আমেরিকায় ভোট, গণতন্ত্রের পরীক্ষা!
  • ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: আমেরিকার গণতন্ত্র কি নিজের হাতেই নিজের কবর খুঁড়ছে? ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে না, সামনে আনবে বড়ো প্রশ্ন—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ক্ষমতার সামনে মার্কিন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি কতটা শক্তিশালী?

Advertisement

এই নির্বাচন ঘিরে রয়েছে আরও প্রশ্ন—নির্বাচনে রিপাবলিকানরা হারলে ট্রাম্প কি পরাজয় মেনে নেবেন? ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে কি তাঁর যুদ্ধনীতি, অভিবাসন অভিযান ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবেন? নাকি নির্বাচনের ফলাফলকে অবৈধ বলে দাগিয়ে দিয়ে শুরু হবে নতুন রাজনৈতিক সংঘাত?
আশঙ্কার কারণ, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে ট্রাম্প পরাজয় স্বীকার করেননি। ভোটে কারচুপির ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে সমর্থকদের উসকে দিয়েছিলেন। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি তাঁর সমর্থকরা হামলা চালিয়েছিলেন ক্যাপিটল হিলে— আমেরিকার গণতন্ত্রের প্রতীকী দুর্গে। এবার বিপদ আরও গভীর। ট্রাম্প শুধু রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন না, সেই ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলিকেও দুর্বল করে তুলছেন।
গণতন্ত্রকে দুর্বল করতে সব সময় সামরিক অভ্যুত্থানের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসা নেতার হাত ধরেই ক্ষয়ে যেতে পারে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সংকুচিত হতে পারে বিরোধিতার পরিসর, প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে ক্ষমতার ভারসাম্য। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকায় সেই আশঙ্কাই এখন রাজনীতির কেন্দ্রে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন তাই কেবল কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের আসন দখলের লড়াই নয়; এই ভোট ট্রাম্পের ক্ষমতার উপর সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর থাকবে, তারও পরীক্ষা। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে প্রেসিডেন্টের নীতির পক্ষে আইন পাস করা এবং তাঁর প্রশাসনের উপর কংগ্রেসের নজরদারি সীমিত করা সহজ হতে পারে। বিপরীতে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে তদন্ত, শুনানি, বাজেট এবং আইন প্রণয়নের মাধ্যমে হোয়াইট হাউসের উপর চাপ বাড়াতে পারবেন। অর্থাৎ, ভোটের ফল শুধু পরবর্তী দুই বছরের রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণ করবে না; তা ঠিক করতে সাহায্য করবে, ট্রাম্প কতটা স্বাধীনভাবে দেশ চালাতে পারবেন এবং আমেরিকার ক্ষমতার ভারসাম্য কতটা অটুট থাকবে।
আসলে ট্রাম্পের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের সীমারেখাটিই ক্রমশ মুছে যাচ্ছে। এখানেই ট্রাম্পের রাজনীতির বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য। নির্বাচনে জয়ী হওয়া আর গণতান্ত্রিকভাবে শাসন করা এক নয়। নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় বসার অধিকার পাওয়া যায়। কিন্তু বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম ও বিরোধী দলকে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে আনার অধিকার পাওয়া যায় না। ট্রাম্পের রাজনীতিতে রাষ্ট্র যেন ব্যক্তিগত সম্পত্তি, আর বিরোধীরা যেন দেশের শত্রু। ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হল, নেতার প্রতি আনুগত্যকে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা।
