সংঘের কর্মসূচি কি শুধুই বিজেপিকে জেতানো?
  • ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: ১০০ বছর অতিক্রম করার পরই কি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের উত্থান পর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে? সেরকমই আভাস ও ইঙ্গিত লক্ষ করা যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে জনসংঘ অথবা পরবর্তীকালে বিজেপি যখন সরকারে আসীন ছিল না, নিছক বিরোধী দল হয়েই ছিল, তখন আরএসএসের কার্যপ্রণালী একপ্রকার ছিল। দেখা যায়, সেই সময়কালেই সংঘ পরিবারের উত্থান সবথেকে বেশি হয়েছে। কিন্তু গত ১২ বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকারে বিজেপি ক্ষমতায়। রাজ্যে রাজ্যে বিজেপির শাসন চলছে। আরএসএসের একঝাঁক এজেন্ডা ইতিমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়ে গিয়েছে। ৩৭০ নং ধারার অবলুপ্তি কিংবা রামমন্দির নির্মাণ। সব সমাপ্ত। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। রাজ্যে এবং কেন্দ্রের বিভিন্ন দপ্তর এবং প্রতিষ্ঠানে সংঘের আদর্শ নিয়ে চলা আধিকারিক, কর্মী, নীতি নির্ধারককে নিয়োগ করা হয়ে গিয়েছে। শিক্ষার সিলেবাসে সংঘ নির্ধারিত পাঠক্রম ক্রমবর্ধমান। এ পর্যন্ত সবটাই সাফল্য এবং আনন্দদায়ক এক অনুভব। কিন্তু এরপর কী? দেখা যাচ্ছে একদিকে এসব হয়েছে, আবার অন্যদিকে বিজেপি অনায়াসে নিজেদের দলে বেনো জল ঢুকিয়ে চলেছে। অন্য দলের দুর্নীতিগ্রস্তরা এখন বিজেপির জোটে অথবা দলে। মন্ত্রী কিংবা এমপি। পশ্চিমবঙ্গের যে তৃণমূল নেতা-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে বিজেপি ছিল খড়্গহস্ত, তাঁদের সকলেই বিজেপির সর্বোচ্চ স্তর থেকে বরাভয় পেয়ে নিশ্চিন্তে রয়েছেন। পুরভোট, পঞ্চায়েত ভোট, লোকসভা ভোটে তৃণমূলের সদস্যরাই আবার বিজেপির টিকিট যে পাবেন, সেটা এখনও বলা যায়। কিন্তু আরএসএস এসব ব্যাপারে কিছুই বলতে পারবে না। কারণ, আরএসএস জানে না যে, একবার সরকারে বিজেপি চলে আসার পর, তাদের কী ভূমিকা অথবা অধিকার। দেখা যাচ্ছে কোনোটাই খুব ইতিবাচক নয়। কারণ, নীতি নির্ধারণের প্রথম সারিতে আরএসএসের অতীত থাকা কোনো মন্ত্রীকে দেখা যায় না আজকাল। 

Advertisement

বিজেপি যতকাল বিরোধী ছিল ততদিন আরএসএসের একপ্রকার কার্যপরিকল্পনা ও প্রয়োগ ছিল। এবার বিজেপি প্রায় ভারতজুড়ে রাজত্ব করছে। আরএসএস এবার কীভাবে নিজেদের পরিচালনা করবে? বিজেপির কিন্তু জনপ্রিয়তা কমে গিয়েছে আজ নয়, ২০২৪ সালেই। কারণ যাদের পাওয়ার কথা ছিল চারশো, তারা এককভাবে কেন পেল ২৪০? কেন বিজেপির কাছে এখন এই সরকারে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা নেই? অন্য দলকে কাছে টেনে সরকার চালানো যায়। কিন্তু ভোটের অঙ্কের বার্তা তো এটাই বলেছে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। কেন নেই? মানুষ ভোট দেয়নি। যে মানুষ ২৮২ কিংবা ৩০৩ আসনে জিতিয়েছে বিজেপিকে, তারাই কেন ভোট দিল না? রামমন্দিরের পরও? সেই ড্যামেজ কন্ট্রোলে আরএসএস কিছু করেছে? করতে পারেনি। যদি করতে পারত, তাহলে বিজেপির জ্ঞানেশ কুমারকে দরকার পড়ত না। বিজেপি আত্মবিশ্বাসী হলে জ্ঞানেশ কুমারকে সমর্থন করা, বিরোধীদের উত্থাপিত অভিযোগকে উড়িয়ে দেওয়া, আন্দোলনে পুলিশ দিয়ে দমনপীড়ন করত না। 
