প্রতিবাদ করলেই বিদেশি ফান্ডের তত্ত্ব
  • ২ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রীতম দাশগুপ্ত: একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যাই। সাতের দশকের গোড়া। গুজরাতে বিধানসভা নির্বাচনে একচ্ছত্র আধিপত্য কংগ্রেসের। যদিও দলীয় কোন্দলের জেরে ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে ঘনশ্যাম ওঝার বদলে মুখ্যমন্ত্রী হলেন চিমনভাই প্যাটেল। এরপর ডিসেম্বর মাস। মোরবি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে মেসের খাবারের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হল ছাত্র আন্দোলন। পরে সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল লালভাই দলপতি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। এরপর আন্দোলন শুরু হল গুজরাত বিশ্ববিদ্যালয়ে। ‘নবনির্মাণ আন্দোলন’ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল। সেই আন্দোলন আর শুধু ২০ শতাংশ খাবারের ফি বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ রইল না। মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্য সংকট এবং মুখ্যমন্ত্রী চিমনভাই প্যাটেলের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের চরম দুর্নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ দ্রুত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ​ছাত্ররা গঠন করল ‘নবনির্মাণ যুব সমিতি’। ছাত্রদের সঙ্গে সাধারণ মধ্যবিত্ত, শিক্ষক ও শ্রমিক শ্রেণিও রাস্তায় নামল। শুরু হল বন্‌ধ, বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী চিমনভাইকে ইস্তফা দিতে বললেন। ১৯৭৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। চিমনভাই প্যাটেল পদত্যাগে বাধ্য হলেন। পরবর্তীতে বিধানসভা ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়। স্বাধীন ভারতে প্রথম এই আন্দোলনই একটি সরকারের প্রধানকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করল। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছিল বিহার আন্দোলন। চিমনভাইয়ের ইস্তফার পর গুজরাত সফরে এলেন স্বয়ং জয়প্রকাশ নারায়ণ। নবনির্মাণ আন্দোলনের এই ফসল পরে ঘরে তুললেন জেপি। বিহার আন্দোলনকে নিয়ে গেলেন অন্য মাত্রায়। তাঁর ‘টোটাল রেভলিউশন’ বা সম্পূর্ণ ক্রান্তির অনুপ্রেরণা ছিল এই গুজরাতের আন্দোলন। জেপির আন্দোলনের জেরে পরবর্তী পর্বে জরুরি অবস্থা জারি ও ইন্দিরা গান্ধীর পতন। সে অন্য কাহিনি। গুজরাত নব নির্মাণ আন্দোলনের সময় সক্রিয় আরএসএস কর্মী হিসাবে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এক তরুণ। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় রাখার কাজও করতেন তিনি। নানাবিধ পুস্তিকা তৈরি করা ও প্রচারে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। সেই সময়ই ওই তরুণের সাংগঠনিক দক্ষতা নেতৃত্বের নজরে আসে। পরে জেপি গুজরাতে এলে তাঁর সঙ্গেও দেখা করেন তিনি। পরবর্তী কালে জরুরি অবস্থার সময় গোপনে সংগঠনের কাজ করে প্রতিবাদ আন্দোলনকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল। ওই তরুণই ২০০১ সালে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হন। পরে ২০১৪ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি। ৫২ বছর আগে যে আন্দোলন আজকের নরেন্দ্র মোদির ভিত তৈরি করেছিল, সেই আন্দোলনকে কেউ কিন্তু ‘ডিপ স্টেট’ বলেনি। কেউ বলেনি আন্দোলনে বিদেশি ফান্ড রয়েছে। অথচ কী পরিহাস দেখুন। সেদিনের সেই আন্দোলনকারী আজ প্রধানমন্ত্রী হয়ে নিজে ও দলবলকে দিয়ে ছাত্র-যুব বা জেন জি অথবা বিরোধীদের আন্দোলনকে অনায়াসে ডিপ স্টেট বলাচ্ছেন। বলেই দিচ্ছেন বিদেশি মদতে এসব হচ্ছে। জর্জ সোরোস অর্থ দিচ্ছেন।

Advertisement