এবারের নির্বাচনে ট্রাম্পের সামনে বড়ো সমস্যা জীবনযাত্রার ব্যয়। জ্বালানি, খাদ্য ও বাড়িভাড়া—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, সংসার চালানো কতটা সম্ভব? ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত, জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা এবং বিভিন্ন দেশের উপর শুল্ক আরোপের নীতি নিয়ে অসন্তোষ বাড়লে তার দায় এড়াতে পারবেন না প্রেসিডেন্ট। কারণ, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন ক্ষমতাবানরা, কিন্তু তার মূল্য চোকান সাধারণ মানুষ। ডেমোক্র্যাটরা এই অসন্তোষকে নির্বাচনি অস্ত্র করছেন। তাঁদের বক্তব্য, ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশে শক্তি প্রদর্শনে যতটা ব্যস্ত, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ততটাই ব্যর্থ।
ট্রাম্পের ক্ষমতার সবচেয়ে বড়ো শক্তি তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা নয়, বরং রিপাবলিকান দলের প্রায় নিঃশর্ত আনুগত্য। ট্রাম্প নিজে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না, কিন্তু প্রতিটি রিপাবলিকান প্রার্থীর প্রচারে তাঁর ছায়া রয়েছে। তাঁকে সমর্থন করলে তাঁর নীতির দায় নিতে হবে, বিরোধিতা করলে দলীয় সমর্থন হারানোর ঝুঁকি। এই দ্বন্দ্বই রিপাবলিকানদের দুর্বলতা। কানসাস, আলাস্কা, মিসিসিপি ও ফ্লোরিডার মতো রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বাড়ার অর্থ, রিপাবলিকানদের ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটিগুলিও আর নিশ্চিত নিরাপদ নয়। সেখানে পরাজয় ঘটলে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কর্তৃত্বে আঘাত লাগবে এবং দলের ভিতরে তাঁর বিরোধীরা মুখ খোলার সাহস পেতে পারেন। তবে জনমত সমীক্ষা চূড়ান্ত ফল নয়। ডেমোক্র্যাটদেরও শুধু ট্রাম্পবিরোধিতার উপর নির্ভর করলে চলবে না; জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও কর্মসংস্থান নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্পের সন্ধান দিতে হবে।
নিউ ইয়র্কে জোহরান মামদানির উত্থান ডেমোক্র্যাটদের প্রগতিশীল অংশকে নতুন উৎসাহ দিয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং অভিবাসীদের সুরক্ষা তাঁদের রাজনীতির মূল বিষয়। ট্রাম্প তাঁদের সমাজতন্ত্রী বা কমিউনিস্ট বলে আক্রমণ করেন। কিন্তু তকমা দিয়ে এই রাজনীতির সামাজিক ভিত্তি মুছে ফেলা যায় না। যখন মানুষ মনে করেন, অর্থনীতি ও রাজনীতির সুবিধা ক্রমশ অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, তখন প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প খোঁজার প্রবণতা বাড়ে। ট্রাম্পের উত্থানের পিছনেও ছিল প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভ। এখন সেই ক্ষোভের একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধেই ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযান এবং আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বহু ভোটার। অন্যদিকে, ইজরায়েলপন্থী সংগঠনগুলির বিপুল নির্বাচনি ব্যয় নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এই লড়াইয়ে বিদেশনীতি, নির্বাচনি অর্থ এবং ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্ত— তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্পের রাজনীতিকে বুঝতে হলে নির্বাচনি হিসাবের বাইরে তাকাতে হবে। প্রশাসনের উপর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করা, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে প্রতিশোধের হাতিয়ার করে তোলার প্রবণতা—সব মিলিয়ে আমেরিকায় আজ বিপজ্জনক রাজনৈতিক আবহ তৈরি হয়েছে। ফ্যাসিবাদ শুধু একনায়কের ছবি কিংবা প্রকাশ্য দমনপীড়নের নাম নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিতরে থেকেই সেই ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেওয়াও তার বৈশিষ্ট্য। নেতা নিজেকে জাতির একমাত্র প্রকৃত প্রতিনিধি হিসাবে তুলে ধরেন; তাঁর বিরোধিতা মানেই দেশের বিরোধিতা— এমন ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন। সংখ্যালঘু ও অভিবাসীদের জাতীয় সংকটের জন্য দায়ী করা হয়, আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে ব্যক্তিগত আনুগত্যের অধীন করার চেষ্টা চলে।
