দিল্লিকে দায়িত্ব দিতেই কি বিজেপির ড্রপ বক্স?
  • ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: ড্রপ বক্স রাখার শুরুটা হয়েছিল সরকারি প্রতিষ্ঠানে। পরিষেবার খামতি ও মানুষের ক্ষোভের কারণ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য। ড্রপ বক্সে জমা পড়া সব অভিযোগের প্রতিকার হয় না। কিন্তু অভিযোগকারী আশা করেন, একটা বিহিত হবে। তাতে ক্ষোভ সাময়িক প্রশমিত হয়। সেই দিক দিয়ে ড্রপ বক্স হচ্ছে ক্ষোভ প্রশমনের অস্ত্র। প্রতিকার না হলেও কোথায় গলদ তা কর্তৃপক্ষ জেনে যায়। তাতে অপছন্দের লোককে শায়েস্তা ও পেটোয়াদের সতর্ক করার সুযোগ থাকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রার্থী ঠিক করার জন্য বিজেপি ড্রপ বক্স বসাতে গেল কেন? এই প্রয়াস কি গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আড়ালের জন্য, নাকি পছন্দের লোকজনকে টিকিট পাইয়ে দেওয়ার কৌশল!

Advertisement

বিজেপি বিপুল আসন জিতে এ রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে। তবে, তার পিছনে সংগঠন বা দলের জনপ্রিয়তার সম্পর্ক নেই। পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ এবং ‘দ্বাদশ খেলোয়াড়’ হিসাবে নির্বাচন কমিশন দাপট দেখানোয় রাজ্যে পালা বদল হয়েছে। বিজেপি ক্ষমতায় বসেই তৃণমূল কংগ্রেসকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। সিপিএম এবং কংগ্রেস এতটাই পিছনে রয়েছে যে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।  যে ভোটার তালিকায় লোকসভার নির্বাচন হয়েছিল তাতেই হবে পুরভোট। ফলে তিন পুরসভা নির্বাচনে বিরোধীদের দুরমুশ করার সুযোগ শাসক দলের সামনে রয়েছে। 
তবে, পুরাতন ভোটার তালিকায় নির্বাচন হলেও বিজেপির পক্ষে পুরসভা দখলে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। শুধু ছাব্বিশেই নয়, বিগত কয়েকটি নির্বাচনেই বিজেপি শহরাঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করেছে। শহরগুলিতে পূর্বতন শাসক দল তৃণমূল যে দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাচ্ছিল, সেটা তাদের শীর্ষ নেতৃত্বও টের পেয়েছিল। তারজন্য অনেক পুরসভার চেয়ারম্যান পরিবর্তন করেছিল। তাতে কোনো লাভ হয়নি। উলটে ক্ষতি হয়েছে। আর ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পর ১৫ বছরের শাসক দলের কী করুণ হাল, সেটা বলার দরকার নেই। 
তার উপর বিজেপি নিজেদের মতো করে কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস করেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এমনভাবে ওয়ার্ডগুলি ভাঙা হয়েছে যাতে বিজেপির সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও বিজেপিকে চরম স্বস্তি দিয়েছেন তৃণমূলের টিকিটে জেতা কলকাতা এলাকার সাংসদরা। লোকসভা ভোটে বিজেপি কলকাতার একটি আসনেও জিততে পারেনি। কিন্তু, এখন কলকাতার সব সাংসদই তাদের। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, মালা রায়রা নামে এনসিপিআই। কিন্তু, মোদি ভজনায় তাঁরা বিজেপির তাপস রায়, সজল ঘোষদেরও ছাপিয়ে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে রাজ্যে অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে বিজেপি।
