তাহলে কে? পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর পর্ব চলাকালীন বিচার বিভাগীয় আধিকারিকরা ৩৩ লক্ষ ভোটারের নাম ভোটার তালিকাভুক্ত করতে ছাড়পত্র দিয়েছিলেন। কিন্তু দেখা যায়, এর মধ্যে ১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দিতে ট্রাইবুনালে আবেদন জমা পড়েছে। এই নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হলে জাতীয় নির্বাচন কমিশন হলফনামা দিয়ে জানিয়ে দেয়, তারা এ বিষয়ে কিছু জানে না। নাম বাদের আবেদন করেছেন নাকি রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিক-এর দপ্তরের অফিসারেরা। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের এই বক্তব্য সামনে আসার পর যখন বিভিন্ন মহল থেকে সিইও দপ্তরের বিরুদ্ধে তোপ দাগা শুরু হয়েছে, তখনই রীতিমতো বোমা ফাটিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন এ রাজ্যে এসআইআর-এর দায়িত্বে থাকা বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত। খবরে প্রকাশ, শুক্রবার তিনি সাফ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই। তৎকালীন সিইও মনোজ আগরওয়ালও এর দায় নিতে অস্বীকার করেছেন। সুব্রতবাবু বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শদাতা। মনোজবাবু মুখ্য সচিব। এই দুই শীর্ষ কর্তার বক্তব্য সামনে আসায় জল আরও ঘোলা হয়েছে সন্দেহ নেই। প্রশ্ন উঠেছে, ১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদের আবেদন কে বা কারা করল, কার নির্দেশে হল? তার সঠিক তথ্য কি সত্যিই কেউ জানে না? নাকি কিছু আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে? এই রহস্যের মধ্যেই সিইও দপ্তরের একটি সূত্র অবশ্য দাবি করেছে, কোনো সিদ্ধান্ত যথাযথ না মনে হলে তা পুনর্বিবেচনার জন্য কোনো ব্যক্তি বা কমিশন আবেদন করতে পারে। এতে কোনো ভুল নেই। তাহলে কি সিইও দপ্তরের পক্ষ থেকেই আবেদন করা হয়েছে? উত্তর অজানা। ফলে এসব ‘ভূতের খেলা’— মনে করছেন রসিকজনেরা। আর এই ‘ভূতের খেলা’র জেরে চূড়ান্ত নাকাল হতে হয়েছে সংশ্লিষ্ট ওই বাদ পড়াদের! এর দায় কে নেবে?
রসিকতা বাদ দিলেও এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নানা কেলেঙ্কারির অভিযোগ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং উত্তরোত্তর নানা বিষয় সামনে আসছে। নতুন করে শোনা যাচ্ছে, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ জেলায় ১১ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম রহস্যজনকভাবে ‘বিচারাধীন’ তালিকায় চলে গিয়েছে! খবরে প্রকাশ, এসআইআর পর্বে এই জেলার ২২টি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রায় ১৯ লক্ষ ভোটারকে শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। এর মধ্যে নথি খতিয়ে দেখে প্রায় ১৮ লক্ষ ৩০ হাজার ভোটারের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় প্রকাশের জন্য নিয়মমতো অনুমোদন দিয়েছিলেন দায়িত্বে থাকা ইআরও-রা। তাঁদের বিচারে ৪১ হাজারের মতো ভোটার ‘অযোগ্য’ বলে বিবেচিত হন। স্বভাবতই এঁদের নাম ভোটার তালিকায় তোলার ছাড়পত্র মেলেনি। কিন্তু এর এক সপ্তাহের মধ্যে দেখা যায়, মোট ১১ লক্ষ ১ হাজার ১৪৫ জন ‘যোগ্য’ ভোটারের নাম ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় চলে গিয়েছে! এই অদৃশ্য ‘মাদারি কা খেল’-এর নেপথ্য নায়ক কে বা কারা— তা আরও রহস্যাবৃত।
এসআইআরকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি জীবিত নাগরিকের নাম বাদ দেওয়া সহ একগুচ্ছ কেলেঙ্কারির অভিযোগে সর্বোচ্চ আদালতে একাধিক মামলা চলছে। যত দিন যাচ্ছে, একের পর এক পর্দা ফাঁস হচ্ছে। ‘ভোট চুরি’ ও নানা ‘কেলেঙ্কারির’ অভিযোগ তুলে মোদি জমানায় সম্ভবত সর্ববৃহৎ প্রতিবাদ আন্দোলনে কার্যত গোটা দেশ পথে নেমেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এই সর্বগ্রাসী ‘কেলেঙ্কারি’র মূল নায়ক মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। তাঁর ইস্তফার দাবিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি তো বটেই, তাদের সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ, ককরোচ জনতা পার্টি সোচ্চার হয়েছে। এই মূল দাবিকে সামনে রেখে আজ রবিবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে ঐতিহাসিক বিক্ষোভ-সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে। দাবি আদায়ে ধারাবাহিক লড়াইয়ের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে বিভিন্ন দল, সংগঠন ও গোষ্ঠী। তাদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি স্বাধীন সংস্থাকে কব্জা করে রাজ্য-কেন্দ্রের নির্বাচনে ফায়দা তুলতে চাইছে অসন্তোষের চূড়ায় বসে থাকা মোদি সরকার। জ্ঞানেশ কুমার অবশ্য মুখে কুলুপ এঁটে বসে রয়েছেন! উলটো দিকে, জ্ঞানেশ কুমারকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে মোদি সরকার। দমন-পীড়নের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। এর মধ্যেই কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা মামলাগুলির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট কী অবস্থান নেয়—তা দেশবাসীর কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই জ্ঞানেশ কুমারকে বাঁচাতে মরিয়া মোদি বাহিনী শেষপর্যন্ত গড় রক্ষা করতে পারবে কি না— এখন সেটাই দেখার।