অর্থনীতিবিদ ড্যারন আসেমোগলু ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেট’-এ প্রকাশিত ‘ইজ আমেরিকা গোয়িং ফ্যাসিস্ট?’ শীর্ষক লেখায় ট্রাম্পের ক্ষমতাকেন্দ্রীকরণ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার প্রবণতা এবং রিপাবলিকান নেতৃত্বের নিঃশর্ত সমর্থন নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর উদ্বেগের কেন্দ্রে ছিল একটি মৌলিক বিপদ— যে প্রতিষ্ঠানগুলি ক্ষমতাসীন নেতাকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা, সেগুলিই যদি তাঁর অনুগত হয়ে পড়ে, তবে গণতন্ত্রের প্রতিরোধক্ষমতা দ্রুত ক্ষয়ে যায়। ট্রাম্পের প্রতিটি নীতিকে ঐতিহাসিক ফ্যাসিবাদের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। কিন্তু তাঁর শাসনের কর্তৃত্ববাদী বৈশিষ্ট্যগুলি উপেক্ষা করাও বিপজ্জনক।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক জোটে ইভানজেলিক্যাল ও খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের একাংশ আমেরিকার আইন ও জনজীবনে খ্রিস্টধর্মের বিশেষ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান। প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের মতো প্রশাসনিক ব্যক্তিত্বের খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী বক্তব্য এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিসরে ধর্মীয় প্রতীক, বাইবেলের ভাষা এবং ঈশ্বরের বিশেষ উদ্দেশ্য পূরণের দাবি প্রায়ই রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে নৈতিক বৈধতা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। বিপদটি ধর্মবিশ্বাসে নয়, ধর্মকে রাজনৈতিক আধিপত্যের হাতিয়ার করে তোলায়। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষ ধর্ম পালন করতে পারেন, ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে রাজনীতিও করতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্র যদি কোনো একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর একচ্ছত্র সম্পত্তি হয়ে ওঠে, তবে সমান নাগরিকত্বের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। তবে আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে শুধু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কৌশলগত স্বার্থ, সামরিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণও। তবু যখন ধর্মীয় বিশ্বাসকে যুদ্ধের নৈতিক অনুমোদন হিসাবে ব্যবহার করা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে— রাষ্ট্র কি বাস্তব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জবাবদিহি করবে, নাকি সেই সিদ্ধান্তকে ঈশ্বরের ইচ্ছা বলে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে?
গণতন্ত্রের অবক্ষয় সাধারণত এক দিনে ঘটে না। ছোটো ছোটো নিয়মভঙ্গ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রশাসনিক আনুগত্যের দাবি এবং বিরোধীদের বৈধতা অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে তার ভিত দুর্বল হয়। একসময় যে ব্যতিক্রমকে সাময়িক বলে মনে হয়েছিল, সেটিই হয়ে ওঠে নতুন স্বাভাবিকতা। তবে ইতিহাসের পরিণতি আগে থেকে নির্ধারিত নয়। গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলি এখনও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। নির্বাচনে ভোটাররা ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারেন। আদালত বেআইনি সিদ্ধান্ত আটকে দিতে পারে। সংবাদমাধ্যম তথ্য সামনে আনতে পারে। নাগরিকরা সংগঠিত হয়ে নিজেদের অধিকার রক্ষা করতে পারেন। ৩ নভেম্বরের নির্বাচন তাই কেবল রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের লড়াই নয়। এটি পরীক্ষা করবে, আমেরিকার প্রতিষ্ঠানগুলি প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার সামনে কতটা স্বাধীন থাকতে পারে।
ইতিহাসের শিক্ষা নির্মম— গণতন্ত্রের পতন সব সময় বাইরে থেকে আসে না। কখনো তার নির্বাচিত নেতাই সেই পতনের পথ তৈরি করেন। যখন তিনি ভাবতে শুরু করেন, রাষ্ট্রের চেয়ে তিনি বড়ো, আইনের চেয়ে তাঁর ইচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ, আর জনগণের রায়ের চেয়ে তাঁর নিজের দাবি বেশি সত্য। ট্রাম্পের আমেরিকায় আজ সেই বিপদের ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে।