মানুষের প্রয়োজনেই নিয়ম বদলাতে হয়।’ আপনি হয়তো বলবেন, ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বাংলা মিডিয়াম সরকারি স্কুলগুলো ধুঁকছে। পড়ুয়া নেই। আর পড়ুয়া থাকলেও শিক্ষক নেই। পাবলিক লাইব্রেরিগুলির অবস্থা শোচনীয়। বছরের পর বছর তাতে কোনো স্থানীয় কমিটি নেই। বইয়ের রিকুইজিশন দেওয়ার বা নেওয়ার লোক নেই। লাইব্রেরিয়ান নেই। সাফাইকর্মী খুঁজে পাওয়া যায় না। পেলেও তাঁকে মাইনে দেওয়ার পরিকাঠামো নেই। আর তার দায় কোনো একটি দল বা একটি সরকারের নয়। বছরের পর বছর এটাই চলছে। এবং বাড়ছে। টাকা হয়তো বরাদ্দ হচ্ছে। কিন্তু কাটমানির চোরাগলিতে তা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও বইগুলো আছে। থাকবে। ধুলো ঝেড়ে আবার তা বের করবে কেউ। পড়বে। পরের প্রজন্মকে পড়াবে। গড়ে তুলবে মূল্যবোধের ভিত। পরিবেশ বদলাবে। মানুষকে যা খাওয়ানো হবে, তা তারা দেখবে, শুনবে... কিন্তু বিশ্বাস করবে না। যাচাই করবে শিক্ষায়। অভিজ্ঞতায়। ভয় পাবে না তারা। ভয়ে ভক্তি আসে ঠিকই। কিন্তু তা ক্ষণস্থায়ী। আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছিলেন, ‘আপনি সবাইকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারেন। কয়েকজনকে চিরকালের জন্য। কিন্তু গোটা মানবসমাজকে, দেশকে চিরকালের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পারেন না।’ ভারত কি আজ সেই পথে? ‘পথের দাবি’তে সব্যসাচী কিন্তু বলেছিলেন, ‘ভয় জিনিসটা মনের একটা বিকার মাত্র। তাকে জয় করতে না পারলে মানুষ কোনোদিনই বড় হতে পারে না।’