অতএব বর্তমানে বিজেপির থেকেও বড়ো সংকট আরএসএসের। বিজেপির প্রভাব ও দাপট এখন অনেক বেশি। সংঘের কাজ যেন হয়েছে, স্রেফ রাজ্যে রাজ্যে বিজেপিকে জেতানো। ঠিক এই ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে সংঘকে বেশ কিছু বছর ধরে। একটি রাজ্যে হয়তো বিধানসভা ভোট আছে। সেই রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতাসীন নয়। বিজেপিকে জেতাতে হবে। অতএব আরএসএস বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসে সেই রাজ্যের গ্রাম শহরে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করল। হিন্দুত্ব প্রচার করা হল। বিজেপি ক্ষমতাসীন হলে কী কী উপকার হবে সেটা মানুষকে সরাসরি বোঝাবে। এবং আগে থেকেই সেই উপকারপর্ব শুরু করে দেবে। এক সময় দেখা যাচ্ছে সেই রাজ্যে বিজেপি জয়ী হয়েছে। বিজেপিকে জয়ী করানোর জন্য অনেক সংগঠন কাজ করে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। বজরং দল। হিন্দু জাগরণ মঞ্চ। আরএসএস সেরকমই একটি বৃহৎ সংগঠন। বর্তমানে আরএসএসের যে ভূমিকা সেটি দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, এখন আরএসএসের রাজনৈতিক মতাদর্শগত উইং বিজেপি নয়। বরং বিজেপিরই একটি শাখা যেন আরএসএস। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের প্রধানতম দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজেপিকে জেতানো। বিজেপির পক্ষে প্রচার করা। কিন্তু সমাজ গঠনের সেই প্রচার ও মন্ত্রগুলি পিছনের সারিতে। এরকম মনে হওয়ার কারণ কী? কারণ হল, বিজেপি গত ১২ বছরে সবথেকে বেশি যা হারিয়েছে সেটি হল, দলের নীতি, আদর্শ, মূল্যবোধ এবং শৃঙ্খলা। এবং বহু ক্ষেত্রেই মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস। ঠিক যে কারণে বলা হত যে, আরএসএসের শিক্ষা থেকেই বিজেপি একটি রেজিমেন্টেড দল। এখন কিন্তু দেশজুড়ে বিজেপি কোনোরকম নীতি আদর্শের তোয়াক্কা করে না। দুর্নীতিগ্রস্তদের সাদরে বরণ করে নিচ্ছে। আরএসএস এসব নিয়ে কিছুই প্রতিবাদ করে না। 
সংঘকেই একটি রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য অনুরোধ করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু সরসংঘচালক এম এস গোলওয়ালকর রাজি হননি। প্রায় দু ঘণ্টা ধরে দুজনের মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছিল রুদ্ধদ্বার কক্ষে। সেখানে কী আলোচনা হয়েছে সেটি খুব যে স্পষ্ট এমন নয়। কিন্তু সংঘ থাকবে সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসাবে। রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক রাখবে না। এরপরই তৈরি হয় ভারতীয় জনসংঘ। যে দলের প্রধান দুই সদস্য ছিলেন সংঘ থেকেই উঠে আসা। অটলবিহারী বাজপেয়ি ও লালকৃষ্ণ আদবানি। তাঁরা দুজনে সংঘের আইডেন্টিটি খারিজ করার দাবি অগ্রাহ্য করেছিলেন। তাঁদের জনতা পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল তোমরা জনতা পার্টিরও সদস্য, আবার আরএসএসেরও সদস্য, এই দ্বৈত সদস্যপদ চলবে না। ডুয়াল মেম্বারশিপ নিয়ে দ্বন্দ্ব প্রবল হওয়ার পর তাঁরা বহিষ্কৃত হন। এবং ১৯৮০ সালে বিজেপি নামক নতুন দল গঠন করেন। আরএসএসের প্রভাব তাঁদের মধ্যে এতটাই ছিল। 
