কমিশনের সাংবিধানিক এক্তিয়ার ও সুপ্রিম বার্তা
  • ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভারতের নির্বাচনি ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধিকার নিয়ে সাম্প্রতিককালে যে ক’টি বিতর্ক হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম এসআইআর। দিল্লির ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের কার্যপদ্ধতিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেনি, বরং দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর এক মৌলিক দিকও নতুন করে সামনে এনেছে। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, ভোটার তালিকায় নাম তোলা, বাদ দেওয়া বা সংশোধনের জন্য নির্ধারিত ফর্ম-৬, ৭ ও ৮ কোনোভাবেই পরিবর্তন করতে পারে না কমিশন। এই রায় এবং শীর্ষ আদালতের ভর্ৎসনা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার তথা গোটা কমিশনের জন্য একটি কড়া বার্তা।

Advertisement

ঘটনার সূত্রপাত এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন ভোটার ফর্ম সংশোধন ঘিরে। ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত ফর্মগুলি একটি নির্দিষ্ট আইনি বিন্যাস মেনে তৈরি। অভিযোগ উঠেছিল, এসআইআর প্রক্রিয়ায় নতুন ভোটারদের অভিভাবকদের নাম আগের তালিকায় ছিল কি না, তা নিয়ে একটি অতিরিক্ত ‘স্ব-ঘোষণাপত্র’ বা অ্যানেক্সচার ফর্মে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আইন না মেনে এই ধরনের পরিবর্তন করা নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের অন্দরেই আপত্তি ওঠে। দুই নির্বাচন কমিশনারের সেই আপত্তির কথা সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর ‘ভোটচুরি’র অভিযোগকে সামনে রেখে কমিশন ও কেন্দ্রকে কাঠগড়ায় তোলে বিরোধী দলগুলি। আইনি বিধি না মেনে একতরফাভাবে ফর্মের চরিত্র বদলের এই সিদ্ধান্তের জেরে চাপে পড়ে সুপ্রিম কোর্টের ঘাড়ে যাবতীয় দায় ঠেলার চেষ্টা করেছিল কমিশন। কিন্তু শীর্ষ আদালত সেই দাবি খারিজ করে জানিয়ে দেয়, ফর্ম বদলের কোনো অনুমোদন তারা দেয়নি। পরবর্তীতে কমিশন আদালতে হলফনামা দিয়ে দাবি করে যে, ফর্ম-৬ মোটেও বদল করা হয়নি এবং ‘স্ব-ঘোষণাপত্র’ একটি পৃথক নথি। তবে আদালতে এই যুক্তি ধোপে টেকেনি। সুপ্রিম কোর্টের মূল আপত্তির জায়গাটি ছিল আরও গভীরে এবং জনস্বার্থের নিরিখে তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আদালত একটি যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছে যে, ফর্ম-৬ মূলত নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করার জন্য, যেখানে আবেদনকারীকে ঘোষণা করতে হয় যে তিনি আগে কখনো ভোটদান করেননি। তাহলে খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া বা ‘ডিলিটেড’ হওয়া পুরানো ভোটারদের কেন নতুন ভোটার হিসাবে গণ্য করে ফর্ম-৬ পূরণ করতে বাধ্য করা হবে? দিল্লির মতো মেট্রোপলিটন শহরে মোট জনসংখ্যার একটা বড়ো অংশ কাজের সুবাদে সাময়িকভাবে শহরের বাইরে থাকতে পারেন বা বাসস্থান পরিবর্তন করতে পারেন। সময়মতো ইনিউমারেশন ফর্ম হাতে না পাওয়ার কারণে বা অন্য কোনো কারণে যাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই জটিল প্রক্রিয়া চাপিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। শীর্ষ আদালতের বার্তা—ভোটাধিকার কোনো সাধারণ প্রশাসনিক বিষয় নয়, এটি একটি মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার। সামান্য প্রশাসনিক ত্রুটি বা ফর্ম পূরণের জাঁতাকলে পড়ে কোনো নাগরিক যাতে চিরতরে তাঁর ভোটাধিকার না হারান, সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে কমিশনকে। মামলাকারীদের পক্ষে আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ ও ডিএস নাইডুদের সওয়াল এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দিল্লিতে প্রায় ৪৭ লক্ষ মানুষ সাড়া না দেওয়ায় তাঁদের একটা বড়ো অংশকে অনুপস্থিত বা ডিলিটেড হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের জন্য সহজ সমাধানের পথ বের না করে ফর্ম-৬ এর বেড়াজালে আটকে রাখা হয়েছিল। একইসঙ্গে, ৩০ অক্টোবরের যে ডেডলাইন কমিশন বেঁধে দিয়েছিল, তাও খারিজ করে দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। দিল্লির আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে, কোনো কৃত্রিম কাট-অফ ডেট চাপানো যাবে না এবং বাদ পড়া ভোটারদের বুথে বুথে তালিকা ঝুলিয়ে বা স্থানীয় স্তরে যোগাযোগ করে ফর্ম জমার সুযোগ সহজ করতে হবে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সহ অন্য রাজ্যগুলিতে কমিশন যে পুরানো ফর্ম-৬ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে, তা থেকেই প্রমাণিত হয় যে তাদের আগের পদক্ষেপটি আইনি ও প্রশাসনিক উভয় দিক থেকেই ত্রুটিপূর্ণ ছিল।
কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। দেশের গণতন্ত্রকে কার্যকর রাখতে হলে এই প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি। ফর্ম বদল সংক্রান্ত এই বিতর্ক এবং সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ প্রমাণ করে দিল যে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের চেয়ে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা করাই আমাদের বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। জ্ঞানেশ কুমার তথা নির্বাচন কমিশনকে এখন আদালতের এই নির্দেশ মেনে এবং অতীতের ভুল সংশোধন করে সত্যিকারের জনমুখী ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির পথে হাঁটতে হবে। তবেই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি অক্ষুণ্ণ থাকবে। কমিশনের ক্ষুণ্ণ ভাবমূর্তিও পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।