শুধু যে মোদি-শাহ এই তথ্য দিচ্ছেন এমন কিন্তু নয়। সম্প্রতি আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতও সরকার বিরোধী আন্দোলনকে ‘অশুভ আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ফ্রান্স বা বাংলাদেশ, নেপালের মতো ভারতও নাকি চক্রান্তের শিকার। কিন্তু মজার কথা ভাগবতজি বা তাঁর পূর্বসূরিরা আজ পর্যন্ত তাদের সংগঠনের আর্থিক উৎস নিয়ে ধোঁয়াশা বজায় রেখেছেন। কিন্তু সংঘ ঘোষিত রাষ্ট্রবাদী। তাই এ ব্যাপারে প্রশ্ন তুললেই আপনি রাষ্ট্রদ্রোহী। একটা দেশের রাজপথের বিক্ষোভ দেখলেই তাকে ভারতের মতো বৈচিত্রময় দেশের উপর হুবহু চাপিয়ে দেওয়া যায় না। ভাগবতজি বা মোদি-শাহ কিংবা তাঁদের তাঁবেদাররা কি বিদেশি ফান্ডের ব্যাপারে কোনো প্রমাণ দাখিল করেছেন? উত্তর শুধু না নয়, বরং বিদেশ মন্ত্রকের তরফে খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই ধরনের আন্দোলনে বিদেশি ফান্ডের কোনো খবর সরকারের কাছে নেই। তাহলে কার কাছে আছে? কেউ জানে না। ইডি আছে। সিবিআই আছে। এনআইএ আছে। আরও গোয়েন্দা সংস্থা আছে। এগুলি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বা খোদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নিয়ন্ত্রনাধীন। তারপরেও গণআন্দোলনে বিদেশি অর্থ থাকার সুনির্দিষ্ট ও আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ কেন প্রকাশ্যে আনা যায়নি? কেন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা প্রকাশ্যে আনা যাচ্ছে না? যদি কোনো বিদেশি সংস্থা বা দেশ সত্যি বেআইনি অর্থ পাঠিয়ে ভারতীয় ব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করার চেষ্টা করে তবে সেটা তো মারাত্মক অপরাধ। এ তো একেবারে ‘নেশন ওয়ান্টস টু নো’ ধাঁচের বিষয়। এর জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অবশ্যই কাম্য। কিন্তু তদন্তের নামে সমালোচকদের মাসের পর মাস বিনা বিচারে জেলে আটকে রাখা অথবা প্রমাণ ছাড়াই চরিত্র হনন করা কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের লক্ষণ হতে পারে না। অভিযোগ তুলব অথচ প্রমাণের দায়ভার থাকবে না—এটা তো হতে পারে না। বিশ্বের কোথাও কোনো সরকার বিরোধী আন্দোলনে বিদেশি মদত ছিল না, এমনটা মোটেও নয়। ইতিহাসই বলছে, বহু সময় রেজিম চেঞ্জের ডাকের পিছনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র কাজ করেছে। কিন্তু প্রমাণযোগ্য বিদেশি অর্থসাহায্য চিহ্নিত করা ও নাগরিকরা প্রতিবাদে পথে নামলেই ষড়যন্ত্রের দোহাই দেওয়ার মধ্যে আসমান-জমিন ফারাক। প্রথমটি তথ্য-প্রমাণ নির্ভর । দ্বিতীয়টি কাল্পনিক ও রাজনৈতিক অছিলা। অপরাধের প্রমাণ থাকলে বিচার হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু প্রতিবাদ করলেই বলব ষড়যন্ত্র, এ কেমন কথা।
গণবিক্ষোভ কিংবা সরকারের বিরোধিতাকে ‘আন্তর্জাতিক চক্রান্ত’ বা ‘বিদেশি অর্থপুষ্ট ষড়যন্ত্র’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার কৌশল ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। সাতের দশকে ইন্দিরা গান্ধীর জমানাতেওএমন দেখা গিয়েছিল। জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে ছাত্র-যুবদের ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তি’ আন্দোলন যখন কংগ্রেস শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তখন ইন্দিরা গান্ধীও জনতার ক্ষোভের প্রকৃত কারণ অনুধাবনের চেষ্টা করেননি। তিনি আবিষ্কার করেছিলেন ‘বিদেশি হাত’ বা সিআইএ-র চক্রান্ত। তৎকালীন বিরোধীদের দেশবিরোধী বলে দেগে দিয়ে শেষ পর্যন্ত জারি করা হয়েছিল জরুরি অবস্থা। 