এই পরিস্থিতিতে বিজেপির পক্ষে কলকাতা পুরসভার ২০৯টি আসনে প্রার্থী ঠিক করা মোটেই কঠিন ছিল না। গ্রামাঞ্চলে বিজেপি নেতৃত্ব সংকটে ভুগলেও কলকাতায় সেটা নেই। বিজেপির বহু পোড়খাওয়া নেতার বাস কলকাতায়। তাঁরা একজোট হলে ২০৯টি গ্রহণযোগ্য মুখ বাছাই করা কোনো ব্যাপারই ছিল না। তাও ড্রপ বক্স বসাতে হল। কারণ নেতারা আলোচনা করে প্রার্থী ঠিক করতে গেলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব চরম আকার নিত। রোজ কাদা ছোড়াছুড়ি হত। তাতে চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হত বিজেপি নেতৃত্বকে। ড্রপ বক্স আপাতত সেই লজ্জা থেকে বঙ্গ বিজেপিকে বাঁচাল।
ড্রপ বক্স বসিয়ে বিজেপির গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কি প্রশমিত হবে, নাকি আগুনে ঘি পড়বে, সেটা সময় বলবে। বিজেপি সূত্রের খবর, ২০৯টি আসনে লড়াই করার জন্য প্রায় চার হাজারের মতো আবেদনপত্র জমা পড়েছে। শাসক দলের কাউন্সিলার। দেওয়ালি বাম্পারের ফার্স্ট প্রাইজের চেয়েও মূল্যবান। ট্যাক্স ফ্রি কামাই। তাই টিকিট ছিনিয়ে আনতে হয়। আর সেই লড়াইটা ভোটে জেতার চেয়েও অনেক কঠিন। শাসক দলের প্রার্থীদের জেতানোর জন্য পুলিশ, নির্বাচন কমিশন, পাড়ার মস্তানরাও ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাই চাপটা ভোটে জেতার নয়, টিকিট পাওয়ার। টিকিটের জন্য লড়তে হয় দলের বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে। সেখানে বিরুদ্ধাচারণ করলে জেলে যাওয়ার ভয় থাকে না। তাই প্রার্থী হওয়া নিয়ে চরম প্রতিযোগিতা, আকচাআকচি থাকাটাই স্বাভাবিক। 
পরিসংখ্যান বলছে, আবেদনকারী প্রায় চার হাজার। তাহলে প্রতি ওয়ার্ডের জন্য গড়ে ২০টি আবেদনপত্র। আবেদনকারীদের মধ্যে তৃণমূলের বেশ কিছু নেতা আছেন। বিষয়টি সামনে আসতেই বিজেপির আদি কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। সঙ্গে আশঙ্কাও। কারণ তাঁরা বুঝে গিয়েছেন, যোগ্যতা নয়, কিসে দিল্লির লাভ, সেটাই হবে বিচার্য বিষয়।
তবে বাছাই পর্বে যদি একদা তৃণমূলের দাপুটেরা পাশ করে যান তাহলে বিজেপিতে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব চরম আকার নেবে। সেক্ষেত্রে নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে বিক্ষুব্ধরা নির্দল প্রার্থী হতে পারেন। তবে, শেষপর্যন্ত পুলিশ এবং দলের প্রভাবশালীদের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে তাঁরা লড়াইয়ে টিকে থাকবেন কি না, বলা কঠিন। কিন্তু, প্রতিবাদ তাঁরা জানাবেনই। 
রাজ্যের ক্ষমতা দখল করলেও বঙ্গ বিজেপিতে শৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। বিজেপির বহু নেতা, বিধায়ক সাধারণ মানুষকে তো বটেই মন্ত্রীদের পর্যন্ত হুমকি দিচ্ছেন। রাজ্যের পরিবহণ ও শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের সঙ্গে দুই তৃণমূল নেতার ছবি সামনে আসতেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছেন বারাকপুরের বিধায়ক কৌস্তভ বাগচি। তাঁর হুংকার, ওদের বিজেপিতে নিলে পার্টি অফিসের সামনে গায়ে আগুন লাগিয়ে প্রতিবাদ জানাব। 