কিন্তু এখন আরএসএসের সেই প্রভাব আর বিজেপির মধ্যে নেই। ২০২৪ সালের ভোটের প্রচারের সময়ই তৎকালীন বিজেপি সভাপতি জগৎপ্রকাশ নাড্ডা বলেছিলেন, প্রথমদিকে বিজেপি এককভাবে সক্ষম ছিল না। তাই সংঘের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আজ বিজেপি নিজেই স্বাবলম্বী। তাঁর এই মন্তব্য নিয়ে প্রবল আলোড়ন হয়। কিন্তু পরে ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করা হলেও এটা যে আজকের বিজেপির সর্বোচ্চ স্তরের মনের কথা সেটা স্পষ্ট হয়ে যায়। 
অতি সাম্প্রতিক দুটি মন্তব্য বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।  দিল্লির যন্তরমন্তরে যখন আন্দোলন করছে জেন জি, পুলিশ দমনপীড়ন করেছে, গোটা দেশ উত্তাল হয়েছে তখন না হলেও ওই ঘটনার একমাস পর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সরসংঘচালক মোহন ভাগবত সম্পূর্ণ জেন জিকে সমর্থন করেছিলেন। বলেছিলেন, যুব-ছাত্রসমাজের কথা শুনতে হবে। আমি সর্বদাই তাদের পক্ষে। আন্দোলন হল গণতন্ত্রের অঙ্গ। অর্থাৎ ভারত সরকারের মনোভাবের ঠিক বিপরীত অবস্থান। অথচ সম্প্রতি সেই মোহন ভাগবত সম্পূর্ণ ভারত সরকার ও বিজেপির মুখপাত্রদের সুরেই বললেন, বিদেশি চক্রান্ত কাজ করছে সরকার বদলের লক্ষ্য নিয়ে। বাংলাদেশ, নেপালের মতো গণ আন্দোলন বিশ্বজুড়ে পরিকল্পনা মাফিক চলছে। তিনি মত বদলে ফেললেন কেন? কাদের অসন্তোষে? 
বিজেপি সরকারে আসীন হওয়ার পর আরএসএসের পক্ষ থেকে নতুন কোনো এজেন্ডা ঘোষণা করা হয়নি। ৪০ বছর আগেও তাদের যে 
লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য ছিল, আজও সেই একই 
ইস্তাহার। কিন্তু নতুন যুগ, নতুন প্রজন্ম, বেকারত্ব, কর্মছাঁটাই, এআইয়ের চ্যালেঞ্জ, ভারতের অর্থনীতির সংকট, মূল্যবৃদ্ধি এসব থেকে কীভাবে বেরনো সম্ভব? বিজেপি তথা মোদি সরকারকে সেটাই করতে নির্দেশ দেওয়া কিংবা রোডম্যাপ জানানোর বার্তা দিতে পারছে না আরএসএস। 
আরএসএস বিজেপিকে রাজনৈতিকভাবে জেতাতে মরিয়া। পরিশ্রম করছে। মাটি কামড়ে পড়ে থাকছে। কিন্তু বিজেপি কি আরএসএসের নীতি আদর্শ তথা নির্দেশিকা আদৌ আর গ্রাহ্য করে? বিজেপি যেন ধরেই নিয়েছে আরএসএসের কিছু হিন্দুত্ববাদী 
এজেন্ডা পূরণ করলেই তারা সন্তুষ্ট। বাকি রাজনৈতিক এজেন্ডা, সিদ্ধান্ত, নীতি সব বিজেপি নিজের মতো করেই বাস্তবায়িত করে চলেছে। আরএসএস সেবা ভারতী, বিদ্যা ভারতী, একল বিদ্যালয়, বনবাসী কল্যাণ আশ্রম চালায়। নিজেদের আদর্শের অনুপ্রবেশ ঘটায় ছাত্রছাত্রী ও জনসমাজের মধ্যে। কিন্তু 
বিজেপি সরকারের মন্ত্রী, বিধায়ক, এমপি কারা হচ্ছেন? সবথেকে বেশি সোশ্যাল মিডিয়ায় যে মন্ত্রী বিধায়কদের হুমকি হুঁশিয়ারি দিতে দেখা যায় অবিরত কিংবা পাড়ায় পাড়ায় যাঁদের দেখা যাচ্ছে নতুন বিজেপি নেতা হিসাবে, যাঁরা প্রতাপ ও প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন, কারা তাঁরা? 
বিজেপি একটি রাজনৈতিক দল। তাদের বদনাম হলেও তারা আবার সামলে নিতেই পারে। কঠোর কিছু ব্যবস্থা নিয়ে ভারসাম্য করে দিতে পারে জনমনোভাব। কিন্তু সকলের অলক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের ইমেজ নিয়েই সবথেকে বেশি প্রশ্ন উঠছে। আরএসএস এত বড়ো চ্যালেঞ্জে কখনো পড়েনি! দুর্দান্ত বক্তা, আচরণে শালীন, বাগ্মিতায় সেরা, বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে হিন্দুত্বকে প্রতিষ্ঠার যুক্তি। আরএসএস থেকে আসা সেইসব অতীতের নেতানেত্রী কোথায়? আজ কারা বিজেপি অথবা সরকারের মুখ?