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই পুরানো রাজনৈতিক রোগটি এক অভূতপূর্ব ও বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে। জনস্বার্থবিরোধী যে কোনো নীতি, অর্থনৈতিক সংকট, কর্মসংস্থানের দাবি কিংবা কৃষি-শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে নাগরিকরা রাস্তায় নামলেই সরকারের তাঁবেদাররা ‘ডিপ স্টেট’ বলে চিৎকার জুড়ছেন। প্রশ্ন তোলার অধিকারকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার সমার্থক করে তোলা হচ্ছে। একবার স্মরণ করে দেখুন,  শাহিনবাগ থেকে জামিয়া মিলিয়া—সিএএ বিরোধী আন্দোলনে রাস্তায় যাঁরাই নেমেছিলেন, তাঁদেরই ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ এবং পাকিস্তানি বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সরকার বিরোধী আন্দোলন সমর্থন করায় বয়কটের মুখে পড়েছিলেন অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোন। কৃষকরা আমাদের অন্নদাতা। তাঁরাও যখন সরকার বিরোধিতা করেছেন, তখন অনায়াসে বলে দেওয়া হয়েছে, এরা খালিস্তানি। কানাডা থেকে এদের ফান্ড আসছে। পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ তাদের সমর্থনে টুলকিট শেয়ার করায় আরও জোরদার হয়েছিল আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব। এই টুলকিট নথিটি সম্পাদনা ও শেয়ার করার অভিযোগে পরিবেশকর্মী দিশা রবিকে দিল্লি পুলিশ গ্রেপ্তারও করে। সাম্প্রতিক সময়ে নিট ও অন্যান্য সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে ‘জেন জি’। শাসক শিবির তাঁদের হতাশার কারণ অনুধাবন না করে সেখানে ‘বহিরাগত প্রভাব’ খুঁজতে তৎপর। এমনকি তাঁদের ‘দিমাগি নকশাল’ বলে দাগিয়ে দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। 
ইতিহাস সাক্ষীদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংস্কারগুলি রাজপথের লড়াই থেকেই জন্ম নিয়েছে। ছয়ের দশকে তামিলনাড়ুর হিন্দি-বিরোধী আন্দোলন ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে মজবুত করেছিল এবং ভাষার বৈচিত্র্য রক্ষা করেছিল। ২০১২ সালের নির্ভয়া আন্দোলন নারী সুরক্ষায় নতুন ও কঠোর আইন তৈরিতে বাধ্য করেছিল। এমনকি যে তথ্যের অধিকার আইন বা খাদ্য সুরক্ষা আইনের সুফল আজ দেশবাসী পাচ্ছেন, তাও ছিল নাগরিক সমাজের দীর্ঘ প্রতিবাদের ফসল। এই সমস্ত আন্দোলন তৎকালীন ক্ষমতার কেন্দ্রকে বিচলিত করেছিল। কিন্তু তাকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে দাগিয়ে দেয়নি। এই প্রবণতা ভারতীয় জনতার আত্মমর্যাদাকে অস্বীকার করার শামিল।
​গণতন্ত্র মানে কী? শুধু প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ভোট দেওয়া? গণতন্ত্রের মূল শর্তই হল, ক্ষমতাসীন সরকারকে প্রতিদিন প্রশ্ন করার অধিকার। একজন বেকার যুবক যদি কর্মসংস্থানের দাবিতে স্লোগান তোলেন তিনি রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে যাবেন? একজন কৃষক যদি ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের গ্যারান্টি চান তিনি খালিস্তানি হয়ে যাবেন? একজন দলিত-আদিবাসী যদি জল-জঙ্গল-জমিনের অধিকারের কথা বলেন, তবে তিনি দেশের শত্রু হবেন? বিরোধী দলনেতা যদি দাবি করেন, দেশে ভোট চুরি হয়েছে, তবে তিনি ডিপ স্টেট? আপনার রাজনৈতিক মত ও পথ আলাদা হতেই পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনার পক্ষে কথা না বললেই আপনি ‘দিমাগি নকশাল’। আপনি সেকু-মাকু।
প্রতিবাদের সুর শুনলেই বিদেশে কাল্পনিক শত্রু না খুঁজে বরং দেশের দিকে তাকাক মোদি সরকার। নিজেদের ব্যর্থতা, সামাজিক বৈষম্য এবং যুব সমাজের ক্ষোভকে ধামাচাপা দিতে ‘বিদেশি ফান্ডিং’-এর জুজু দেখানো আসলে দুর্বল প্রশাসনেরই লক্ষ্মণ। বলব, বিদেশি শত্রু না খুঁজে আগে দেশের জেন জি’র অসন্তোষের মূল কারণ খতিয়ে দেখুন। নাগরিকদের প্রশ্ন করার অধিকারকে পদদলিত করে নয়, বরং তাদের অসন্তোষকে মর্যাদা দিয়ে শুনলেই ভারত প্রকৃত এবং প্রাণবন্ত গণতন্ত্র হিসাবে টিকে থাকতে পারবে। সরকারের মনে রাখা উচিত,বৈধ গণআন্দোলনকে ভিনদেশি চক্রান্তের খাঁচায় বন্দি করার প্রবণতা ভারতের সাংবিধানিক গণতন্ত্রের ভিতকেই নড়বড়ে করে তুলছে।