বিজেপির তৃণমূলীকরণের বিরুদ্ধে কৌস্তভবাবুর প্রতিবাদের ধরন কেমন হবে, সেটা সময় বলবে। তবে তাঁর হুংকার থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার, শুধু শৃঙ্খলাই নয়, বিজেপিতে কথা বলার জায়গাটুকুও নেই। সেটা থাকলে কৌস্তভবাবু ক্ষোভের কথা দলের মধ্যেই জানাতেন। প্রকাশ্যে আত্মাহুতির হুমকি দিতেন না। এসব দেখে অনেকে বলছেন, ‘ছবি’তেই ক্ষোভ চড়েছে সপ্তমে। তাহলে প্রাক্তন তৃণমূলীরা টিকিট পেলে নেতারা হয়তো গায়ে আগুন লাগিয়েই দেবেন।
রাজ্যে পালাবদলের পর বঙ্গ রাজনীতি অত্যন্ত গতিশীল হয়ে উঠেছে। প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু ঘটনা ঘটছে। তারই মধ্যে এমন কিছু ঘটছে যার গুরুত্ব অসীম। লক্ষ্মীপুজোর রাতে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে মুখ্যমন্ত্রীর নাড়ু খেতে যাওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কলকাতা পুরসভা নির্বাচনের আগে এই দুই নেতার বৈঠক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শমীক ভট্টাচার্য বারবার বলেছেন, বিজেপি কোনো দলের সঙ্গে জোট করবে না। অন্যদিকে এনসিপিআই নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির সঙ্গে জোট করে কলকাতা পুরভোটে লড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সুদীপবাবুদের জনভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিন্তু, দিল্লির কাছে ২০জন এনসিপিআই সাংসদের গুরুত্ব বঙ্গ বিজেপির বহু হেভিওয়েটের চেয়ে অনেক বেশি। এই মুহূর্তে হয়তো তাঁদের প্রয়োজন হচ্ছে না। কিন্তু, তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের নির্ভরযোগ্য ‘স্টেপনি’। 
২০২৭ সালে উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন। সেখানে বিজেপি ভালো ফল না করলে চন্দ্রবাবু নাইডু এবং নীতীশ কুমারের দল সমর্থন তোলার জন্য ছটফট করবে। ইতিহাস বলছে, পরিস্থিতি বেগতিক দেখলেই পাল্টুরামরা ডিগবাজি খান। সেই পরিস্থিতি হলে এই ২০জন সাংসদই হবেন বিজেপি সরকারের প্রাণভোমরা। টায়ার পাংচার হলে ‘স্টেপনি’ দিয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সরকার টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যেই জনবিচ্ছিন্ন সাংসদদেরও গুরুত্ব দিচ্ছে দিল্লি বিজেপি। 
সেই অঙ্কেই কলকাতার তিন সাংসদের আবদার মেনে তাঁদের কয়েকজন ঘনিষ্ঠকে বিজেপি প্রার্থী করতে পারে। তাই ড্রপ বক্স বসিয়ে তাঁদের আবেদনের সুযোগ করে দেওয়া হল। এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যটি হল, ‘আদিরা গুরুত্ব পাবেন। তবে, কাদের জেতার সম্ভাবনা বেশি সেটাও দেখা হবে।’
যে কোনো সর্বভারতীয় দলে বিধানসভা এবং লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করে দিল্লি নেতৃত্ব বা কেন্দ্রীয় কমিটি। পঞ্চায়েত, পুরসভার প্রার্থী ঠিক করে জেলা ও রাজ্য নেতৃত্ব। কিন্তু, কলকাতা পুরসভার প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিজেপিতে সেটা হবে না। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব তার একমাত্র কারণ নয়। আছে দিল্লির স্বার্থ। তাই ওয়ার্ড পিছু দু’ তিনজনের নামের তালিকা দিল্লির বিবেচনার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সেখানে থাকবে ভালো তৃণমূল ও এনসিপিআই সাংসদ ঘনিষ্টদেরও নাম। তাতে বিজেপির তৃণমূলীকরণ সহজ হবে। প্রার্থী বাছাইয়ে ড্রপ বক্স বসানোর রহস্য লুকিয়ে আছে এখানেই। বাংলাকে শাসন করবে বাঙালি। কিন্তু, রিমোট থাকবে দিল্লির হাতে।